ফারাক্কার ফাঁদে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং  এদেশের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’। আর এ মূলনীতির আলোকে সকল দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহাবস্থান বজায় রাখতে বাংলাদেশ যথেষ্ট আন্তরিক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত একটি বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সেই স্বাধীনতাত্তর থেকে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সাথে ভারত কখনই সেই অর্থে আন্তরিক সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুসুলভ মনোভাব দেখায়নি। ভারত নিঃসন্দেহে বৃহৎ একটি শক্তি। এই শক্তির দাপটেই তারা প্রতিবেশীদের প্রায় সব কিছুর উপরই কর্তৃত্ব বজায় রাখতে শোষণনীতি অবলম্বন করেছে। এদেশের সৃষ্টি থেকে এখন অব্দি আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একের পর এক আগ্রাসন নীতি জোরপূর্বক চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী এ দেশ থেকে তারা যুদ্ধাস্ত্র ও খুলনার পাটকলগুলোর যন্ত্রাংশ লুণ্ঠন থেকে শুরু করে তিন বিঘা করিডোর, দক্ষিণ তালপট্টি দখল, ফারাক্কাবাঁধ নির্মাণ, সীমান্ত সন্ত্রাস, চোরাচালান, পুশ ইন, সীমান্ত রেখা অতিক্রমের অজুহাতে নিরীহ নাগরিক ও কৃষকদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে, এর বিপরীতে তারা নিজেরাই সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নদীর চর ও কৃষি জমি বেআইনিভাবে দখল করছে। প্রতিনিয়ত তারা আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে নৌ ও সমুদ্র সীমালঙ্ঘন এবং দেশের ভেতরে গুপ্তচর নিয়োগের মত গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে একের পর এক বাংলাদেশকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলছে। তারা প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশের মত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর আন্তর্জাতিক সকল আইন-কানুন, নিয়ম-নীতিকে অগ্রাহ্য করে প্রকৃতির অমূল্য পানিসম্পদ উজান থেকে একতরফা ভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। পাহাড় ও পর্বতশৃঙ্গসমূহে সৃষ্ট জমা বরফগলা পানিপ্রবাহ অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে বাঁধ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রবাহপথ রোধ করে বাংলাদেশের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষকে দিনের পর দিন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু হরণ করে নিচ্ছে। ফারাক্কাসহ আরো অন্যান্য নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছেমত পানিপ্রবাহকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উঁচু ও মরু অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু বাংলাদেশ ভাটি অঞ্চল, এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাসহ সবকিছুই সৃষ্টি হয়েছে নদী ও তার পানিকে ঘিরে। এই নদী এবং পানিসম্পদতো কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয় যে চাইলে নিজেরা ব্যাবহার করব এবং ন্যায্য অধিকার থাকা সত্ত্বেও অন্যকে বঞ্চিত করব। কিন্তু ভারত তাই করছে, তারা কোন কিছুরই তোয়াক্কা না করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের উপর অব্যাহত শোষণ নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ সকল অন্যায় ও অন্যায্য ধারাবাহিকতার নতুন সংস্করণ ‘‘আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প’’।

ফারাক্কা বাঁধ রহস্যঃ ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা বন্দরের কাছে হুগলি নদীতে পলি জমা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই পলি ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্য ভারত গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধটি নির্মাণ করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অবস্থিত। হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি কর্তৃক ১৯৬১ সালে এর নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া হয় এবং ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তা শেষ হয়। ১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল থেকে ২১ মে এই ৪১ দিনের জন্য অস্থায়ী ও পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প সময়ের জন্য ফারাক্কা বাঁধটির সকল ফিডার ক্যানেল চালু করে। কিন্তু ভারত তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নির্দিষ্ট সময়ের পরও এই বাঁধ এর পানি প্রবাহ এখন পর্যন্ত বন্ধ করেনি। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যে কোন ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপরই বর্তায়। সুতরাং সেই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে শুধু মাত্র কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির অজুহাতে একচল্লিশ বছর আগে ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝামাঝি ফারাক্কা নামক স্থানে এই মরণবাঁধটি নির্মাণ করে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল জলপ্রবাহের একটা অংশকে হুগলী নদীতে চালিত করে কলকাতা বন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করা। পরবর্তীতে এই বাঁধ ফারাক্কা সুপার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উজ্জ্বলতাকে জাগিয়ে তোলে এবং স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জল এই বাঁধ থেকেই সরবরাহ হচ্ছে।  বাঁধটিতে মোট ১09টি গেট রয়েছে এবং এটি ২,২৪০ মিটার লম্বা। বাঁধ থেকে ভারতের ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ৪০ কিমি। আর বাংলাদেশ অংশে এই বাঁধের অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে গঙ্গা নদীর ওপর।  বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদী থাকলেও আন্তর্জাতিক ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৪টির মূল উৎস  তিববত, নেপাল, ভুটান ও ভারতের পর্বতময় অঞ্চল থেকে। যার ফলে পানির সুষ্ট প্রবাহ ফারাক্কার মত বাঁধ গুলো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে যা বাংলাদেশের জীব বৈচিত্রের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়- ১৯৭৭ সালে ফারাক্কা চুক্তির কিছুটা প্রভাব প্রত্যক্ষ করা গেলেও ১৯৯৬ সালের পর থেকে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সফলতা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। এর কারণ গ্যারান্টি ক্লজ বা অঙ্গিকার অনুচ্ছেদ না থাকায় বাস্তবে চুক্তির ফলাফল প্রায় শূন্য।

ফারাক্কার কুফলঃ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকায় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করছে। আর স্মরণাতীত কাল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ নদীর পানি ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করছে। যার ফলে বাংলাদেশের জমি, পানি ও মানুষের মাঝে এক স্বাভাবিক ভারসাম্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভারত গঙ্গানদীতে পানি প্রত্যাহারের ফলে বর্ষার শেষে নদীতে পলি পড়ে নদীতল ভরে যাচ্ছে, যার ফলে বন্যায় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। নদীর মোহনায় উজান থেকে পানি প্রবাহ উত্তরোত্তর হ্রাস পাওয়াতে সমুদ্রের লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়ছে ও নদীতে চর পড়ে যাওয়াতে উজান থেকে প্রবাহিত পানির নিষ্কাশন বাধাপ্রাপ্ত ও বিলম্বিত হচ্ছে। গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ সঞ্চারী গড়াই নদী মরে গেছে, ফলে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে ব্যাপক পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মূলত ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ এই ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে বাংলাদেশের মানবিক পরিবেশকে দিনের পর দিন দূষিত করছে যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ভারতের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে আমাদের মত একটি ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিনির্ভর দেশ বলতে গেলে আজ প্রায় বিপন্ন। বিপন্ন দেশটির নদী, মাটি, কৃষি, বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী, পাখিকুল, মৎস্যকুল ও পরিবেশ। এই জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসের মূলে প্রধান কারণ হচ্ছে ফারাক্কা বাঁধ। পত্রপত্রিকার তথ্য অনুযায়ী এই বাঁধের প্রভাবে দেশের মানচিত্র থেকে প্রায় ২০টি নদী ইতিমধ্যে মুছে গেছে এবং আরো প্রায় ১০০টি নদীর একই গতি। বাকিগুলোরও মরণদশা কোন কোনটির বুকে জেগেছে চর এবং ইতোমধ্যে সেই চরগুলোতে জনবসতিও শুরু হয়েছে, আর এই নদীগুলো খালের মত একাধিক ক্ষুদ্র ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে  শুকনো মৌসুমে নদীতে পানির পরিমাণ ও উচ্চতা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ও উচ্চতাও কমে যাচ্ছে। স্রোত না থাকায় এদেশের নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে এর উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নদীসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় প্রতি বছর অত্যধিক হারে নদীভাঙনের ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। এর ওপর আবার ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প!

ভারত তাদের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অর্ধশত বছরের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ এর সকল অববাহিকার নদ-নদীতে বাঁধ, জলাধার ও সংযোগ খাল সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে দক্ষিণের কাবেরী নদী পর্যন্ত টেনে নেবে যা রাজস্থানের থর মরুভূমিসহ ঐ সকল রাজ্যের অন্যান্য খরাপীড়িত অঞ্চলে পানি সরবরাহ করবে যাকে বলা হচ্ছে River Linking Project বা আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প। ইতোমধ্যেই আন্ত:নদী সংযোগের ক্ষেত্রে দু’বার সমীক্ষার কাজ সম্পন্ন করেছে, আর এ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২শ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এর মত। এই প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি ছোট-বড় নদীর পানিপ্রবাহকে ৩০টি আন্ত:সংযোগ খালের মাধ্যমে ফারাক্কা বাঁধের ভেতর দিয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে এবং এধরনের সংযোগ স্থাপন করে প্রায় ৭৫টি জলাধারে পানি সংরক্ষণ করে তা থেকে পরবর্তীতে পানিপ্রবাহ করে ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের খরাপ্রবণ রাজ্যগুলোতে পানিবণ্টন করে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে। আবার ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পানি প্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের উড়িষ্যা হয়ে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও কর্ণাটক দিয়ে তামিলনাড়ু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। গঙ্গার পানি নিয়ে যাওয়া হবে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং গুজরাটে। উভয় দিকের প্রবাহ প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার ঘুরিয়ে আবার একত্রে আনা হবে। বেশ সদুর প্রসারী চিন্তাভাবনা, শুধু এটা বললেই কম বলা হয় এর জন্য তারা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশের ক্ষতিকর প্রভাবের মধ্যে আছে- বিস্তৃত অঞ্চল মরুকরণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সুন্দরবন বিনাশ, কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস, পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক দূষণ, নদ-নদী বিলুপ্ত, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা, নদীভাঙন, অকালবন্যা, বেকারত্ব ও উদ্ভাস্তু সমস্যা, নদীবন্দরসমূহের সৃষ্ট অচলাবস্থা এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

ভারত সূদুর অতীতে অত্যন্ত সুকৌশল ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছিল তাদের প্রয়োজন উপলব্দি করে। হুগলী নদীর নাব্যতা রক্ষার কথা বলে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশকে শায়েস্তা করার জন্যই এই মরণ বাঁধটি তারা নির্মাণ করেছে। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিৎ দ্রুত ভারতের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা সাপেক্ষে যথাযথ কার্যকরী উদ্দ্যেগ গ্রহণ করে এ দেশে বহমান প্রতিটি নদ-নদীর পানির স্বাভাবিক ধারা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হওয়া। অন্যতায় ফারাক্কার মত ভারতের আগ্রাসী প্রকল্পগুলি বাংলাদেশের উন্নয়নকে থামিয়ে দেবে একদিন।

আপনার মন্তব্য
(Visited 1 times, 1 visits today)

About The Author

Bangladeshism Desk Bangladeshism Project is a Sister Concern of NahidRains Pictures. This website is not any Newspaper or Magazine rather its a Public Digest to share experience and views and to promote Patriotism in the heart of the people.

You might be interested in