হঠাৎ কেন অশান্ত হয়ে উঠল শান্তিপ্রিয় বাঙালীরা

18810
SHARE

কোন পথে প্রিয় স্বদেশ ?! কেমন হবে আগামীদিনের বাংলাদেশ ?!

সেই ছোটবেলা থেকে বরাবরই শুনে এসেছি যে বাঙালী শান্তিপ্রিয় জাতি ! এদেশের মানুষ মিলেমিশে থাকে ! জেনে এসেছি সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এক দেশ, বাংলাদেশ ! মাছে ভাতে বাঙালী ! কারণ এদেশ নদী মাতৃকদেশ ! জালের মত নাকি ছড়িয়ে  ছিটিয়ে এদেশের বুক বেয়ে চলে গেছে কত শত নদী !

কিন্তু হঠাৎ আজ কি হল ! এত অস্থিরতা কেন সুজলা সুফলা এ দেশে ?! হঠাৎ কেন অশান্ত হয়ে উঠল শান্তিপ্রিয় বাঙালীরা ?! তারা নাকি মিলেমিশে থাকত ?! তাহলে আজ তাদের মাঝে এত দ্বন্দ্ব কিসের ?!  কাদের স্বার্থে নিজেদের মাঝে তারা ঝগড়া বিবাদ করছে ?! নদীমাতৃক দেশে পানির জন্য হাহাকার কেন ?! কেনইবা সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি আজ হুমকির মুখে ?!

হঠাৎ করে কি এমন হল ?! সত্যিই কি হঠাৎ করেই হল ?! নাকি ধীরে ধীরে আমাদের অবহেলা আর অগোচরে ঘটে গেল এই বিরাট পরিবর্তন ?! সত্যিই কি আমাদের অগোচরেই ঘটেছে সব ?! যদি অগোচরেই ঘটে থাকবে তাহলে বাংলার বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিম ” আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম……… !!! ”  বলে হাহাকার করেছিলেন কেন ?! কত গায়ক শিল্পী তার সে হাহাকার রঙে ঢঙ্গে নেচে গেয়ে আমাদের শুনিয়েছে !!! আমরা শুনেছি , আমরা আবেগে ভেসেছি ! কিন্তু সচেতন হইনি ! কম দিন তো পার হল না !!!

তার মানে আমাদের অবহেলাই আজকের এ দিনের জন্য দায়ী ! সব শেষের  শেষ বেলায় তাই আজ আমরা দিশেহারা ! দিশেহারা মানুষ গুলো আজ দলে দলে বিভক্ত ! তাদের এক হবার সমস্ত পথ বন্ধ হল বলে !!! যার প্রমাণ মেলে দেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন  জাতীয় ইস্যু গুলতে মানুষের শতধা বিভক্তি !

শাহ আব্দুল করিমদের মত মানুষরা স্বার্থ চিন্তার উর্দ্ধে  উঠে মা মাটি আর দেশকে ভালবেসেছিলেন হৃদয় দিয়ে ; যারা বিশ্বমানবতাকে দেখেছেন মানবতার চোখে ; ধর্মের চোখে নয় , ব্যাবসার দৃষ্টিতে নয় ! তাই ধর্ম আর ব্যাবসার নামে মানুষ গুলো যখন অস্থির ভাবে শত দলে বিভক্ত হতে শুরু করল বাউলের মনে কেঁদে উঠে বলল –

গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান

মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম

হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান – সবার কাছে আজ ধর্মটাই প্রধান ! আব্দুল করিমের ঐ গ্রামের স্বার্থ , গ্রামের সম্প্রীতি সেসব তাদের কাছে আজ তুচ্ছ ! ধর্মটাই আজ সব !!! তাই রামপাল-সুন্দরবন  এর মত জাতীয় গুরুতবপূর্ণ ইস্যুতেও শত বিশ্লেষণের পরও দেখি একটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ বারবার মুক্তিযুদ্ধে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের অবদানকে  চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার  চেষ্টা করে ! সে সময় তাদের মাথায়ই থাকেনা দেশের স্বার্থের কথা !  আরেকটি ধর্মীয় সম্প্রদায় তখন খেপে উঠে তাদের নতুন যুগের রাজাকার বলে গাল দিতে শুরু করে ! তাদের যুক্তি , স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজাকাররা ধর্মের নামে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে ! আর আজ এরা ধর্মের খাতিরে দেশের সম্পদ বিকিয়ে দিতে সমর্থন যোগাচ্ছে নির্লজ্জের মত !! তাদের এই ধর্ম যুদ্ধের ব্যাস্ততার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে সব ! কারণ দেশ তো ঐক্যহীন !  সেদিকে তাদের লক্ষ্যই নাই ! অথচ এদেশ স্বাধীন হয়েছিল জাত  ধর্ম নির্বিশেষে দেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে ! অর আজ তাদের উত্তরসূরিদের কাছে সে দেশ গুরুত্ব হারিয়েছে !

আব্দুল করিমরা হিন্দু বাড়ির যাত্রা গানের নিমন্ত্রণ পাইতেন  ! জারি গান, বাঊল গানে আনন্দের তুফান ছুটত তখন ! সারি গান গেয়ে তারা নৌকা দৌড়াইতেন ! কিন্তু আজ যদি আব্দুল করিম তার জন্মভূমির পক্ষে কিছু বলতেন আর সেটা ভারতের বিপক্ষে চলে যেত তাহলে কি তিনিও দেশপ্রেমিক নাহয়ে পাকিস্তানপ্রেমিক হয়ে যেতেন ?! খোদ নিজের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের কাছে তিনি ভিলেইন হয়ে যেতেন ! আমরা এতটাই ধর্মান্ধ হয়ে পড়েছি যে নিজেদের  দেশের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে রাজি হয়ে বসে আছি !  তাহলে আমাদের আর ঐ ধর্মান্ধ জঙ্গিদের মাঝে পার্থক্য কোথায় ?! ওরা অস্ত্র হাতে পথে নেমেছে আর আমরা নামার অপেক্ষায় আছি এই তো ?! বড় ব্যাথা লাগে যখন নিজের দেশের পক্ষে কথা বলার অপরাধে নিজ দেশের কেউ এই বলে শাসায় যে , ” তোমায় বধিবে যে , সে বাড়িছে গোকুলে ”  !  

কে হবে মেম্বার, আর কে বা হবে সরকার – শাহ আব্দুল করিমরা তার খবর রাখতেন না ! কিন্তু আজ দেশের পার্বত্যাঞ্চলে কে মেম্বার হচ্ছে কে সরকার হচ্ছে সে সব নিয়ে সোর উঠেছে ! একদল মানুষ হাহাকার তুলেছে ভূমি জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হবার আশংকায় ! আর আরেক দল দাঁতে শান দিচ্ছে মরণ কামড় বসাবার জন্য ! দিন যে তাদের এলো বলে !

আব্দুল করিম বলেন, ” দিন হতে দিন,

আসে যে কঠিন

করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম

দিনের হিসেব সমাজ সচেতন জীবন সচেতন আব্দুল করিমও খুঁজে পাননি !

তাই ভাবছি কেমন হবে সে দিনগুলো যেদিন  সর্বনাশের খেলা সাঙ্গ হবে , সর্বনাশা  খেলোয়াড় ক্লান্ত হবে ; আর সাগর , নদী , বন , পাহাড় হারিয়ে শতধা বিভক্ত বিভ্রান্ত অদূরদর্শী বাঙ্গালী জাতি সেদিন কোন পথে যাবে !

সেদিনও কি তারা কলহ বিবাদে জড়িয়ে থাকবে ?!

পরম করুণাময়ের দরবারে আকুল ফরিয়াদ এইযে , ” হে মহান, সেদিন অন্তত এদের ভুল থেকে মুক্তি দিও ! এক হবার সুযোগ দিও ! হয়ত তাতে হারান পাহাড়, নদী, বন, সাগর এরা ফিরে পাবেনা ; কিন্তু একে অন্যের হৃদয়ের উষ্ণতা তো পাবে !!! ” !  

আপনার মন্তব্য