হিন্দি কথা বলার প্রবনতা: শ্রেনীহীন মানুষের শ্রেনীবিন্যাস
August 1, 2016
NahidRains (25 articles)
Share

হিন্দি কথা বলার প্রবনতা: শ্রেনীহীন মানুষের শ্রেনীবিন্যাস

সব ইস্যু ছাড়িয়ে এখন ট্যক অব দ্যা টাউন – বাঙ্গালীর হিন্দি কথা বলার অভ্যাস বা বদভ্যাস। প্রথমে ঠিক করেছিলাম এ নিয়ে আমরা তেমন কিছু লিখব না বা কোন স্টাডি পোস্ট করব না কিন্তু অনেকটা বাধ্য হলাম কিছু জিনিষ দেখে। যদিও এগুলো একান্তই আমাদের ভাবনা। তো, বাংলাদেশীদের হিন্দি কথা বলার প্রবনতা কেন? আজলাক মন্ত্রীরাও হিন্দিতে সাক্ষাতকার দেন। ড্যাম স্মার্ট ছেলেমেয়েরাও হিন্দিতে কথা বলে ইন্টারভিউ দেয়। কিন্তু কথা এখানেই শেষ না। এ ঘটনা গুলো ভাইরাল হয়েছে বিধায় আমরা মাতামাতি করছি। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন আপনার ঘরেও হয়তো কেউ না কেউ হিন্দি বলে।

একটা হিন্দি সিনেমা রিলিজ হলে কে দেখে না? সেটা ডাউনলোড করে হোক আর নেটফ্লিক্সে পাওয়া হোক। সিনেমা রিলিজের সাথে সাথে আমাদের দেশের মানুষ সেই হিন্দি সিনেমা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। আর সিনেমা বাদে, হিন্দি টিভি চ্যানেল ঠিক কোন সময় চলে আপনাদের বাসায়? ওহ আচ্ছা, ইন্ডিয়ান চ্যানেলই চলে, দেশী চ্যানেল তো আমরা দেখি না তেমন একটা! তাই না! তাহলে হিন্দি শেখার সোর্সের অভাব নেই। আর বাংলার সাথে মিল থাকার কারনে শেখাটা মনে হয় আরেকটু সহজ।

কিন্তু, কোথায় আমাদের প্রাইড বা আমাদের গর্ব? বাংলা ভাষার গর্ব? হিন্দি কথা বলা কি স্মার্টনেস নাকি? বুঝলাম সারাদিন হিন্দি সিনেমা আর হিন্দি টিভি সিরিয়াল মাথায় ঘুরাফিরা করে কিন্ত তাই বলে কি নিজেদের মান সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে হিন্দিতে কথা বলতে হবে মিডিয়াতে? হাউ এবাউট ইংলিশ? কোনদিন দেখেছেন কোন ভারতীয় হিন্দিভাষীকে বাংলায় কথা বলতে? দেখলে কতজন? একবার মেলবোর্নে দেখেছিলাম নিজ দেশী কজন বন্ধু তাদের ভারতীয় বন্ধুদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে হিন্দিতে আড্ডা দিচ্ছে। এগুলো খুব কমন ব্যাপার বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে। আর এখন বাংলাদেশেও এমন। শপিং সেন্টারে যান আর চায়ের দোকান – দেখবেন হিন্দি গান বাজছে। দোকান বাদ দেন… এফএম রেডিওগুলোর অবস্থা দেখেন। হিন্দি গান ছাড়া তাদের ব্যবসা চলেই না! টিভিতে দেখানো হয় কিনা সেটা শিওর না। একবার আমেরিকার লস এঞ্জেলেস থেকে লন্ডনগামী বিমানে উঠার সময় এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক হঠাত করেই কথায় কথায় প্রশ্ন করে উঠলেন ‘Are you Indian?”। সেদিন মেজাজটা খুব খারাপ করে জবাব দিয়েছিলাম “No Sir, I am Bangladeshi”। একটু রুড করেই বলেছিলাম। কিন্তু তার ঠিক এক দিন পরে, হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে এক বন্ধুর সাথে ক্যামডেন যাওয়ার পথে আরেকজন ব্রিটিশ নাগরিক সেই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল “You are from India right”? আর সেই বাংলাদেশী বন্ধু জবাবে বলেছিল “Yes Mate”। আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এমন বলার কারন কি? তখন সে বলল “তাদের বুঝতে সুবিধা হয়”। What the F___? পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন ঘেন্না লেগেছিল সেদিন। এধরনের আরো ১০০০ উদাহরন আমি নিজেই দিতে পারব। বাকীদের কথা বাদই দেন। অন্য আরেক পরিচিত মানুষকে একবার গুনগুন করে ভারতীয় জাতীয় সংগীত গাইতে শুনেছিলাম।

তাহলে কেন এই হিন্দি প্রীতি? কেন বাংলাকে অবহেলা? আমার মনে হয়, এগুলো আসলে নির্ভর করে পরিবারের উপর। স্কুল-কলেজ বা এলাকার উপর না। পরিবার থেকে শিক্ষাটাই এ ব্যাপারে মুখ্য। আমাদের দেশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছেলেবেলা থেকেই হিন্দি সিনেমা আর হিন্দি সির‍্যাল দেখে অভ্যস্ত। আমি এমনও দেখেছি হিন্দি ডোরেমন না ছাড়লে বাচ্চাটা খাবে না বা সিরিয়াল দেখতে না পারলে আদরের মেয়েটি বাসা মাথায় তুলে। তো এভাবে যদি তারা বড় হয়ে উঠে, স্বাভাবিকভাবেই হিন্দিতে কথা বলাটা তাদের জন্য খুব সাধারন একটা ব্যাপার হবে। এমনকি এটা যে একটা ব্যাপার সেটাও তারা আমলে নিবে না।

আমাদের আরও বোল্ড হতে হবে। আরো বেশী প্রাইড আনতে হবে নিজের মনে – বাংলাকে নিয়ে। নিজেদের ইগোকে সুসংহত করতে হবে। ইগো ব্যাপারটা খুব খারাপ কিছু না। আত্মসম্মান অনেক গুরুত্বপূর্ন। এসব কিন্তু পুরো জাতিকে রিপ্রেজেন্ট করে। তবে আমি একটা ব্যাপার বুঝি না যে কতিপ্য ড্যাম স্মার্ট ছেলেমেয়রা কিভাবে হিন্দিতে কথা বলে? তাদের স্মার্টনেস কই হারিয়ে যায় তখন? আমাদের এই অফিসে ভুলেও যদি কেউ একটা হিন্দি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে তাকে নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি হয়। আমরা বলি “এত খারাপ অবস্থা যে এখন হিন্দি সিরিয়াল দেখ”? আর সেই তাচ্ছিল্য অনেক কাজে আসে। বরং ইংরেজী সিনেমা দেখা অনেক ভাল। আর আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ারও কিছু দায়িত্ব আছে। যেমন প্রায় সময় দেখি পত্রিকায় নিউজ “সালমান খান টয়লেট করতে পারছেন না ৩ দিন” বা “দীপিকা এখন ঘুম” টাইপের নিউজ করতে। বলিউডের তারকাদের উনিশ-বিশ নিয়ে এখানকার বড় বড় পত্রিকাগুলো প্রথম পাতায়  নিউজ করে। জীবনে কোনদিন বাংলাদেশের কোন স্টারকে নিয়ে ভারতের পত্রিকা তেমন কিছু ছাপিয়েছে সেই গুরুত্ব দিয়ে? আর বিয়েবাড়িতে হিন্দি গান-বাজনা আর ইন্ডিয়ান স্টাইলে নাচানাচি বা এধরনের টেন্ডগুলোকে বন্ধ করতে হবে। এগুলো আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। নিজেদের স্বভাবকে বদলাতে হবে। শুনতে খারাপ লাগলেও তাও বলি, এর মধ্যে কজন আত্মীয়ের বিয়েতে গেছেন যেখানে হিন্দি গান বাজেনি?

জানি ভারত আমাদের পাশের দেশ। আর আমাদের মিডিয়াতে তাদের পদচারনা অনেক। একটু ইনফ্লুয়েন্স তো থাকবেই। কিন্তু আমাদের উচিত তাদের ইনফ্লুয়েন্স করা। নিজেদের আরো বোল্ড করা। নিজেদের ইগোকে আরো শক্ত করা। নিজেদের দেশপ্রেমকে, নিজেদের পরিচয় নিয়ে আরো বেশী গর্ব করা। হিন্দিতে কথা বলা কোন স্মার্টনেস না। এটা একটা ক্লাসলেস ব্যাপার। আর এই ব্যাপারটা যারা বুঝতে পারবে না, তাদের যে আসলে কোন শ্রেনীর মানুষ সেটা বলে দেয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। দরকার হলে ইংরেজী বলুন তাহলে অন্তত আইএলটএস স্কোর একটু হলেও ভাল  হবে। কিন্তু দয়া করে নিজের ইজ্জত মেরে আর হিন্দি কথা বলবেন না। আর কত নিজের গায়ে নিজেরা থুথু মারবেন?

আপনার মন্তব্য