পুরান ঢাকার বাকরখানি
August 3, 2016
Bangladeshism Desk (754 articles)
Share

পুরান ঢাকার বাকরখানি

বাকরখানি বাংলাদেশে প্রচলিত খাবারগুলির মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি নাম যা পুরান ঢাকাবাসীদের প্রাত্যহিক সকালের নাস্তা হিসাবে খুবি জনপ্রিয়। পুরান ঢাকায় বাকরখানি ‘শুখা’ নামেও পরিচিত। এখানকার অলিতে গলিতে চোখে পড়বে ছোট বড় সব বাকরখানি তৈরির দোকান। ময়দার খামির থেকে রুটি বানিয়ে তা মচমচে বা খাস্তা করে ভেজে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের বাকরখানি তৈরি করে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয় দোকানের সামনে। এটি একটি গোলাকৃতির রুটি যা তৈরি করা হয় প্রধানত গম, দুধ, লবণ, ডালডা, ঘি, পনির এবং খামির দিয়ে। পুরান ঢাকার বাকরখানির স্পেশালিটি হল এখানে সাধারণত ময়দার সাথে স্বাদবর্ধক অন্য কিছু মিশানো হয় না। যদিও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাকরখানি রসালো ও সুমিষ্ট করতে চিনি কিংবা মধু ব্যাবহার করা হয়। পুরান ঢাকায় হাজারো পরিবার আছে যারা বংশপরম্পরায় বাকরখানির কারিগর। বাখরখানি বিশেষত তীক্ষ্ণ স্বাদযুক্ত উপাদান পনির, রোস্ট করা গরুর মাংস এবং মশলাযুক্ত পানীয়র সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় যা এখনও ঢাকার পুরনো অংশে দেখা যায়। প্রসিদ্ধ এই বাকরখানি একটা সময় কখনো কখনো উপঢৌকন হিসেবেও প্রেরিত হতো।

বাকরখানির ইতিহাস নিয়ে দু-এক ধরনের জনশ্রুতি থাকলেও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য যেটা তা হল মির্জা আগা বাকের তাঁর প্রেয়সী খনি বেগম এর নামে ঢাকায় বাকরখানি রুটির প্রচলন করেন। সুস্বাদু এ খাবারের কথা বলতে গিয়ে এখনো পুরান ঢাকার মানুষ আগা বাকের ও খনি বেগমের প্রেমকাহিনীটা স্মরণ করেন। এ রুটি বা বিস্কুটের উৎপত্তি আফগানিস্তানে। আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এটির প্রচলন এখনও বেশ পরিলক্ষিত হয়। ইতিহাস পর্যালোচনায় মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায় বাখরখানি মুগল আমল হতে ঐতিহ্যবাহী একটি রুটি হিসেবে এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে, যার সৃষ্টি আঠারো শতকের মাঝামাঝি কোনএক সময়ে। এখন অব্দি খাবারটি টিকে আছে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে। প্রকৃত বা সাধারণ বাকরখানিতে খুব একটা আহামরি স্বাদ না থাকলেও এ অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রতিদিন সকালে চায়ের সাথে বাকরখানি খাওয়া অনেকটা নেশার মতই। তাছাড়া কোর্মা, শিখ কাবাব এবং মিষ্টির সাথেও বাখরখানি খায় এখানকার মানুষ। ঈদুল আযহা এর উৎসবে কোরবানীকৃত গরু বা খাশীর মাংশের ঝুড়ি দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই রুটি তৈরী করা হয়ে থাকে তখন এই রুটির চাহিদাও কয়েকগুন বেড়ে যায়। চাহিদা এতটাই বেশি থাকে যে মানুষ কোরবানির ১মাস পূর্ব হতে অগ্রিম বাকরখানির অর্ডার দিয়ে রাখে।

ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের দুই পাশেই পর পর অনেকগুলি দোকান আছে যারা বাকরখানি তৈরি করে এছাড়াও লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, চাঁনখারপুল আবুল হাসনাত রোড, হাজারীবাগ, সিদ্দিকবাজার, ইসলামবাগ, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, একরামপুর, গেণ্ডারিয়া, নাজিরাবাজার, দয়াগঞ্জসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকায় রয়েছে বাকরখানির দোকান। আর এখানে বিভিন্ন আকৃতি ও স্বাদের বাকরখানি পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সাধারণ বাকরখানির বাইরে ভিন্নধর্মী হচ্ছে খাস্তা বাকরখানি, চিনি বাকরখানি, নোনতা বাকরখানি, পনির বাকরখানি, ছানা বাকরখানি, নারিকেল বাকরখানি, কাবাব বাকরখানি, ঘিয়ের বাকরখানি, মাংসের বাকরখানিসহ এ খাবারের আরো অসংখ্য পদ।  সাধারণ বাকরখানির দাম কম হলেও কাবাব, পনির এবং মাংস দিয়ে তৈরিগুলোর দাম কিছুটা বেশি।

চাহিদা থাকায় পুরান ঢাকা হতে প্রতিদিন শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে বাকরখানি মোড়কজাত করে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সরবরাহ করা হয়। বাকরখানির চাহিদা অতীতের মত এখনো আছে এবং পূর্বের চেয়ে কোন অংশে বদলায়নি এর চমৎকার স্বাদ। পুরান ঢাকার বনেদি পরিবার ও বিত্তশালী পরিবারগুলোর বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে এখনো মালাই-মাখনের বাকরখানি দিয়ে আপ্যায়নের চল আছে।

তিন শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক এ খাবারটি এখনো খাদ্য পিপাসুদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে। আর আসল স্বাদটি আস্বাদনে আপনাকে অবশ্যই পুরান ঢাকায় যেতে হবে।

আপনার মন্তব্য