সিরিয়া যুদ্ধের ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টস

445
SHARE

যুদ্ধের ধামামা চারিদিকে বেজেই চলেছে যেন আরেকটি বিশ্ব যুদ্ধ কড়া নাড়ছে দোরগোড়ায়। সুপ্রিয় সুধি আমন্ত্রণ ওয়ার জোনে। একটি যুদ্ধ পাল্টে দিল গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে। দৃশ্যমান করে তুলল বিশ্বে শক্তিগুলোর মেরুকরণ। এতক্ষণে বুঝে গেলেন কোন যুদ্ধের কথা বলছি হ্যাঁ সিরিয় যুদ্ধের কথাই বলছি। সাথে থাকুন ফিরছি একটু পরই।

মার্কিন প্রতিপত্তি ও বলয়ের বাইরে সমহিমায় বিশ্বাঙ্গনে শক্তি সামর্থ্য নিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া নিজেদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে সিরিয় যুদ্ধের মাধ্যমে। পুরো আরব বিভক্ত হয়ে পড়েছে এই দুই শিবিরে। শরণার্থীর ভিরে টালমাটাল অবস্থা ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্ব। আর এর পেছনে মূল কারনই এই যুদ্ধ। তবে সেই যুদ্ধ এখন নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে কে সফল? রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা?

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বুঝা যায়, সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। সেখানে তার শত্রু মিত্র স্পষ্ট এবং লক্ষ্যও স্পষ্ট। সে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। সিরিয়ার যুদ্ধ রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ে জোয়ার এনেছে। টাকার হিসাবে ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বছরে ইতিমধ্যে তা দাঁড়িয়েছে ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। এ যুদ্ধে রাশিয়ার প্রবেশের পর,  দেশটি যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত অস্ত্র ও রাশিয়ার নতুন প্রযুক্তির অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের এক পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠে।

রাশিয়ার পাশাপাশি আসাদের পক্ষে আরো কাজ করছে হিজবুল্লাহ এবং ইরান। রাশিয়ার সামরিক সহায়তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সিরিয়া যুদ্ধে । সিরিয়ার সেনাবাহিনীর  অবস্থান ভালোর দিকে যাচ্ছে তা এখন স্পষ্ট। সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়ার লক্ষ্য স্পষ্ট। পুতিন চায় আসাদ সরকারকে শক্তিশালী করতে এবং এটা নিশ্চিত করতে যে সিরিয়ার একটি অংশ আসাদ সরকারের পুরো নিয়ন্ত্রণে আছে। এটা করার জন্য তারা তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের ওপর ব্যাপকহারে বিমান হামলা চালাচ্ছে। বিমান হামলার সুফলও পেতে শুরু করেছে রাশিয়া।

অন্যদিকে সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অনেকগুলো কারণ আছে পশ্চিমাদের। রাশিয়ান বিমান হামলার সহায়তায় সিরিয়ায় আসাদ বাহিনী তাদের অবস্থানকে মজবুত করছে। আলেপ্পো সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর তাদের দখলে চলে যাচ্ছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় এই শহরটি যুদ্ধের প্রায় শুরু থেকে বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। আলেপ্পোতে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অভিযান শান্তি আলোচনায় প্রভাব ফেলছে। দৃশ্যত সিরিয়ায় গোলক ধাঁধায় পড়েছে পশ্চিমারা। সিরিয়ায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারছে না তারা। এর একটা কারন আসাদ বিরোধীদের মাঝে খুব শক্ত অবস্থানে আছে আল কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠী। ফলে আসাদ বিরোধীদের সাহায্য করলে আল কায়েদার অবস্থানও শক্তিশালী হবে। যা কখনো চায়না আমেরিকা।

পশ্চিমাদের মূল লক্ষ্য সিরিয়ায় আইএসকে দমন করা। কিন্তু তাদের মিত্র সৌদি আরব ও তুরস্কের মূল লক্ষ্য আসাদ সরকারকে উত্খাত করা। আইএস তাদের প্রধান শত্রু  নয়। তাদের প্রধান শত্রু  বাশার আল আসাদ।

আবার পশ্চিমারা সিরিয়ায় কুর্দিদের সাহায্য করছে। সিরিয়ায় তাদের অন্যতম মিত্র কুর্দিরা। কিন্তু তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না কুর্দিরা কোনোভাবেই শক্তিশালী হোক কেননা তারা কুর্দিদের হুমকি মনে করে।

সিরিয়ার প্রধান বিদ্রোহী গ্রুপ ‘আইএস’  সৌদি আরবের মাধ্যমে আগে থেকেই সেখানে প্রচুর মার্কিন অস্ত্র পেয়েছিল। কিন্তু রুশ বাহিনীর অস্ত্রসম্ভারের মোকাবিলায় সেগুলো খুব বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি, বরং উল্টোই হয়েছে। এ দৃশ্য দেখামাত্র মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যত্র রুশ অস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ক্রেতারা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়া সরাসরি এই যুদ্ধে শামিল। আর তাতে দেশটির খরচ আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হিসেবে অস্ত্রবাজারে দেশটি নতুন অর্ডার পেয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার। অনেকেই শুরুতে ভেবেছিলেন, এই যুদ্ধে যুক্ত হয়ে ভুল করেছে দুর্বল অর্থনীতির রুশরা। কিন্তু ভøামিদির পুতিন যে ভালো ব্যবসায়িক বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন, তা স্পষ্ট এখন। সিরিয়ার যুদ্ধের মাঝপথেই রাশিয়া বিশ্ব অস্ত্রবাজারের দ্বিতীয় প্রধান খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় রুশরা যে সংকটে পড়েছিল, অস্ত্র খাত দিয়ে সেটা তারা পুষিয়ে নিচ্ছে এখন। শিগগিরই তারা সিরিয়া থেকে অনেকখানি নিজেদের গুটিয়ে নিতেও যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাস্তবে সিরিয়ার যুদ্ধে রাশিয়া যে সর্বশেষ দশকের তৈরি অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা সরাসরি পরীক্ষার জন্যও অংশ নিয়েছিল, সেটা খোলামেলাভাবেই এখন বলছে তারা। এতে লাভ হয়েছে তাৎক্ষণিক। যেমন আলজেরিয়ার সঙ্গে সুকই সু-৩২ ফাইটার বোম্বারের একটি চুক্তি আটকে ছিল দীর্ঘদিন। সিরিয়ায় এই বিমানের কার্যকারিতায় মুগ্ধ আলজেরিয়া দ্রুত এক ডজনের অর্ডার দিয়ে দিয়েছে। আলজেরিয়া ‘এমআই-২৮এন’ নামের হেলিকপ্টারও ক্রয় করতে যাচ্ছে ৪০টি।

রাশিয়ার জ্যামিং যন্ত্রপাতিও সিরিয়ার যুদ্ধে বেশ কার্যকারিতা দেখিয়েছিল। ফলে কাটতি বেড়েছে তারও। পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াÑ এমনকি ন্যাটোভুক্ত গ্রিসও এসবে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

গত ৬ এপ্রিলে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিরিয়া যুদ্ধে যেসব অস্ত্র প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন ছিল না, এমন কিছু অস্ত্রও রুশরা ব্যবহার করেছে, শুধু বিশ্বের বিভিন্ন ক্রেতাদেশকে প্রলুব্ধ করার জন্য। যেমন ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবরে পুতিনের ৬৩তম জন্মদিনে রুশরা সিরিয়ায় সাগর থেকে দূরপাল্লার ত্রুজ মিসাইলের নতুন সংস্করণের এক পরীক্ষা চালায়। ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরের ১১টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে তা। যা অনেক দেশকেই এখন আগ্রহী করে তুলেছে এই মিসাইলের মালিকানার জন্য।

সুতরাং বলা যায়, আসাদকে মদদ দেওয়া ‘উপলক্ষ’ ধরে নিয়ে রুশরা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তার ‘মূল লক্ষ্য’ হাসিল করেছে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি।

সিরিয়া যুদ্ধে পশ্চিমাদের ন্যায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়তে হচ্ছে না পুতিনকে। সিরিয়া দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সহায়তার ফলে একটি অংশের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে আসাদ বাহিনী । বাকি আংশের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে আইএসের হাতে। আর তথাকথিত মডারেট বিদ্রোহীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং ইউক্রেনে হস্তক্ষেপের পর ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী স্থিতিশীল অবস্থা কেটে গেছে। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তে রাশিয়ার আক্রমণাত্মক টহল ন্যাটোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো আস্তে আস্তে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে।

 

রাশিয়া তার সতর্ক সামরিক অবস্থানের জন্য ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করছে। আর সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করে পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদেরকেও হিসেব গুণতে হবে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করার মত সামরিক সামর্থ্য তার আছে। আপাত দৃষ্টিতে সিরিয়া যুদ্ধে লাভ ক্ষতির হিসেবে পুতিনের পাল্লাটা লাভে কিছুটা ভারী তিনি তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট করে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথেই এগোচ্ছেন।

আপনার মন্তব্য