বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলা – আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দামামা?

723
SHARE

কদিন আগে একটা পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছিল গত শত বছরের মধ্যে এই সময়টা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ন সময়। তুরস্ক হামলা, গুলশান ট্রাজেডী, মদীনায় হামলা আর সর্বশেষ – ফ্রান্সের নিস শহর। সবখানেই বর্বরোচিত উপায়ে হত্যা করা হচ্ছে নিরীহ নিস্পাপ মানুষদের। কখনও গুলি করে, কখনও বোমা ফাটিয়ে, কখনো জবাই করে আর এখন – গাড়ির তলে চাপা দিয়ে। হাজার মানুষের ভিড়ে মানুষকে পিপড়া মনে করে বিশাল কোন ট্রাক চালিয়ে দেয়া – নৃশংসতার সব ধরনের লেভেল পার করে ফেলে। ঠিক যেমনটা কদিন আগে বাংলাদেশে হয়েছিল – ঠান্ডা মাথায় কিছু সাইকোপ্যাথ জবাই করল কিছু মানুষকে। রক্তাক্ত করে দিল পুরো বাংলাদেশের ঈদ। একট বড় উতসবের জন্য সেসময় প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাংলাদেশ। ঠিক একই রকমভাবে ফ্রান্সের নিস শহরে, একটা উতসবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো নিরীহ মানুষদের। ঠিক কিভাবে সবচেয়ে শান্তিপূর্ন সময়ে আছে পৃথিবী ঠিক বোঝাই যাচ্ছে না। পরিসংখ্যান হয়তো অনেক কিছু চোখে দেখেনা।

এত বছর মরেছে প্যালেস্টাইন, ইরাক, আফগানিস্তানে না, সন্ত্রাসী মরার কথা বলছি না, বলছি সাধারন মানুষগুলোর কথা, শিশুগুলোর কথা। আর এখন মরছে পুরো বিশ্বে। মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের নানা হতাহতদের ছবি ভিডিও দেখে নিজেদের বুঝ দিতাম – “ওখানে তো যুদ্ধ পরিস্থিতি, হয়তো এমনটা হওয়া স্বাভাবিক”। এরপর দেখলাম সেই হত্যাকান্ডগুলো ধীরে ধীরে ভাইরাল ফিভারের মত ছড়িয়ে গেল ইউরোপ-আমেরিকায়। তখন ধরে নিয়েছিলাম – হয়তো “টিট ফর ট্যাট” জাতীয় কিছু। আর এখন, গায়ে পড়েছে বাংলাদেশেরও – যে যুদ্ধ কোনদিন আমাদের ছিল না। এবার কি বলে বুঝাবো নিজেদের?

সম্ভবত সন্ত্রাসীরা সাধারন মানুষের সাধারন খুশী সহ্য করতে পারছে না। কিভাবে জানি পৃথিবীকে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটু বেশি বলে ফেলেছি? কেন নয়? চিন্তা করে দেখুন, এমন কোন দেশ নাই যেখানে হামলা হচ্ছে না। বস্তুত পৃথিবীকে কিভাবে জানি একটা সুক্ষ চক্রান্ত করে ২ ভাগে ভাগ করে ফেলা হচ্ছে। ভাল মানুষ বনাম সন্ত্রাসী; যা এখন “মুসলিম বনাম অমুসলিম” ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর ইতিহাস বলে, যখনই বিশাল জনগোষ্ঠী যখন ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন বড় কোন কিছু আসন্ন। এসব কিছুর আর্কিটেকচারটা খুব সুক্ষ। টেইলর করে বানানো হয়েছে যেন প্রতিটি সেগমেন্টকে। বেশীরভাগ দেশই কনফ্লিক্টে জড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি বাংলাদেশের মত নিরীহ দেশও। মানুষের মূল্যবোধে, মানুষের মনুষ্যত্বে আঘাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে যেন প্রতিনিয়ত। হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ। অস্থির হয়ে উঠছে। আজকাল খুন করার পর টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় লাশকে বিনা কাপুনিতে। মানুষের লাশের কোন মূল্য নেই। আসলে জীবন্ত মানুষেরই তেমন ভ্যালু নেই। ভ্যালু আছে শুধু উচু এলিট শ্রেনীর। এলিট শ্রেনী বলতে বুঝানো হচ্ছে বিশ্বের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রন করা সেই শ্রেনীটি যারা নানাদেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কগুলো নিয়ন্ত্রন করে বা যাদের কাছে আছে গ্লোবাল গোল্ড রিজার্ভ।

এসব কিছুর কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারন মানুষ। সব ধর্মের, সব জাতের মানুষ। তারাই মরছে নির্বিচারে। দাবার গুটির মত মরছে। যে ধর্মের আর যে দেশের নাগরিক হোক না কেন। আসলে উপরে উপরে বা মানুষের মনে পৃথিবী মুসলিম এবং অমুসলিম এমন একটা ভাগ দেখানোর চেষ্টা চললেও বস্তুত এখন মনে হচ্ছে এই বিভাগটা হলো সাধারন মানুষ বনাম অসাধারন মানুষ যারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করে। এখানে না আছে কোন ধর্ম, না আছে দেশ বা গোত্র। এখানে শুধু আছে অর্থনীতি আর কিছু না। সুইজ্যারল্যান্ডে কোন গন্ডগোল হয় না কেন জানেন? কারন ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দেশ ছিল নিউট্রাল জোন, যে কারনে পুরো ইউরোপে যুদ্ধে উলটে গেলেও সুইজ্যারল্যান্ডে ছিল শান্তি। আর তার একটাই কারন – সব দেশের টাকা, গোল্ডের রিজার্ভ, সম্পত্তি – সবকিছু সংরক্ষিত ছিল এই দেশে। এখনও আছে। তাই নিজেদের সুবিধাতেই দেশটাকে নিরাপদ রাখা যুদ্দবাজদের দায়িত্ব ছিল।

উপরের উদাহরনটি দেয়ার পেছনে একটাই কারন, সেটা হলো – বুঝতে পারা যে শ্বার্থ ছাড়া কিছুই নাই। আর এই মুহুর্তে এত হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মরার পেছনে কোন না কোন মহলের সবার্থ আছে। আচ্ছা ৩য় বিশবযুদ্ধ হলে সবচেয়ে বেশী লাভ কার হবে? কাদের হবে? ইসস, বাংলাদেশে যদি বড় সড় কোন অস্ত্রের কারখানা থাকত মজা হতো তাই না! আইন্সটাইন বলেছিলেন, “আমি জানিনা ৩য় বিশ্বযুদ্ধে মানুষ কি দিয়ে লড়াই করবে, তবে আমি এটা জানি ৪র্থ বিশ্বযুদ্ধে মানুষ লড়াই করবে লাঠি-সোঠা নিয়ে”। অর্থাৎ সভ্যতার ধ্বংসের দেড়গোড়ায় পোছে যাবে। পুরো পৃথিবীকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে আরেকটা যুদ্ধের দিকে। রিজিওনাল কনফ্লিক্ট অনবরত হচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে রাশিয়া, ইউরোপ। আমেরিকা-ইসরায়েল-মধ্যপ্রাচ্য তো আছেই আগে থেকে। শুধু বাকী আছে এখন চায়না আর ইন্ডিয়া। তবে চীন আর জাপানের মাঝে বিরাজ করছে অস্বস্তি এই মুহুর্তে। একটা দ্বীপ নিয়ে সেখানেও কনলফিক্ট আর এই কনফ্লিক্টের কারিগর নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে। আর ভারত কিন্তু পাকিস্তানের সাথে লেগেই থাকে। তবে তাদের এসব যুদ্ধগুলো আপাতত বড় কোন রুপে নেই তবে হতে কতক্ষন। প্রক্সি দিয়ে ঠিকই যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া যাবে। উস্কানি দেয়া যাবে।

এতসব হচ্ছে, তো আমাদের কি করার আছে? আমরা কি করতে পারি? জানেন কি করতে পারি? চোখ খুলে তাকিয়ে দেখতে পারি। আর কিছু না। আর হ্যা, বড় বড় ব্রেকিং নিউজের মাঝখানে নামী দামী বিজ্ঞাপন দেখে কনজিউমার এর জায়গাটা আজীবন দখল করে রাখতে পারি। আমরা ভোক্তা, আর আমাদের যা দেওয়া হয় আমরা তাই খাই। এটাই চলে আসবে। আর হ্যা, মরলে আমরাই মরব সবার আগে। আর কেউ না। বড় কন্সপিরেসির কাছে আমরা কিছুই না। আমরা বড় সাধারন। We are just some numbers. Thats all.

আপনার মন্তব্য