আমাদের নদীগুলো বাঁচবে তো!!!!!


সোহেল হাবিব

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার (এবারের ২৫ সেপ্টেম্বর) নাকি বিশ্ব নদী দিবস। সারা বিশ্বের মানুষ এটা ঘটা করেই পালন করে। কেননা, নদী মানুষের জীবন যেন অবিচ্ছেদ্য। নদী হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে মনুষ্য সমাজ, হারিয়ে যাবে সভ্যতা। তাই বাঁচাতে হবে নদীকে। আর সেই প্রাণের দাবি নিয়েই পালিত হয় বিশ্ব নদী দিবস।

আমরা নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের মানুষ।মানুষের জীবনে নদীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আমাদের চেয়ে অন্য কারো বেশি বোঝার কথা নয়।দুঃখজনক হলো, আমাদের নদীগুলো আর আগের মতো নেই। নেই নদীগুলোর অঙ্গের রূপ-রস-যৌবন কোনটাই।অনেকগুলো তো আবার নিশ্চিহ্নই হয়ে গেছে।

মূলত দুটি কারণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদনদীগুলো কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।  একটি কারণ হলো পার্শ্ববর্তী দেশের একের পর এক নদীমুখে বাঁধ নির্মাণ, আর অপর কারণটি হলো নদী ভরাট করে নগরায়ণ শিল্প কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ নদীতে ফেলা। এভাবেই একের পর এক নদীগুলো মৃত্যুর প্রহর গুনছে। যে নদীতে একসময় অথৈ জলের ঢেউ খেলা করত, আজ সেখানে ছোটখাটো ধুধু বালুর মরুভূমি নজরে পড়ছে। থেকে পরিত্রাণ পায়নি দেশের রাজধানী ঢাকার নদীগুলোও।

ঢাকার প্রাণ বলে খ্যাত বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থা খুবই খারাপ। বুড়িগঙ্গার এই মরণদশার বড় কারণ হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পকারখানা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর নদী দখল এবং দখল করা জায়গায় গড়ে তোলা শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। ঢাকার উত্তরপূর্ব এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বালু নদী। এটি বেলাই বিল ঢাকার উত্তরপূর্ব বিস্তীর্ণ জলাভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ডেমরার কাছে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময়ের প্রাণবন্ত বালু নদী তার অস্তিত্ব হারানোর পথে। এখন  নাব্য সঙ্কটে নৌকা চলাচলেও কঠিন হয়ে পড়ছে।  বছরে থেকে মাসই পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। এক কথায় বালু এখন মরা নদী।ঢাকার আশপাশের চারটি নদীর মতোই গুরুত্বপূর্ণ নদী শীতলক্ষ্যা। দখলদূষণে ধ্বংসের পথে নদীটি। শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলারের ভেতর এখনও রয়ে গেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা।  এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে বস্তিঘর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বহুতল ভবনের অংশ। ছাড়া বছরের পর বছর ধরে চলছে বালুর ব্যবসা। তুরাগ নদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদীটি। দখলদার শিল্পমালিকদের কবলে পড়ে দখলদূষণে মরতে বসেছে নদীটি।

ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শতাধিক নদী মৃত্যুমুখে পতিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের ৬৭টি নদী তো একেবারেই হারিয়ে গেছে।এসব নদীর নাব্যতা হারানো এবং মৃতপ্রায় অবস্থায় চলে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ফারাক্কাসহ বাংলাদেশের উজানে ৪২টি নদীতে ভারতের বাঁধ। পানি বণ্টন চুক্তি থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয় নাআজ থেকে ৪০ বছর আগে পদ্মা নদীর শোঁ শোঁ ডাক শোনা যেত আধা মাইল দূর থেকে। এখন নদীর ডাক তো দূরের কথা দুচোখ যেদিকে যায় শুধু বালু আর বালু।বিশাল বিশাল চর জেগে যাওয়ায় এসব নদী, উপনদী, শাখাপ্রশাখা নদী, ছড়া নদী, নালা, নদীখাদ অঞ্চলের মানুষের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি।

উত্তরাঞ্চলের প্রধানতম নদী পদ্মা, তিস্তা, যমুনা অঞ্চলের মানুষের প্রাণের উৎস হিসেবে বিবেচিত হলেও এসব নদী এখন মৃতপ্রায়। বৃহত্তর তিস্তা নদীটিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ি জেলার গজলডোবা নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজ থেকে ১শকিলোমিটার উজানে। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়া এবং কৃষি, নৌসহ জীবনযাত্রায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিস্তা চরাঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের জীবনজীবিকায় চরম হাহাকার নেমে এসেছেএভাবেই একের পর এক নদী মরছে, সেই সাথে কমে আসছে আমাদের দেশের প্রাণশক্তি। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, মরুময় হচ্ছে পরিবেশ।এই অবস্থায় শুধু বিশ্ব নদী দিবস পালন করলেই বাঁচানো যাবে আমাদের নদীগুলোকে? নাকি আরও কিছু করণীয় আছে আমার, আপনার এবং সর্বোপরি সরকারের?

 

 

আপনার মন্তব্য
Previous এ লাশের মিছিল থামাও
Next বঙ্গোপসাগরে দেখা দিয়েছে নীল বোতাম আতংক