বালুচিস্তানঃ পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী প্রদেশ – বাংলাদেশ কি শিক্ষা নিতে পারে?

74
SHARE

বালুচিস্তান, এক ৬৮ বছরের দীর্ঘ স্বপ্ন, প্রত্যাশা, ভুল আর পাওয়া না পাওয়ার গল্প !  অপার সম্ভাবনাময় বালুচিস্তান, শুধু কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, লোভ, ক্ষোভ আর বহিঃচক্রান্তের কবলে পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ! কি নেই বালুচিস্তানে – প্রাকৃতিক গ্যাস , তেল, কয়লা, কপার, সালফার, গোল্ড, ফ্লোরাইড, ইউরেনিয়াম – কি নেই !?!?  সব আছে ; রাতারাতি  আধুনিক, উন্নত বালুচিস্তান হবার মত সবই আছে !!!

নেই শুধু শান্তি আর শুভ বুদ্ধি  !!!

এই একি ভুল দেখি সারা বিশ্ব জুড়ে !

পাকিস্তান, ৮৮১,৯১৩ বর্গ কিলোমিটারের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ ! দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে । দেশটি কয়েকটি প্রভিন্সে বা প্রদেশে বিভক্ত- বালুচিস্তান, পঞ্জাব, সিন্ধ, পশতুন খাওয়ার, গিলগিট-বাল্টিস্তান ও আজাদ জম্মু-কাশ্মির ।

পাকিস্তানের  পূর্বে ইন্ডিয়া, উত্তরে চীন, উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান ও দক্ষিন-পশ্চিমে ইরান আর সর্ব দিক্ষিণে আরব সাগর।  বেলুচিস্তান প্রদেশটির ২টি অংশ । একটি পাকিস্তান অংশ , অন্যটি ইরানী অংশ ।

বালুচ বংশ উদ্ভূতরা ছাড়াও বেশ কয়েকটি পাহাড়ী উপজাতী ও গোত্রের বসবাস বালিচিস্তানে ।

১৬৬৬ সালে মীর আহমেদ বালিচিস্তানের বিশাল অংশ নিয়ে নিজ রাজ্য  “ খানায়েত কালাত ” প্রতিষ্ঠা করেন । অন্যান্য বালুচ গোত্রগুলো তার অনুগত হয় ! বংশ পরস্পরায় শাসক পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজ্যের অনুগত্যেও পরিবর্তন আসে। ১৭৫৮ সালে তৎকালীন “ খানায়েত কালাত ” প্রধান মীর নাসীর খান (১) তৎকালীন আফগান সাম্রাজ্যের অনুগত হয় ! তারপর ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশরা কালাত আক্রমণ করে ও কালাতের তৎকালীন শাসিক মীর মেহরাব খান এবং তার অনুসারীদের হত্যা করে ! নতুন শাসক হন মীর শাহ নেওয়াজ খান । কিন্তু এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে কালাত সহ মারী, বাগতী, খেতরান, ছাগী সহ  বালিচিস্তানের বিরাট অংশ ব্রিটিশ আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয় ! বিশ শতকের শুরুর দিকে শিক্ষিত বালুচদের মধ্যে  স্বাধীনতার জন্য হাপিত্তেশ শুরু হয় ! ১৯৩১ সালের দিকে প্রতিষ্ঠা হয় আঞ্জউমান-এ-ইত্তেহাদ-এ-বালিচিস্তান। তাদের প্রচেষ্টায় আজম জান – নতুন কালাত প্রধান হন । কিন্তু আজম জান অন্যান্য তার উদ্দেশ্য থেকে সরে দাঁড়ান । ফলে আঞ্জউমান-এ-ইত্তেহাদ-এ-বালিচিস্তান আন্দোলন থমকে যায় !  এই আজম জানের বংশধর মীর আহমেদ ইয়ার খান । তিনি আঞ্জউমান-এ-ইত্তেহাদ-এ-বালিচিস্তান আন্দোলনের প্রতি সহানুভুতিশীল ছিলেন । কিন্তু ব্রিটিশদের সাথে তিনি সম্পর্ক নষ্ট করতে চাননি । এক সময় আঞ্জউমান-এ-ইত্তেহাদ-এ-বালিচিস্তান আন্দোলন কালাত ষ্টেট ন্যাশ্নাল পার্টিতে পরিণত হয় ও স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায় । ১৯৩৯ সালের দিকে কালাত খানায়েত এই আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং এর নেতাদের হত্যা করে !

এরই মাঝে দেশ ভাগের প্রক্রিয়া চলতে থাকে । কালাত প্রধান  মীর আহমেদ ইয়ার খান সমর্থন ও সহযোগীতা দিতে থাকে মোহাম্মাদ আলী জীন্নাহকে ! কথা থাকে ১৯৪৭ সালের ৫ই আগষ্ট কালাত ১৮৩৮ সালের মত  স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে । চুক্তি মোতাবেক ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট কালাত তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পায়ও । কিন্তু তার উপর পাকিস্তানের প্রাধান্য থাকে । অবশেষে জিন্নাহ সাহেবের  ক্রমাগত চাপের মুখে কালাত প্রধান বাধ্য হয় বেলুচিস্তানে পাকিস্তানী শাসন মেনে নিতে ।

কিন্তু রাজপুত্র আগা আব্দুল করিম ও মুহাম্মাদ রহীম তা মেনে নিতে পারাননি । তারা অস্ত্র তুলে নেন এবং ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তারা ক্রমাগত পাকিস্তানী আর্মির বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান ।

সেই শুরু ! তারপর থেকে থেমে থেমে বিভিন্ন সময় বালুচ বিদ্রোহীরা তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে । বিভিন্ন সময় তাদের বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তানী সরকার দমন পীড়ন নীতি অবলম্বন করে ।

বালুচ বিদ্রোহীদের তৎপরতা বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেলেও কার্যকরী সরকারী প্দক্ষেপ সেগুলোকে আবার থামিয়েও দিয়েছে ।  

এই পর্যন্ত বালুচ বিদ্রোহীদের করা উল্লেখযোগ্য আক্রমণ গুলো হয়ঃ

১৯৪৮ সালে

১৯৫৮ – ৫৯ সালের বিভিন্ন সময়ে

১৯৬৩ – ৬৯ সালের বিভিন্ন সময়ে

১৯৭৩ – ৭৭ সালের বিভিন্ন সময়ে

২০০৪ – ২০১২ সালের বিভিন্ন সময়ে  

এবং ২০১২ থেকে বিদ্রোহ তৎপরতা কমে আসলেও এখন তা একেবারে থেমে যায়নি !

আগেই বলেছি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে ভাসছে বালুচিস্তান ! সেই সম্পদ ব্যাবহার করে তাদের এখন সুখের সাগরে ভাসার কথা ছিল ! কিন্তু তারা ভেসে চলেছে রক্ত গঙ্গায় !

প্রশ্ন হল কেন ?! এই দায় কার ?!

প্রাথমিক ভাবে ক্ষমতার পালা বদলে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির কথা চলে আসলেও একটা সময় তা স্তিমিতও হয়ে আসে ! কিন্তু আবার জ্বলে উঠে আগুন ! বালুচিস্তানের ইরান অংশও কখনও শান্ত ছিলনা ! ফলে ইরান অংশের আন্দোলন পাকিস্তানেও দোলা দেয় ! তাছাড়া আফগানিস্তান তো আছেই !

Major_ethnic_groups_of_Pakistan_in_1980

আফগানিস্তানে রাশিয়ান উপস্থিতির সম্ভাবনা তৈরী হবার সাথে সাথে আফগান শাসকদের মনে ১৭৫৮ সালে তৎকালীন “ খানায়েত কালাত ” প্রধান মীর নাসীর খান (১) এর  তৎকালীন আফগান সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত্যের কথা মনে করিয়ে দেয় ! আফগানদের মন কেঁদে উঠে বালুচিস্তানের জন্য ! রাতারাতী আফগান সীমান্তে বালিচ স্বাধীনতাকামীদের জন্য  তৈরী হয় প্রশিক্ষণ শিবির !

কিছুকাল বাদে ক্রিয়াশীল হয়ে ঊঠে রাশিয়ানরাও ।

এদিকে আবার ইরান-ইরাক শিয়া-সুন্নী দন্দে লিপ্ত । বালুচরা অধিকাংশ সুন্নী ! ইরাক পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে ইরানী বালুচদের জন্য সাহায্য পাঠাতে ব্যাস্ত । উদ্দেশ্য ইরানকে  শায়েস্তা করা !

অন্য দিকে আবার ইস্রায়েলের জন্য ইরান একটা বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে । তাই ইদানিং ইস্রাইলের মন কেঁদে উঠেছে  বালুচদের জন্য !

তাছাড়া ইন্ডিয়ান দাদারা তো আছেই ! তো বালুচ বিদ্রোহে দাদাদের উপস্থিতি আবার পাকিস্তানীরা এখনো নাকি প্রমাণ করে উঠতে পারেনি !

 

বালুচরা অভিযোগ করে আসছে যে, তাদের এত সম্পদ থাকার পরও দেশের সবচেয়ে অনুন্নত প্রদেশ বালুচিস্তান !!! এটা বিশুদ্ধ বৈষম্য !!! কথা বাস্তব ! যে প্রদেশের এত সম্পদ সেই প্রদেশ এত অনুন্নত কেন ?! পাকিস্তানীরা সত্যিই বৈষম্যবাদী !!

পাকিস্তানীদের উত্তরঃ

বালুচরা শুরু থেকেই বিদ্রোহ করে আসছে ! ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেমন আগ্রহী হয়নি, তেমনি দেশীয় বিনিয়োগও ধংস হয়েছে !

 

কাকে বিশ্বাস করবেন ?! যুক্তিই একমাত্র ভরসা !

 

তবে আশার কথা এই যে, বালুচিস্তানে শিক্ষা ও সমৃদ্ধির জন্য পাকিস্তান সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে ও বাস্তবায়ন করে চলেছে ! বালুচরা যদি বিশৃঙ্খলতা না ছড়ায় তাহলে হয় শীঘ্রই বালুচিস্তান একটি সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হবে ! অনেক দিন পর হলেও মানুষ গুলো একটু শান্তি পাবে !

 

জীবন তো একটাই ! অপচয় করে কি লাভ ?!

 

অতীতেও বালিচিস্তানের বিদ্রোহী নেতারা বিভিন্ন সময় সমৃদ্ধির দিকে চলতে শুরু করলেও পাড়া -প্রতিবেশিদের উস্কে দেয়া আগুন আর প্রলোভনে তারা বারবার জ্বলে উঠেছে ; জ্বলে উঠেছে তাদের  লালসা, জ্বলে উঠেছে তাদের  ক্ষমতা লিপ্সা, জ্বলে উঠেছে তাদের  স্বজন হারানোর ব্যাথা, জ্বলে উঠেছে তাদের  প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের নেশা !

এবার কি পারবে তারা – মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে ; নিজেদের বিবেককে কাজে লাগাতে ?!?!

 

তাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় একবার বিশৃংখলা শুরু হলে তা নির্মুল করা কত কঠিন !!! তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে – সদা- সর্বদা !!!

 

 বাংলাদেশীজম টিভির নতুন ভিডিও –

 

আপনার মন্তব্য