যৌথ প্রযোজনার ছবি শঙ্খচিলেও বিকৃত ইতিহাস

বাংলা সিনেমার জগত এখন চলছে যৌথ প্রযোজনার ছবির যুগ। ক’দিন আগে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে এমনই একটি বাংলা সিনেমা দেখানো হয়েছে। ছবিটির নাম ‘শঙ্খচিল’। বলা হয়েছে, এটি নাকি ভারত-বাংলা যৌথ প্রযোজনার ছবি। মূলত ভারত বিভক্তির পটভূমিতেই নির্মিত হয়েছে ছবিটি।কিন্তু তাতে যে ইতিহাসের আলোকপাত করা হয়েছে, তা এক পেশে এবং বিকৃত ইতিহাস।

ভারতীয় বাংলা ছবিতে ভারত বিভক্তি নিয়ে সিনেমা করার একটি বাতিক ভারতীয় বাংলা ছবির পরিচালকদের মাঝে লক্ষ করা যায়। আরেকটি প্রবণতা হলো হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক। ওরা যখনই পলিটিক্যাল টাচ্ দিয়ে কোনো ছবি নির্মাণ করে তখনই ভারত বিভক্তি এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক সেখানে অবধারিতভাবে থাকবেই। শঙ্খচিলও তার ব্যতিক্রম নয়। তা ওরা এই বিষয়টি নিয়ে ছবি করুক, তাতে বাংলাদেশের জনগণের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু যখন ঐসব বক্তব্য ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হয়, তখনই আসে প্রশ্ন।

শঙ্খচিলের শুরুতে কয়েকটি দৃশ্যের পর দেখানো হয়, বাংলা ভাগের ফলে একজন হিন্দু পূর্ব বঙ্গ ছেড়ে পশ্চিম বঙ্গে চলে গেছেন। একজন মুসলমান সেই বাড়িটি দখল করেছে। সেই বাড়িতে হিন্দু মালিক একটি তুলসী গাছ লাগিয়েছিলেন। সেটিতে প্রস্রাব করে মুসলমান দখলদার তাদেরকে অপমান করেছে। এমনটি হতেও পারে। কিন্তু তার বিপরীত চিত্র কি নেই? সেই দিকটি দেখানো হলো না কেন? আরো বলা হলো, যে দেশ ভাগের ফলে নাকি সমগ্র বাংলা দুই ভাগে ভাগ হলো। এক ভাগ মুসলমান, আরেক ভাগ হিন্দু। কেউ আর বাঙালি রইল না। এটি সত্যের চূড়ান্ত অপলাপ। ২০১৬ সালে যে ছবিটি মুক্তি পেল সেখানে, অর্থাৎ ৬৯ বছর পর কি সেই কথা বলা যায়? বরং বাংলাদেশে তো সকলে কঠিন বাঙালি হয়েছেন। তবে যার যার ধর্ম তার কাছেই সেটি রয়েছে। ৬৯ বছর আগেও যা ছিল, আজও তাই আছে।

ছবিটির অন্যতম প্রযোজক নায়ক বিশ্বজিতের পুত্র প্রসেনজিৎ। তিনিই ছবিটির মুখ্য ও কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাকে ঘিরেই সমগ্র ছবিটি আবর্তিত হয়েছে। তিনিই ডায়ালগ থ্রো করলেন, তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর ওপর রাগ করো, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো। এই কবিতাটি শুধু চরম বিতর্কিতই নয়, রীতিমতো পক্ষপাতমূলক। এই সংলাপটি আমাদেরকে পেছনে ফিরে তাকাতে বাধ্য করছে। ভারত ভেঙে ভাগ হওয়া, মানে বাংলা এবং পাঞ্জাবকে ভাগ করা। আর বাংলা ভাগ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩-৭৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা করা হলো ভারতবর্ষ ভাগ হবে। কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এজন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। বাংলাদেশের কলকাতা এবং তার আশপাশের জেলাগুলোও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা নাও পেতে পারি। কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।’ খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব ১৯৪৭ সালের ২২ এপ্রিল ঘোষণা করেছিলেন, ‘যুক্ত বাংলা হলে হিন্দু-মুসলমানের মঙ্গলই হবে।’ মাওলানা আকরম খাঁ সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, “আমার রক্তের উপর দিয়ে বাংলাদেশ ভাগ হবে। আমার জীবন থাকতে বাংলাদেশ ভাগ করতে দেব না। সমস্ত বাংলাদেশই পাকিস্তানে যাবে।’

এর আগে রাজাকাহিনীতেও ছিল নানা বিকৃতি।কিন্তু একপেশে ও বিকৃত ইতিহাস নিয়ে নির্মিত এসব ছবিকে আর যাইহোক তাকে অন্তত শিল্পের মর্যাদা দেওয়া যায় না।

আপনার মন্তব্য
(Visited 1 times, 1 visits today)

About The Author

Bangladeshism Desk Bangladeshism Project is a Sister Concern of NahidRains Pictures. This website is not any Newspaper or Magazine rather its a Public Digest to share experience and views and to promote Patriotism in the heart of the people.

You might be interested in