যেখানে আত্মহত্যা করে পাখিরা

67
SHARE

কেবল মানুষই কি নিজের ইচ্ছায় মরতে পারে? একেবারেই নয়। ভারতের আসামে আছে একটি জায়গা যার নাম যাটিঙ্গা। সেখানে সারা দেশের নানান পাখি যায় আত্মহত্যা করতে! হ্যাঁ, শুনে চমকানোর মতোই। ঝাঁকে ঝাঁকে সেখানে প্রতি বছর পাখি আসে স্বেচ্ছায় জীবন বিসর্জন দিতে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে পাখিদের এই আত্মহত্যা

b-1 বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের সন্ধ্যার দিকে দূর দূরান্তের পাখিরা চলে আসে আসামের জাটিঙ্গায়। আর প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তারা উপর থেকে নিজেদের আছড়ে ফেলে আত্মহত্যা করে। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ঈশ্বরের কাছে নিজেদের উত্সর্গ করতেই পাখিরা আসে যাটিঙ্গায়। যদিও এর কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই। দেশ বিদেশের বিজ্ঞনীরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন পাখিরা কেন ঘটাচ্ছে এই অদ্ভুত ঘটনা

জাটিঙ্গা পর্যটনের অন্যতম একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যে কারণে জাটিঙ্গা পর্যটকদের আকর্ষণের কারণ, তা খুবই মর্মান্তিক! এই সেই জায়গা যেখানে নানা জাতের পাখি দলে দলে এসে আত্মহত্যা করে! প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ছোট্ট একটি গ্রাম জাটিঙ্গা। ভারতের আসামের উত্তর কাছাড় জেলার সদর শহর হাফলং থেকে কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। আসামে শিলং পাহাড়ের পর শুরু হয় হাফলং পাহাড়ের সারি। স্থানীয় দিমাশি ভাষায় হাফলং শব্দের অর্থ হলোউইপোকার তৈরি করা ছোট পাহাড়‘! তবে জাটিঙ্গা শব্দটি দিমাশি ভাষার নয়, শব্দটি জেমেনাগা উপজাতির

জাটিঙ্গা শব্দের অর্থ হলোবৃষ্টি পানি বেরিয়ে যাবার পথ‘! একই নামের একটি নদীও রয়েছে সেখানে। জানা যায় যে, প্রায় শতাধিক বছর আগে জেমেনাগা উপজাতির কিছু লোক জাটিঙ্গা এলাকায় কোনো এক কাজে গিয়েছিল। তারা জায়গাটায় বেশ কিছুদিন অবস্থান করে। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানোর সময় তারা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল, পাখিরা দলে দলে নিচে নেমে এসে আগুনে আত্মাহুতি দিচ্ছে!

b-2জেমেনাগা উপজাতিরা জাটিঙ্গা এলাকায় এখন আর বাস করে না। কারণ তাদের ধারণা জায়গাটা অস্বাস্থ্যকর! জাটিঙ্গায় বর্তমানে বাস করে জৈন্তা উপজাতির লোকেরা। পাখিদের এই আত্মাহুতির বিষয়টিকে তারা ঈশ্বরের দান বলে মনে করে! আর এই রহস্যময় ঘটনাই জাটিঙ্গাকে অনবদ্য করে তুলেছে ট্যুরিজমের খাতায়! আসাম পর্যটন দপ্তর জাটিঙ্গায় একটি ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করেছে, যেটাতে উঠে রাতের বেলা পাখিদের আত্মহত্যা দেখা যায়!

আসলে গ্রামটিতে পাখিরা আত্মহত্যা করে না বলে বলা উচিত তারা গ্রামবাসীর হাতে মারা পড়ে! বছরের এই সময়টাতে গ্রামবাসী নানা জাতের পাখির মাংসে ভূরিভোজ করে থাকে। আগস্ট থেকে নভেম্বর অর্থাত্শরত্ হেমন্ত ঋতুতে রাতের বেলা গ্রামবাসীরা দলে দলে বেরিয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকে জ্বলন্ত মশাল, লণ্ঠন। বাঁশের লম্বা খুঁটি সাহায্যে মশাল বা লণ্ঠন উঁচিয়ে ধরে তারা আত্মহত্যাকারী পাখিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এই আলো লক্ষ্য করে কোথা থেকে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের পাখি এসে পড়তে থাকে। মাটিতে পড়ার পর পাখিগুলো আর ওড়ার চেষ্টা করে না। মাটিতে পড়ে থাকা পাখিগুলোকে গ্রামবাসী পিটিয়ে মেরে ফেলে এবং রান্না করে খায়!

সারা বিশ্বের বহু পাখি বিশারদ জাটিঙ্গায় গিয়ে এই রহস্যময় ঘটনা পর্যবেক্ষণও করে এসেছেন! অনেকে অনেক রকম ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। কিন্তু কোনোটিই সুস্পষ্ট নয় বলে রহস্য রহস্যই থেকে গেছে! অনেকে পাখিগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু লাভ হয়নি! মাটিতে পড়া পাখিগুলোকে কেমন জুবুথুবু, ভীত দেখায়! কিছু খেতে দিলেও খায় না, দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে পাখিগুলো অনাহারে মরে যায়! পাখি বিশারদদের মতে, দেশীবিদেশী পাখি মিলে গড়ে প্রায় ৫০ প্রজাতির পাখি প্রতি বছর জাটিঙ্গায় জৈন্তাদের হাতে মারা যায়। এদের মধ্যে টাইগার বিটার্ন, ব্ল্যাক বিটার্ন, লিটল এগ্রেট, পন্ড হেরন, ইন্ডিয়ান পিট্টা এবং কয়েক প্রজাতির মাছরাঙা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে আশার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এভাবে পাখিহত্যা কমে এসেছে

 

আপনার মন্তব্য