চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস
August 11, 2016
Bangladeshism Desk (767 articles)
Share

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

হরিশ্চন্দ্র থেকেই মূলত বর্তমান চাকমা রাজাদের ইতিহাস শুরু

 

♦সৈয়দ ইবনে রহমত♦

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসকে সুপরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হয়েছে। আর এ বিকৃতির মাধ্যমে আড়াল করা হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলে মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাস। মোগল জমিদারদের চাকমা রাজা হিসেবে চিহ্নিত করতে গিয়ে কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে তাদের ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসের উপরেও। ধারণা করা হয়, কলঙ্কময় অতীতকে আড়াল করে ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী করতেই ইতিহাস বিকৃতির সূচনা হয়েছিল। আর ইতিহাস বিকৃতির দলিল হিসেবে তৎকালীন প্রভাবশালীদের তত্ত্বাবধানে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’ শীর্ষক গ্রন্থটি। পরবর্তীতে যারাই পার্বত্যাঞ্চল কিংবা চাকমা জাতির ইতিহাস লিখেছেন তাদের প্রত্যেকেই কম বেশি এই লেখকের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, তারা সতীশচন্দ্র ঘোষের সমালোচনা করেও তার লেখা কল্পকাহিনীকে বিনাসংকোচে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফল যা হবার তা-ই হয়েছে। ইতিহাসের নামে রচিত হয়েছে একের পর এক আজগুবি কাহিনী। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না। এক্ষেত্রেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চাকমা জাতির ইতিহাস রচনার নামে ইতিপূর্বে যেসব আজগুবি কাহিনী রচিত হয়েছে সেসবের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন সত্য অনুসন্ধানী গবেষক জামাল উদ্দিন। দীর্ঘ গবেষণা এবং অনুসন্ধান শেষে তিনি রচনা করেছেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’। যা চাকমা জাতি, চাকমা রাজপরিবার গোপন ইতিহাস এবং পার্বত্যাঞ্চলের প্রচলিত ইতিহাসের ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রাসঙ্গিক কথা

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমানের লেখা পড়ে চাকমা জাতির ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বই সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বিরাজ মোহন দেওয়ান বিরচিত ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত (১৯৬৯)’, সাবেক চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস (১৯১৯)’, মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মীর ‘শ্রী শ্রী রাজনামা’, সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রণীত ‘চাকমা জাতি (১৯০৯)’, সুগত চাকমার ‘বাংলাদেশের উপজাতি (বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫)’, প্রফেসর পিয়ের বেসেইনে প্রণীত Tribesmen of Chittagong Hill Tracts (1957-58)  এর অনুবাদগ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি’ (বাংলা একাডেমী, ১৯৭৭), পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টিএইচ লুইন প্রণীত WILLD RACES OF SOUTH-ESTERN INDIA (1870) এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আদিম জনগোষ্ঠী (উসাই রাঙ্গামাটি, ১৯৯৮)’, লে. কর্নেল টিএইচ লুইন প্রণীত A FLY ON THE WHEEL (1912)-এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লুসাই পাহাড় (উসাই রাঙ্গামাটি, ১৯৯৬), শীর্ষক বইসমূহ পড়ে ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ক্রমেই বেড়েছে। কেননা পার্বত্যাঞ্চলের ইতিহাস বিষয়ক বইগুলো চাকমা রাজবংশের ইতিহাসকেন্দ্রিক রচিত হলেও একটির সাথে আরেকটির বর্ণনার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চাকমা রাজাদের নাম এবং তাদের ধারাবাহিকতার মধ্যেও গড়মিল স্পষ্ট। এক পর্যায়ে হাতে আসে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অশোক কুমার দেওয়ান রচিত ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার (১৯৯১)’, বইটি। এই বইটি পড়ে নিশ্চিৎ হই যে, পার্বত্যাঞ্চল বিশেষ করে চাকমা রাজবংশকেন্দ্রিক চাকমা জাতির ইতিহাসের বেশিরভাগটাই ভিত্তিহীন এবং কল্পনা প্রসূত।

অশোক কুমার দেওয়ানের মূল্যায়ন

চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের তত্ত্বাবধানে লেখা এবং প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’ শীর্ষক বইটি সম্পর্কে অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন, ‘সতীশচন্দ্র ঘোষ তাঁর উপরোক্ত পুস্তকে চাকমা জাতি সম্পর্কীত নানা বিষয় অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বর্ণনা করা সত্ত্বেও তাঁর বইটি স্থানে স্থানে নিতান্ত ভ্রমাত্মক বিবরণে পূর্ণ। এ কারণে তিনি তৎকালীন চাকমা সমাজের অনেকেরই বিরাগভাজন হন। তাঁর পুস্তকে সন্নিবিষ্ট অনেক ভ্রমদুষ্ট তথ্য পরবর্তী ইতিবৃত্তকার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক পন্ডিত ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করেছে। কারণ চাকমাগণের সংগে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুযোগ যাদের নেই চাকমা জাতি সম্বন্ধে জানার জন্য এ পুস্তকটিই ছিল তাদের একমাত্র অবলম্বন। স্বভাতই এই পুস্তকে পরিবেশিত ভুল তথ্যাদি অন্যদেরকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে। সতীশ বাবু নিজেও লুইন সাহেবের পূর্ব প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে অনেক কিছুই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে গ্রহণ করেন এবং নির্বিবাদে তাঁর বইয়ে চালিয়ে দেন। পরে আবার কেউ কেউ সতীশ বাবুর বই থেকে এগুলি ধার করেন। এভাবে অন্যদের মনে চাকমা জাতি সম্বদ্ধে অনেক মারাত্মক ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে।’ ১৯১৯ সালে প্রকাশিত চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের লেখা ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস’ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘পুস্তিকাটি ক্ষুদ্র; বিবরণাদি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত; সেটিকে বংশ তালিকা ছাড়া ঠিক ইতিহাস পুস্তক বলা যায় না।’ একইভাবে মাধবচন্দ্র চাকমা কর্মী, বিরাজ মোহন দেওয়ান সহ পরবর্তী লেখকদের ভুল-ত্রুটি সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পূর্ববর্তী লেখকদের লেখা ইতিহাস এবং তাদের উল্লেখিত সূত্রগুলির দুর্বলতা এবং প্রামাণ্য হিসেবে সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। নানা পর্যালোচনা শেষে পার্বত্যাঞ্চল এবং চাকমা জাতির ভিত্তিহীন ও কল্পনা প্রসূত ইতিহাসের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন, ‘রূঢ় হলেও মন্তব্য করতে হয় যে, পরবর্তী লেখকগণের অধিকাংশ বিবরণ মূলত সতীশচন্দ্র ঘোষেরই চর্বিত চর্বন।’ তিনি অন্যত্র লিখেছেন, ‘ইতিহাসের পথের রেখা খুঁজে নিতে হবে। সে পথের রেখা যতই ক্ষীণ হউক, যতই অস্পষ্ট হউক, যতই দুর্লক্ষ্য হউক আশা করি প্রয়োজনীয় শ্রম এবং যথার্থ নিষ্ঠা সহকারে অনুসন্ধান চালানো হলে সঠিক পথের রেখা একদিন খুঁজে পাওয়া যাবেই। অলীক স্বপ্ন দিয়ে গড়া মায়ার ভুবনে কৃত্রিম স্ফটিকে নির্মিত মনোহর ভবনে বাস করার চাইতে বাস্তব পৃথিবীর কঠিন মাটিতে পত্র পল্লবে ছাওয়া পর্ণকুটিরে বাস করা অনেক শ্রেয়।’ অশোক কুমার দেওয়ান ইতিহাস বিষয়ে তার সুগভীর পান্ডিত্য এবং যুক্তির কষ্টি পাথরে যাচাই করে চাকমা জাতির প্রচলিত ইতিহাসের ভুল-ভ্রান্তি এবং অলীক গল্পসমূহ অনেকাংশে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সঠিক ধারা নির্ণয়ের আগেই তার জীবনাবসান হলে সত্য অনুসন্ধানের একটি সম্ভাবনারও মৃত্যু ঘটে।

দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামের কোন অঞ্চলের অস্তিত্ব ছিল না। আজকের চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র এলাকা তখন একই সাথে ছিল। যদিও বিভিন্ন সময় এর কিছু অংশ কখনো কখনো ত্রিপুরা রাজার অধীন, কিছু অংশ আরাকান রাজার অধীন, কিছু অংশ মোগলদের শাসনাধীন ছিল। যাইহোক, এই অঞ্চলে জনবসতি এবং সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল তৎকালীন দেয়াঙ বন্দর নামের সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে। যা আজকে আমাদের কাছে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর নামেই পরিচিত। আর এ বন্দরের গুরুত্বের কারণে এক সময় এ অঞ্চল দেয়াঙ পরগণা হিসেবেই খ্যাত ছিল। ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার’ বইটি পড়ার কিছুদিন পরেই হাতে আসে ইতিহাস গবেষক জামাল উদ্দিন রচিত ‘দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস (আদিকাল)’। এই বইটিতে লেখক এমন কিছু মোগল জমিদারের নাম এবং তাদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন, যাদেরকে ইতিপূর্বে অনেক লেখক চাকমা রাজা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি চাকমা রাজা হিসেবে পরিচিত ফতে খাঁ, শেরমস্ত খাঁ, শুকদেব, শের দৌলত, জান বক্স খাঁ, টববর খাঁ, জব্বর খাঁ, ধরম বক্স খাঁসহ বেশকিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে  সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সহকারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মোগল জমিদার বলে আখ্যায়িত করেন। একই সাথে তিনি ইতিহাসের এসব অসঙ্গতি লক্ষ্য করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চাকমা জাতির ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই আগ্রহ এক সময় লেখককে নিয়ে যায় শেকড়ের সন্ধানে। চাকমা জাতির শেকড়ের সন্ধান করতে গিয়ে এই গবেষক তার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে আরাকানের আকিয়াব, কক্সবাজার, রামু, আলীকদম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, আসামের মিজোরাম এবং রাঙ্গুনিয়ার পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংগ্রহ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইতিপূর্বে প্রকাশিত পুঁথি, গবেষণাপত্র, বই-পুস্তকসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত। রাঙ্গুনিয়ার মোগলবাড়ি থেকে সংগ্রহ করেছেন রাণী কালিন্দী থেকে বৃটিশ শাসনের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত জমিদারী নিয়ে দুই পক্ষের মামলা-মোকদ্দমার অনেক ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিলপত্র। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, গবেষকসহ অসংখ্য মানুষের সাথে। প্রায় এক দশক ধরে অনুসন্ধান এবং গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে গবেষক জামাল উদ্দিন রচনা করেছেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’।

চমকপ্রদ কিছু তথ্য

ইতিপূর্বে যারা চাকমা জাতির ইতিহাস লিখেছেন তাদের কেউই চাকমা রাজবংশের ইতিহাসকে হাজার বছরের নীচে নামাতে চাননি। তাছাড়া তাদের বর্ণনায় মতান্তরে বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় পর্যন্ত ৭১ জনের নামের তালিকা রয়েছে। অথচ গবেষক জামাল উদ্দিন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিলসহকারে প্রমাণ করেছেন, মোগল জমিদার ধরম বক্স খাঁর মৃত্যুর পর তার প্রথম স্ত্রী কালিন্দী রাণী (যিনি চাকমা সম্প্রদায় থেকে জমিদার পরিবারের বধূ হয়ে এসেছিলেন) বৃটিশদের আনুকূল্যে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা লাভের পূর্বে কোন চাকমা ব্যক্তিত্বের পক্ষে এ অঞ্চলে রাজত্ব বিস্তার দূরের কথা জমিদার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ১৬৭৯ থেকে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চাকমাদের কাছে রাজা হিসেবে পরিচিত ফতে খাঁ থেকে ধরম বক্স খাঁ পর্যন্ত ১৪ জন জমিদারের প্রত্যেকেই ছিলেন মুসলিম এবং মোগল জমিদার। আর চাকমা রাজবংশের তালিকায় ফতে খাঁ’র পূর্বে চাকমা রাজা হিসেবে স্থান পাওয়া কথিত ৫৭ জন রাজার অস্তিত্ত্ব এবং পরবর্তীদের সাথে তাদের সম্পর্কের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি তিনি খুঁজে পান নি। তবে গবেষক জামাল উদ্দিন সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন ধরম বক্স খাঁ’র সম্পর্কে। ধরম বক্স খাঁ জন্মেছিলেন তার পিতা জব্বার খাঁ’র মৃত্যুর ১৮ মাস পর। এ কারণে তৎকালীন জমিদার পরিবারে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এবং একই কারণে জমিদারীতে তার উত্তরাধিকার মেনে নিতে পারেনি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা। কিন্তু একপক্ষ  চালাকি করে ধরম বক্স খাঁ জন্ম নেয়ার পরপরই তাকে পরবর্তী জমিদার মনোনিত করে। এই নিয়ে জমিদারীর প্রকৃত হকদার হোসেন খাঁ’র সাথে মতবিরোধ শুরু হয়। এর জের ধরে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার সম্মুখ যুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছে। বিভক্ত জমিদার পরিবারে এই যুদ্ধের ফল ছিল পরবর্তী একশ’ বছরের বেশি সময় ধরে আদালতে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা। ইতিপূর্বে যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের কেউ কেউ ধরম বক্স খাঁ’র বিষয়ে আলোকপাত করলেও জমিদার পরিবারের ধারাবাহিক বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ পর্যন্ত করেন নি। এমনকি মামলা চলাকালীন সময়ে লেখা ইতিহাসের কোথাও এর ইঙ্গিত পর্যন্ত দেন নি সংশ্লিষ্ট লেখকগণ। গবেষক জামাল উদ্দিন সেই হোসেন খাঁ’র বংশধরদের কাছ থেকে সে সময়ে চলা মামলার দলিলপত্র উদ্ধার করেছেন। আর এসব দলিলপত্রই বদলে দিয়েছে ইতিহাসের গতিপথ।

নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, মোগলদের সাথে চাকমাদের জমিদার-প্রজা সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক ছিল না। তাছাড়া শুধু চাকমারাই এসব জমিদারদের প্রজা ছিল না। বরং তাদের প্রজা হিসেবে ছিল তঞ্চ্যাঙ্গাসহ অন্যান্য কুকি সম্প্রদায়ের লোকেরাও। আরবর্তমান চাকমা রাজবংশের গোড়াপত্তন হয়েছিল কালিন্দী রাণীর মৃত্যুর পর, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ধরম বক্স খাঁ’র কন্যা মেনকা এবং গোপীনাথ দেওয়ান চাকমার সন্তান হরিশ্চন্দ্র রায়ের  ক্ষমতা লাভের মধ্য দিয়ে। আর এই রাজ পরিবারের প্রজা হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ চাকমাই আরাকান থেকে এ অঞ্চলে শরণার্থী হিসেবে এসেছিল ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে, বর্মী রাজা বোধপায়া কর্তৃক আরাকান দখলের কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশের শিকার হয়ে। এছাড়াও এই বইয়ে স্থান পেয়েছে এ অঞ্চলে বসবাসরত অন্যান্য জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনেক অজানা ইতিহাস।

(চলবে…………) 

আপনার মন্তব্য