চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস (৩য় অংশ )

8898
SHARE

পূর্ব প্রকাশের পর  পর্ব – ১ | পর্ব ২ 

♦সৈয়দ ইবনে রহমত♦

ইতিহাস বিকৃতিতে চাকমা রাজপরিবারের ভূমিকা

দুই পক্ষের মামলা এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলা অবস্থায় রাজা ভুবন মোহন রায়ের সময় চাকমা রাজপরিবারের গৃহশিক্ষক সতীশচন্দ্র ঘোষ, চাকমা জাতি এবং চাকমা রাজপরিবারের ইতিহাস বিষয়ে ‘চাকমা জাতি’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পায়। যার পত্রে পত্রে- ছত্রে ছত্রে তৎকালীন চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের নির্দেশনা রয়েছে বলে সতীশচন্দ্র ঘোষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বইটি তাঁকেই উৎসর্গও করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, তখনো জমিদারী নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা চলমান এবং মোগল মুসলিম জমিদারদের সাথে এই রাজপরিবারের সংশ্লিষ্টতার কোন কিছুই এই বইটিতে স্থান না দিয়ে প্রকৃত ইতিহাস গোপন করা হয়। চাকমা রাজপরিবারের কয়েক শতাব্দীব্যাপী ইতিহাস রচনায় সতীশচন্দ্র ঘোষের প্রধান সূত্র ছিল আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং’ নামক একটি পুঁথি (অশোক কুমার দেওয়ান অবশ্য তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানেও কথিত এই পুঁথিটির লিখিত কোন কপির খোঁজ পাননি)। কিন্তু সতীশচন্দ্র ঘোষের উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ করে এই সূত্রটির দুর্বলতা সম্পর্কে অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন, “ইতিহাস হিসেবে পুঁথিটির গুরুত্ব এবং তাতে সন্নিবেশিত তথ্যগুলির প্রামাণ্যতা সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ আছে। — দেঙ্গ্যাওয়াদির কাহিনীকার তুলনামূলকভাবে একেবারে আধুনিক কালের ঐতিহাসিক বিবরণে যে প্রকার অবাস্তব, আজগুবী কাহিনীর অবতারণা করেছেন তাতেই মনে হয় যে এই পুঁথিটি আমাদের দেশে গ্রাম্য কবিগণের রচিত বিবিধ পল্লীগাঁথার অনুরূপ নিম্নমানের একটি পুঁথিমাত্র” (পৃ. ২২)। সতীশচন্দ্র ঘোষের পর ভুবন মোহন রায় নিজেই ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই সময় ভুবন মোহন রায় নিজে মামলায় জড়িত থাকার পরও তার পুস্তিকায় এসব বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে কোন প্রকার সূত্র এবং প্রামাণ্য দলিলের উল্লেখ ছাড়াই নিজেদেরকে কথিত প্রাচীন চাকমা রাজা বিজয়গিরির উত্তরাধিকার হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভুবন মোহন রায় সতীশচন্দ্র ঘোষকে টেক্কা দিয়ে ‘চাকমা জাতি’ গ্রন্থে উল্লেখিত রাজাদের তালিকায় প্রাচীন রাজা বিজয়গিরিরও পূর্বে রাজত্ব করেছেন এমন এক ডজনের বেশি রাজার নাম যুক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি এসব রাজাদের নামের তালিকা কোথায় পেলেন তার কোন ব্যাখ্যা বা সূত্র উল্লেখ করেন নি। পরবর্তী ইতিহাস রচয়িতারা এই দুটি গ্রন্থকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরেই এগিয়েছেন। কেউ কেউ কিছুটা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করে নতুনভাবে লেখার চেষ্টা করেছেন ঠিকই, কিন্তু তারা সত্যের সন্ধান আর পান নি অথবা সযতনেই এড়িয়ে গেছেন সত্যকে। ফলে এতদিন চাকমা রাজপরিবার কেন্দ্রিক রচিত হয়েছে চাকমা জাতির ইতিহাস নামের অনেক জঞ্জাল। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে বর্তমান রাজপরিবারের সাথে চাকমাদের অতীত কোন যুগসূত্রই নেই। এই সম্বন্ধটা অতিসাম্প্রতিক। চাকমা রাজপরিবারে রক্ষিত ইতিপূর্বে ব্যবহৃত ৯টি সিলমোহরের মধ্যে ৮টিই আরবিতে লেখা, এগুলোর একটিতে ‘আল্লাহু রাব্বি’ লেখা রয়েছে। শেরমস্ত খাঁ থেকে ধরম বক্স খাঁ পর্যন্ত প্রত্যেক জমিদারের নামই মুসলমানি স্মারক, তাদের স্ত্রীদের নামের সাথেও অভিজাত মুসলিম নারীদের অনুরূপ খেতাব উপস্থিত। এছাড়া তাদের কাছে রক্ষিত প্রাচীন সমরাস্ত্রগুলোও জামাল উদ্দিনের এই গবেষণাকে সত্য বলে প্রত্যয়ন করে। যদিও সতীশচন্দ্র ঘোষ এসব নির্ভেজাল ঐতিহাসিক উপাদানের বিষয়কে বিবেচনায় না নিয়ে অনুমান নির্ভর কল্প কাহিনীকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবে এসব প্রমাণের ভিত্তি যে খুবই দুর্বল তা সতীশচন্দ্র ঘোষ নিজেও অনুধাবন করেছিলেন, যা তিনি স্বীকারও করেছেন।

মুসলিম পরিচয় গোপন

চাকমারা মূলত রাণী কালিন্দীর সময় আরাকান থেকে আসা মারমা জনগোষ্ঠীর সাথে ভিক্ষুদের দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মের সংস্পর্শে আসে। তাই চাকমাদের ধর্ম পরিচয় সম্পর্কে মারমাদের মূল্যায়নটাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাপ্টেন লুইন এবং সতীশচন্দ্র ঘোষসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোকপাত করেছেন। চাকমাদের উৎপত্তি, বিস্তার এবং ধর্ম পরিচয় নিয়ে মারমাদের বিশ্বাস সম্পর্কে ক্যাপ্টেন লুইন-এর বর্ণনা থেকে সতীশচন্দ্র ঘোষ ‘চাকমা জাতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ইহাদিগের উৎপত্তি ও বিস্তৃতিমূলক এরূপ নানাবিধ কিম্বদন্তী শুনিতে পাওয়া যায়। মঘেরা (চাকমা ও অন্যান্যরা মারমাদের মঘ নামেই অবহিত করে থাকে) বলে, ইহারা মেগাল বংশধর। কোন সময়ে চট্টগ্রামের (মুসলমান) উজীর কতগুলি সৈন্য সংগ্রহ করিয়া আরাকান রাজ বিরুদ্ধে অভিযান করেন। তাঁহারা পথিমধ্যে এক বিশুদ্ধচারী ‘ফুঙ্গীর’ (বৌদ্ধ যাজক) কুটীর পার্শ্ব দিয়া যাইতেছিলেন। তখন ফুঙ্গী উজীরকে তদীয় আশ্রমে কিয়ৎকাল বিশ্রাম করিয়া যৎকিঞ্চিৎ আহার্য গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিলেন। কথা রহিল অতি সত্ত্বরেই ভক্ষ্য প্রস্তুত করিয়া দেওয়া হইবে। তাহাতে উজীরও সম্মত হইলেন। কিছুক্ষণ পরে পাকের বিলম্ব দেখিয়া তিনি জনৈক সৈনিককে তত্ত্ব জানিবার জন্য পাঠাইলেন। সে আসিয়া কুটীরে প্রবেশ করতঃ দেখিল, ফুঙ্গী একটি পাত্রে চাউল ও মাংস দিয়া উনানের উপর স্থাপন করিয়াছেন। কিন্তু উনানে কাষ্ঠ দেওয়া হয় নাই। তৎপরিবর্তে ফুঙ্গী পাত্র নিম্নে পদদ্বয় রাখিয়াছেন- অংগুলিসমূহ হইতে অগ্নিশিখা উত্থিত হইতেছে। সে এই অলৌকিক দৃশ্যে অতীব বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া প্রভুকে আসিয়া বিবৃত করিল। ইহাতে তিনি রাগান্বিত হইয়া বলিলেন, তাদৃশ প্রক্রিয়ায় কখনও অন্ন পরিপক্ক হইতে পারে না। অনন্তর তিনি সৈন্যগণকে পুনর্যাত্রার নিমিত্ত আদেশ করিলেন। এদিকে সেই বিশুদ্ধচেতা ফুঙ্গী অতিথিগণকে অভ্যর্থনা করিতে আসিয়া দেখিলেন যে, তাঁহারা চলিয়া গিয়াছেন। ইহাতে তিনি অতিশয় মর্মাহত হইয়া সসৈন্যে উজীরকে অভিশপ্ত করিলেন। তাঁহাদের প্রতি এক জাদুময় তেজঃপ্রেরিত হইল। তাহারই ফলে আরাকান রাজের সৈন্যসম্মুখে উপনীত হইলে তাঁহাদের চিত্তবল বিলুপ্ত প্রায় হইয়া গেল- অনায়াসেই পরাজিত এবং বিপক্ষের হস্তে বন্দীভূত হইলেন। আরাকানেশ্বর এই মোগলগণকে স্থানীয় অধিবাসীদের হইতে পতœী গ্রহণের অনুমতি দিয়া স্বীয় রাজ্যে দাসরূপে স্থাপন করিলেন। ইহারা ক্রমেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া বর্তমান চাকমা জাতিতে পরিণত হইয়াছে” (পৃ. ৫-৬)। এই ঘটনায় ফুঙ্গী ও তাঁর মাংস রান্নার বিষয়টি সম্ভত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী মারমাদের কাছে অতিভক্তির কারণে বা কল্পিতভাবেই এসেছে। কেননা বৌদ্ধরা নিরামীষভুজি না হলেও তারা প্রাণী হত্যায় বিশ্বাসী না। তবে চাকমাদের মোগল বংশধর হওয়ার বিষয়টির সাথে আধুনিক গবেষণা ফলও সমার্থক। এমনকি এ বিষয়টি সতীশচন্দ্র ঘোষের সময়কালেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি ঘটনাটি তার পুস্তকে উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “চট্্রগ্রামে মোগালাধিকার স্থায়ীরূপে সংস্থাপিত হইয়াছিল, আড়াইশত বৎরেরও কম; ইহার দেড়শত বৎসর পূর্ব হইতে চেষ্টা আরম্ভ হইয়াছিল মাত্র। পূর্বোক্ত প্রবাদ সত্য হইলে চাকমা জাতির উৎপত্তিকাল তিন শত বৎসরের অধিক হইতে পারে না, সুতরাং ইহা একেবারে অসম্ভব। বোধ হয় চট্টগ্রামে-মুসলামান-প্রাবল্য-সময়ে এই করদ রাজন্যবর্গ এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার ‘খাঁ’ ‘বিবি’ প্রভৃতি সম্মানাষ্পদ খেতাব গ্রহণ করিয়াছেন। এমন কি ইহাদের জড় কামানও কালু খাঁ, ফতে খাঁ, প্রভৃতি গৌরব বাচক খাঁ আখ্যা লাভ করিয়াছিল। সেই সঙ্গে দু’ একটি মুসলমানী সংস্কার এবং আদব কায়দাও প্রবেশ লাভ করিয়াছে, ইহা অবশ্য মানিয়া লওয়া যায়” (পৃ. ৬-৭)। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট, যেকোন কারণেই হোক চাকমাদের বিশেষ করে চাকমা রাজ বংশের স্বল্পকালীন ইতিহাসের বিষয়টি লেখকের পক্ষে স্বীকার করে নেয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই তিনি প্রকৃত সত্য অস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। একই কারণে তাদের মুসলমান পরিচয় আড়াল করে কিছু দুর্বল কাহিনী তথা উপকথাকে ব্যবহার করে দীর্ঘ অলীক ইতিহাসের অবতারণা করেছেন।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

( চলবে ……)

আপনার মন্তব্য