কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই
August 9, 2016
Bangladeshism Desk (767 articles)
Share

কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই

বাংলাদেশে রসমালাইয়ের নাম বলতেই সবার আগে আসে কুমিল্লার নাম। ১৯শতকের শুরুর দিকে ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়ের হাত ধরেই কুমিল্লায় রসমালাইয়ের প্রচলন শুরু হয়। শুরুতেই তারা রসে ভেতর ছোট ছোট মিষ্টি ডুবিয়ে বিক্রি করত যা অল্প সময়ে খুব খ্যাতি লাভ করে। তখন এর নাম ছিল ক্ষীর ভোগ পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার পর অবাঙালিরা কুমিল্লায় এসে ক্ষীর ভোগকে রসমালাই বলতে শুরু করে। আগে মাটির হাঁড়িতে বিক্রি হতো রসমালাই এরপর পলিথিনের ঠোঙ্গা আর বর্তমানে প্লাস্টিকের পাত্রে বিক্রি হচ্ছে।

সৃষ্টির পর থেকেই রসমালাই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং রসে মাতয়ারা করে তোলে সবাইকে। বিভিন্ন উৎসব-আনন্দ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে রসমালাই কুমিল্লাবাসীর একটি অনুষঙ্গ হয়ে আছে যুগ যুগ ধরেই।বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎকৃষ্ট মানের রসমালাই তৈরি হলেও কুমিল্লার রসমালাইয়ের আলাদাগত বৈশিষ্টের কারনে গ্রাহক চাহিদা আছে প্রচুর। যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান হতে কুমিল্লার রসমালাই এর অর্ডার থাকে প্রতিদিনই যা পার্সেল ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়।  কুমিল্লার কান্দিরপাড় মনোহরপুরে অবস্থিত চাকচিক্যহীন কয়েকটি পুরানো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান আছে যারা বংশ পরাম্পরায় তৈরি করছে ভাল মানের রসমালাই। মূলত এই গুটি কয়েক মিষ্টির দোকানই গুণগত মান ঠিক রেখে কুমিল্লার রসমালাইয়ের ঐতিহ্য এখনো টিকিয়ে রেখেছে।  অন্যদিকে রসমালাইয়ের সুখ্যাতিকে পুঁজি করে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী জড়িয়ে পড়েছে নকল রসমালাই উৎপাদন ও বিক্রিতে। আর সারা কুমিল্লা জুড়ে গড়ে উঠেছে এমনসব নকল ও নিন্নমানের রসমলাই তৈরির শত শত প্রতিষ্ঠান। বিশেষকরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চোখে পড়বে এধরনের অনেক নকল রসমালাইয়ের দোকান যারা বিখ্যাত রসমালাই প্রতিষ্ঠানগুলির নাম ব্যবহার করছে কৌশলে। গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছে এসব নিন্ম মানের ভেজাল রসমালাই খেয়ে, আর তাদের মনে তৈরি হচ্ছে রসমালাই সম্পর্কে  ভ্রান্ত ধারণা।

প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় মনোহরপুরে বিভিন্ন স্তরের মানুষ ভিড় জমায় ভাল টাটকা রসমালাই কেনার জন্য। বেশিরভাগ সময় গরম রসমালাই কিনতে ক্রেতাদের মধ্যে এক প্রকার প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায় আর তখন ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খায় দোকানের কর্মচারীরা। তখন চাহিদা সত্ত্বেও একজন ক্রেতাকে ২কেজির বেশি রসমালাই একসাথে দেয়া হয়না। দেশি-বিদেশী পর্যটকরা বিভিন্নসময় বেড়াতে এসে কিনে নিয়ে যায় কুমিল্লার রসমালাই এমনকি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি করেন শুধু মাত্র রসমালাই কেনার আশায়।

রসমালাই প্রস্তুতকারকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়- ভেজাল না মিশিয়ে গুণগত মান ঠিক রাখলে ৩৬ ঘণ্টায়ও রসমালাই নষ্ট হয় না।  রসমালাই তৈরি হয় খাঁটি তরল দুধ থেকে, দুধকে ভালভাবে ঝাল দিয়ে ফুটানোর পর মিশানো হয় পরিমাণমত চিনি এবং অন্যান্য উপকরণ তারপর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তৈরি করা হয় রসমালাই। তবে ভেজাল রসমালাই প্রস্তুতকারীরা গরুর তরল দুধের পরিবর্তে একচেটিয়া ব্যাবহার করে নিন্মমানের গুড়ো দুধ। সাধারনত ১ মণ দুধ থেকে ১৪/১৫ কেজি রসমালাই তৈরি করা যায় সেখানে ভেজালকারীরা গরুর দুধের সাথে গুড়া দুধ মিশিয়ে ১ মণ দুধ থেকে উৎপাদন করে প্রায় ৩০ কেজি রসমালাই। আর এভাবেই নষ্ট হয় রসমালাইয়ের আসল স্বাদ ও গুণগত মান।

প্রকারভেদে রসমলাইর দাম ভিন্ন হয়, বর্তমানে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকার দরে রসমালাই বিক্রি হচ্ছে কুমিল্লায়। সাধারণ রসমালাইর পাশাপাশি এখন শাহী রসমালাইও পাওয়া যায়। সাধারণ রসমালাই আকারে ছোট আর শাহী রসমালাই তুলনামূলক একটু বড় আকৃতির হয়।  রসমালাই তৈরির উপকরণ চিনি আর গরুর দুধের দাম বৃদ্ধির কারনে রসমালাইয়ের দামেও এর প্রভাব পড়েছে বটে তবে গ্রাহক চাহিদা কোন অংশে কমেনি।

কুমিল্লায় বেড়াতে এলেই এই মিষ্টান্নের স্বাদ চেখে দেখতে ভুল করেন না কেউ, অনেকে সঙ্গে করেও নিয়ে যান পরিবার-পরিজনদের জন্য। বিশ্বাস না হলে ঘুরে আসুননা একবার কুমিল্লায় আর তৃপ্তি ভরে খেয়ে আসুন বিখ্যাত রসমালাই।

আপনার মন্তব্য