চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস (২য় অংশ)

15524
SHARE

২য় অংশ

গোপন করা ইতিহাসের উপাদান

১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলা পিছু ধাওয়া করলে শাহ সুজা তার অনুগত ফতে খাঁ, গোলাম হোসেন খাঁ, শের জব্বার খাঁ, নুরুল্লা খাঁ, শের দৌলত খাঁসহ ১৮ জন সেনাপতি এবং তাদের অধীনে বিপুল সংখ্যক মোগলযোদ্ধাদের নিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে নাফ নদীর তীরে পৌঁছান। কিন্তু আরাকান রাজের শর্ত মোতাবেক সকল যোদ্ধাদের সেখানেই বিদায় জানিয়ে মাত্র ২০০ জন দেহরক্ষী নিয়ে নাফ নদী পারি দিয়ে আরাকানের রাজধানী ম্রোহং-এ উপস্থিত হন শাহ সুজা। কিন্তু আরাকান রাজের বিশ্বাসঘাতকতায় শাহ সুজা ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসেই আত্মীয় স্বজন সহ অত্যন্ত করুণভাবে নিহত হন। এই অবস্থায় নাফ নদীর এপারে থেকে যাওয়া মোগল সেনাপতিগণ তাদের বাহিনী নিয়ে আর কোথাও না গিয়ে অত্র অঞ্চলেই বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সন্মুখে আরাকান বাহিনী এবং পেছনে মীর জুমলার বাহিনীর ভয় থাকায় মোগল সেনারা অপেক্ষাকৃত দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে তাদের প্রথম দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। ইরানের শিয়া বংশোদ্ভূ’ত মোগলযোদ্ধারা ঐ এলাকার নামকরণ করেন হযরত আলীর নামানুসারে ‘আলীকদম’। আলীকদমে দুর্গ প্রতিষ্ঠা করে নারীবিহীন মোগলযোদ্ধারা সে সময় অত্র অঞ্চলে উদ্ভাস্তু হিসেবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপজাতীয় রমণীদের সাথে সংসারজীবনে আবদ্ধ হতে থাকেন। একই সাথে তারা জুমিয়া মগ, চাকমাসহ অন্যান্যদের জুম চাষাবাদে নিয়োজিত করে আলীকদমে প্রতিষ্ঠা করেন জুমিয়া জমিদারী। জুমিয়ারা এসব মোগল জমিদারদের রাজা বলেই মান্য করত। তাদের সিলমোহরে ব্যবহৃত হিজরী সন হিসেবে আলীকদমে জমিদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যথাক্রমে রাজা ফতে খাঁ, রানী সোনাবি, রাজা শের জব্বার খাঁ, রাজা নুরুল্লা খাঁ, রাজা চন্দন খাঁ এবং রাজা জালাল খাঁ। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন শাহ সুজার সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মাধ্যক্ষ বা সেনাপতি।

বিভিন্ন সময় উত্থান পতনের পর আলীকদম থেকে এই জমিদারী ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে সরে আসে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। আর এখানে প্রথম রাজত্ব করেন শেরমস্ত খাঁ (১৭৩৭-১৭৫৩ খ্রি.)। এরপর যথাক্রমে রাজা শুকদেব (১৭৫৩-১৭৫৮ খ্রি.), রাজা শের জব্বার খাঁ (১৭৫৮-১৭৬৫ খ্রি.), রাজা শের দৌলত খাঁ (১৭৬৫-১৭৮২ খ্রি.), রাজা জানবক্স খাঁ (১৭৮২-১৮০০ খ্রি.), রাজা তব্বার খাঁ (১৮০০-১৮০১ খ্রি.), রাজা জব্বর খাঁ (১৮০১-১৮১২ খ্রি.), রাজা ধরম বক্স খাঁ (১৮১২-১৮৩২ খ্রি.) এবং রাণী কালিন্দী (১৮৪৪-১৮৭৩ খ্রি.) রাজত্ব করেন।

রাঙ্গুনিয়ার এই রাজন্য বর্গের মধ্যে শেরমস্ত খাঁ থেকে রাজা জব্বর খাঁ পর্যন্ত সবাই ছিলেন মোগল সেনাপতি বা তাদের বংশধর এবং এরা সবাই ছিলেন মুসলমান শাসক। কিন্তু এই জমিদার পরিবারে বিপত্তি শুরু হয় ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে রাজা জব্বর খাঁ অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর থেকে। আর রাজা জব্বর খাঁর মৃত্যুর ১৮ মাস পর তার স্ত্রীর গর্ভে ধরম বক্স খাঁ’র জন্ম হলে জমিদার পরিবারের ভাগ্যাকাশে নেমে আসে কালো মেঘ। কেননা ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তব্বার খাঁ’র মৃত্যুর সময় তার পুত্র হোসেন খাঁ (মীর্জা হোসেন) নাবালক থাকায় তারই (তব্বার খাঁ) সহোদর জব্বার খাঁ জমিদারী লাভ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতে জব্বর খাঁ অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করায় জমিদারীর প্রকৃত হকদার ছিলেন হোসেন খাঁ (মীর্জা হোসেন)। কিন্তু ধরম বক্স খাঁ’র জন্ম নেয়ার পর জমিদারীর উত্তরাধীকার নিয়ে চক্রান্ত শুরু করে একটি পক্ষ। ফলে একদিকে জৈনক ঢোলবাদক আর জব্বর খাঁ’র স্ত্রীকে জড়িয়ে নানা রটনা আর অন্য দিকে সদ্যভূমিষ্ঠ বিতর্কিত এই শিশুকে ঘিরেই জমিদারীর উত্তরাধীকার প্রতিষ্ঠার নীল নকশা জমিদার পরিবারকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়।

ধরম বক্স খাঁ’র পক্ষালম্বনকারীরা তাদের চক্রান্ত বাস্তবায়নে এই সময় বৃটিশদের সহায়তা কামনা করে। আর বৃটিশরাও বিশৃঙ্খলার সুযোগ পেয়ে প্রবেশ করে এই অভিজাত মোগল পরিবারে। মুসলিম এবং মোগলদের কোণঠাসা করতেই ইংরেজরা শিশু ধরম বক্স খাঁ’র পক্ষ নিয়ে হোসেন খাঁ’র পক্ষের উপর চড়াও হয়। দ্বিধাবিভক্ত জমিদার পরিবার একাধিকবার সন্মুখ যুদ্ধসহ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বৃটিশদের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় জমিদারীর প্রকৃত হকদার হোসেন খাঁ বঞ্চিত হয় এবং জমিদারী চলে যায় ধরম বক্স খাঁ’র হাতে। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র বিশ বছর বয়সে রাজা ধরম বক্স খাঁ অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করায় কোর্ট অব অডার্সের মাধ্যমে ইংরেজ সরকার মোগল বংশাজাত সুখলাল খাঁকে জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে। কিন্তু চাকমা সম্প্রদায় থেকে আসা ধরম বক্স খাঁ’র স্ত্রী কালিন্দী রাণী এটাকে মেনে না নিয়ে নিজেকে জমিদারীর দাবিদার বলে আদালতে মামলা করেন এবং দীর্ঘ ১২ বছর লড়াই করে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে তার অনুকূলে রায় পান। তারপর থেকে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমিদারী পরিচালনা করে মৃত্যু বরণ করেন তিনি। রাণী কালিন্দীর মৃত্যুর পর রাজা ধরম বক্স খাঁ’র কন্যা এবং তার স্বামী গোপীনাথ দেওয়ানের ঔরসজাত সন্তান হরিশ্চন্দ্র রাজা হন। আর এই হরিশ্চন্দ্র থেকেই মূলত বর্তমান চাকমা রাজাদের ইতিহাস শুরু।

রাজা হরিশ্চন্দ্র কালিন্দী রাণীর নির্দেশে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সরকারকে সহায়তা করার উপহার স্বরূপ রায়বাহাদুর খ্যাতাব লাভ করেছিলেন। এবং তিনিই রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ত্যাগ করে তার জমিদারীকে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করেন। রাঙ্গামাটিতে রাজত্ব করেছেন যথাক্রমে হরিশ্চন্দ্র রায় (১৮৭৩-১৮৮৫ খ্রি.), রাজা ভুবন মোহন রায় (১৮৯৭-১৯৩৩ খ্রি.), রাজা নলিনাক্ষ রায় (১৯৩৫-১৯৫১ খ্রি.), রাজা ত্রিদিব রায় (১৯৫৩-১৯৭১ খ্রি.), রাজা কুমার সুমিত রায় (১৯৭২-১৯৭৭ খ্রি.) এবং রাজা দেবাশীষ রায় (১৯৭৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)।

তবে ধরম বক্স খাঁ’র সময় থেকে শুরু হওয়া জমিদার পরিবারের দ্বন্ধ-সংঘাত আর কোনদিনই শেষ হয়নি। বরং একাধিকবার যুদ্ধের পাশাপাশি এই দুই দলের মামলা চলেছে বৃটিশরা এই দেশ থেকে চলে যাওয়ার পর জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত। কালিন্দী রাণীকে বৃটিশদের পাশাপাশি চাকমা, তঞ্চ্যাঙ্গা এবং মার্মারা সহায়তা করায় যুদ্ধে উভয় পক্ষে বহু হতাতহ হলেও জয় হয় কালিন্দী রাণীরই। তবে মামলায় কোন কোন সময় জয় লাভ করেছে হোসেন খাঁ’র পক্ষও। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২২ তালুকের জমিদারী হোসন খাঁ’র হাতে চলে যাওয়ার মামলা। ঐতিহাসিক এই মামলার রায়ের দলিলটিসহ সেসময়ে চলা অনেক মামলার দলিল এবং মোগল জমিদারদের অনেক তথ্য-উপাত্ত আজও রাঙ্গুনিয়ায় মোগল পরিবারের সদস্য মীর্জা মোহাম্মদ সৈয়দ এর কাছে সংরক্ষিত আছে। এমনকি মগী জরিপের ছিটায়ও উক্ত ২২ তালুকের জমিদারীর অকাট্য প্রমাণ নিহিত আছে। মামলায় হেরে গিয়ে তখন হরিশ্চন্দ্র চরম বেকায়দায় পড়ে যান। এমনকি শুধু বসতবাড়ি ব্যতীত স্থলভাগে উত্তরে রাণীরহাট থেকে দক্ষিণে কর্ণফুলীর তীর পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়ার ২২ তালুকের জমিদারী হোসেন খাঁ’র (মীর্জা হোসেন) হাতে চলে যায়। আর এ কারণেই তাকে (হরিশ্চন্দ্র) রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ছেড়ে রাঙ্গামাটিতে স-পরিবারে চলে যেতে হয়। কিন্তু রাঙ্গামাটিতে চলে যাওয়ার পরও চলতে থাকে উভয় পক্ষের মামলা-মোকদ্দমা।

হরিশ্চন্দ্রের মৃত্যুর পর তার পুত্র নলিনাক্ষ রায় জমিদারী লাভ করেন। এক পর্যায়ে নলিনাক্ষ রায় তার প্রতিপক্ষ হোসেন খাঁ’র বংশধর মীর্জা ওয়াজেদ আলী এবং তার বংশধরগণ মোগল বংশীয় নয় বলে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেন। চট্টগ্রাম আদালতে তৎকালে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই মামলার শুনানিতে মীর্জা ওয়াজেদ আলী আদালতে হাজির করেন ভারতের শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর প্রদত্ত এক সনদ। ঐ সনদ এবং তাদের কাছে বংশানুক্রমে সংরক্ষিত অন্যান্য প্রামাণ্য দলিলের উপর ভিত্তি করে অবশেষে চট্টগ্রাম জজ আদালত রায় ঘোষণা করে, রাঙ্গুনিয়া মোগলবাড়িতে বসবাসরত মীর্জা হোসেনের বংশধররা প্রকৃতই মোগল এবং তাদের আদি পুরুষ সুদূর দিল্লীর অধিবাসী ছিলেন বলেও প্রত্যয়ন করা হয় এই রায়ের মাধ্যমে।

আপনার মন্তব্য