ফেরার অপেক্ষায় মসলিন…

9944
SHARE

মসলিন সাধারণ কোন কাপড় নয় এটি উন্নত মানের কার্পাস তুলার আঁশ থেকে চরকায় তৈরী সূক্ষ্ম এক প্রকার কাপড় বিশেষ যা অতি আরাম দায়ক। প্রাচীন মিসরীয় পিরামিড গুলোতে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের মমি গুলোতে মসলিন কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায় তাই সহজে অনুমেয় মসলিনের আবিস্কার হাজার বছর বা তারও আগে। মসলিন কোন ফার্সি বা আরবি শব্দ নয়, ইতিহাস পর্যালোচনা করে এবং প্রাচীন নথি থেকে জানা যায় মসলিন শব্দটি এসেছে মসূল শব্দ থেকে। মসূল ইরাকের একটি বিখ্যাত ব্যাবসা কেন্দ্রের নাম, একসময় ঢাকারমত এই শহরেও এক প্রকার সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি হত যাকে ইংরেজরা মসলিন বলত। যদিও নিখুঁত হস্ত শিল্পের কারনে দেশ বিদেশে ঢাকার মসলিনের কদর ছিল আকাশচুম্বী। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল, আরব পর্যটক ইবনে বতুতা, ফরাসি পর্যটক ট্যাগনিরে সহ আরো অনেকের লেখায় উঠে এসেছে মসলিনের কথা। ইতিহাসের এসব থেকে জানা যায় ঢাকা জেলার প্রতিটি গ্রামেই কম বেশি তাঁতের কাজ হতো। কিন্তু সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মসলিন তৈরীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল পূর্ব বাংলার সোনার গাঁ,  ধামরাই, তিতবাড়ী, জঙ্গলবাড়ী, বাজিতপুর ও বিক্রমপুর।

 

সূক্ষ্মতা, বুননশৈলী আর নকশার পার্থক্যে বিভিন্ন প্রকার মসলিনের আলাদা আলাদা নাম হয়ে যায়। তারমধ্যে মলবুস খাস, মলমল খাস এবং সরকার-ই-আলা হচ্ছে উঁচুমানের মসলিন যা পরিধান করত তৎকালীন নবাব ও সম্রাটরা এবং রপ্তানি হত বিদেশে। এই মসলিনের বিশেষত্ব ছিল এগুলা লম্বায় হত ১০ গজ,  প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন ছিল ৬-১০ তোলা। এর বাইরে অন্যান্য মসলিনের মধ্যে আছে- ঝুনা, আব-ই-রওয়ান, খাসসা, শবনম, নয়ন সুখ, বদন খাস, সর-বন্ধ, ডোরিয়া ও জামদানী। এগুলা তুলনামূলক একটু কম সূক্ষ্ম ছিল যা লম্বায় হতো ২০ গজ,  চওড়ায় ১ গজ, আর ওজন হতো ২০ তোলা মত।

 

জনশ্রুতি আছে যে অতি সূক্ষ্মতার কারনে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিন কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো। এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বটে তবে  মসলিনের কাপড়ের সূক্ষ্মতা এবং হালকা আরামদায়কভাব নিয়ে কোন বিতর্ক নেই।

 

মসলিন তৈরির কাজটি ছিল ভীষন জটিল, কঠিন, সময়সাধ্য ব্যাপার- এটি তৈরির জন্য দরকার হতো অসামান্য নৈপুণ্য আর ধৈর্য।  কয়েকধাপে তৈরি হতো মসলিন কাপড়, তাহলো, সুতা নাটানো, টানা হোতান, সান বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাধাঁ আর সবশেষে কাপড় বোনা। আর এই প্রক্রিয়া শেষ করতে একজন তাঁতিসহ দু’জন সহকারীর সময় লাগতো প্রায় দু-তিন মাস। মসলিন তৈরি শেষে ওগুলো ধোয়া হতো সোনারগাঁ’র কাছে এগোরো সিন্ধুর পানি দিয়ে যা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। পানির গুনে হতো এমনটি নয়, এর সাথে ছিল ভাল ক্ষার, সাবান এবং ধোপার বিশেষ দক্ষতা। তৎকালীন সময়ে মসলিন ধোপার জন্য একটা শ্রেনীর মানুষই তৈরি হয়েছিল যারা নিয়মিত এই কাজই করতেন।

আঠারো শতকের শুরুতে একটি মসলিন কাপড় ধুতে খরচ হত দশ টাকা। ধোয়ারকালে কাপড়ে কোন প্রকার দাগ লাগলে ফলের রস দিয়ে যত্নসহকারে তা তোলা হত। কাপড় ধোয়ার সময় যদি কোন সুতা সরে যায় তা ঠিক করতো নারদিয়া নামক দক্ষ রিফুকাররা। তারপর চাল ধোয়ার পানি ছিটিয়ে ছোট মুগুর বা শঙ্খ দিয়ে পিটিয়ে মোলায়েম করা হতো। আবার একাজে নিয়োযিতদের বলা হতো কুন্ডুগার।

 

এই মসলিন বিলুপ্ত হয়ছে আজ থেকে অন্তত তিনশ বছর আগে। শুধু মসলিনের জন্যই সতেরো এর দশকে ব্যবসা বানিজ্যে দ্বাদশতম নগরী ছিল ঢাকা। সেই সময়ে সমগ্র বিশ্বের বিত্তশালীদের পছন্দের কাপড় ছিল মসলিন। মসলিনের দাপট এক সময় ইউরোপের বাজারে থাকলেও, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পরে মসলিন আর সেভাবে টিঁকে থাকতে পারেনি। কারণ ইউরোপ জুড়ে তখন বস্ত্রশিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করায় মসলিন তার বাজার হারিয়েছিল। ক্রমান্বয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তৈরী সস্তা সুতা বাংলার মসলিন শিল্পের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা কম দামে এদেশে সুতা রপ্তানির পাশাপাশি স্থানীযভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ করারোপ করে, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিলো। এই বৈষম্যের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধ্বস নামে। তাছাড়া এ শিল্পের সাথে যে সকল তাঁতী জড়িত ছিলেন তাদের আঙ্গুল কেটে দেয়া হতো যেন তারা তাঁতে আর মসলিন বুনতে না পারেন। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের এই ঐতিহ্য ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাছাড়া যে তুলা থেকে মসলিনের সুতা উৎপাদন হতো,  সেই তুলার বীজও এখন আর নেই। যার ফলে তুলার সঙ্কটে এই কাপড় তৈরিতে তাঁতিদের আগ্রহ এখন আর তেমনভাবে নেই। তাছাড়া মসলিন এর ব্যাবহার এখন আর নেই বললেই চলে, যদিও কিছু ব্র্যান্ডেড কাপড়ের সপ এই মসলিনকে আবারো পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দামের ব্যাপকতায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে মসলিন। তাই এখনি উচিৎ সরকারি পৃষ্টপোষকতায় তুলা উন্নয়ন বোর্ডের জিন ব্যাংকে সংগৃহীত তুলা বীজগুলো থেকে স্ক্রিনিং করে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসলিনের কার্পাস তুলা গাছ সার্ভে করে খুজে সংরক্ষণ করা। আশা করি বাংলাদেশের মানুষ আগামীতে ফিরে পাবে মসলিনের হারানো সেই ঐতিহ্য।

আপনার মন্তব্য