এক সেকেন্ডের নাই ভরসা
October 23, 2016
Bangladeshism Desk (766 articles)
Share

এক সেকেন্ডের নাই ভরসা

ভারতের একটি বেসরকারি রেডিও চ্যানেলের আরজে’র মৃত্যু হয়েছে অনুষ্ঠান চলাকালীনই। মৃতের নাম শুভম কেচে (২৩)। ২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঘটনাটি ঘটেছে চ্যানেলের নাগপুরের অফিসে। বৃহস্পতিবার সকালে প্রতিদিনের মতোই নিজের অনুষ্ঠান করতে অফিসে গিয়েছিলেন শুভম৷ ঠিক সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয় তাঁর অনুষ্ঠান৷ ‘হাই নাগপুর’- শুধু এই শব্দটুকুই বলতে পেরেছিলেন শুভম৷ এরপরই বলেন, বুকে ব্যাথা অনুভব করছেন৷ সঙ্গে সঙ্গে শুভমকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেন তাঁর সহকর্মীরা৷ কিন্তু, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তরুণ রেডিও জকির মৃত্যু হয়৷

রেডিও জকি শুভমের মৃত্যুর খবরটি পড়তে পড়তেই মনে পড়ে গেল আমাদের দেশের প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর কথা। ৩০ নভেম্বর ২০১৪ তারিখ রাতের ঘটনা, রাজধানী ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবে বক্তৃতা রাখতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেওয়া হয় কাছের ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। সেখানে চিকিৎসকরা দেখে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ওই উৎসবের মঞ্চ থেকে এই শিল্পীর মৃত্যুর কথা জানানো হয় এবং অনুষ্ঠানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত কাইয়ুম চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। বেঙ্গলের সঙ্গীত উৎসবের তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরুর আগে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা রেখেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বক্তৃতা দেওয়ার পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী এ সময় ডায়াসে ফিরে বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে’। কিন্তু আর কোনো কথা বলার আগেই  ৮টা ৪০ মিনিটে হঠাৎ পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালে নেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর কথা জানা যায়। কী কথাটি তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তা আর জানা যায়নি।

আমাদের আরেক বিখ্যাত শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসানও কিন্তু এমনি করেই চলে গিয়েছিলেন টিএসসির এক অনুষ্ঠানে সবার সামনে দিয়ে। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা পাঠের এক অনুষ্ঠানেই পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, তারপর সব শেষ।

কদিন আগে এমনই আরেকটি ঘটনা ঘটেগেছে আমাদের দেশে। রাজশাহীতে বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে নিয়মিত সভায় যোগ দিতে এসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জাহিদুল ইসলাম। ১৭ অক্টোবর ২০১৬ সোমবার সকাল ১০টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জাহিদুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার দিন সকালে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মিটিং শুরু হওয়ার দুই মিনিট আগে তিনি মোবাইল ফোনে জরুরি কথা বলতে সভাকক্ষের বাইরে চলে যান। মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় তিনি পড়ে যান। এরপর তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি জাহিদুল ইসলামের মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে মোবাইলে কথা বলা এবং কথা বলতে বলতেই পড়ে যাওয়া ভিডিওটি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেকেই তা দেখেছি। ভিডিওটি দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, তিনি তার কথা তখনো শেষ করতে পারেননি। তার আগেই যেন সময় হয়েছিল চলে যাওয়ার, ফলে তাই হয়েছে।

আচ্ছা আপনাদের কি মনে আছে লোকসঙ্গীত শিল্পী ফিরোজ সাঁই-এর কথা। ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারির ঘটনা। ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে এসে হাজারো দর্শকদের সামনে গান গাইতে গাইতেই বিদায় নিয়েছিলেন ধরাদাম থেকে। কি গান তিনি গাইছিলেন, মনে পড়ে? হ্যাঁ, তিনি গাইছিলেন-

‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা

বন্ধ হইবে রঙ তামাশা

চক্ষু মুদিলে; হায়রে দম ফুরাইলে’

…………………………..

গানটি গাইতে গাইতে হাজার হাজার দর্শকের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লোকসঙ্গীত শিল্পী ফিরোজ সাঁই। ঘটনা শিল্পকলা একাডেমীতে ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি। তখন শিল্পকলা একাডেমীতে এতো জৌলুসপূর্ণ বিল্ডিং ছিল না। প্রায় সব ঘরই ছিল সেমিপাকা। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে ত্রিপল টানিয়ে মঞ্চ করা হয়েছে। হাজার হাজার দর্শক গান শুনতে সামনের চেয়ারে বসা। একে একে শিল্পীরা গান গেয়ে দর্শক মাতিয়ে যাচ্ছেন। একতারা হাতে মঞ্চে উঠলেন গেরুয়া পোশাকের বাউল শিল্পী ফিরোজ সাঁই। গলায় পেঁচানো কয়েক স্তরের পুঁতির মালা। দর্শকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিলেন; অতঃপর শুরু করলেন গান ‘এক সেকেন্ডের নেই ভরসা’। দর্শক বিমোহিত! নেচে নেচে গাইতে গাইতিই হঠাৎ পড়ে গেলেন মঞ্চে। ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়ার আগেই সব শেষ।

পাঠক, কী ভাবছেন? না, ভেবে কোনো লাভ নেই। অন্যরা হয়তো শেষ কথাটি বলতে পারেননি কিংবা বলার সময় পাননি। কিন্তু ফিরোজ সাঁই ঠিকই বলে গেছেন। আর তিনি যা বলে গেছেন সেটাই আসল কথা।

রিলেভেন্ট এই বিষয়গুলোর উপর ভিডিও দেখতে চাইলে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি – ঠিকানা –YouTube.com/Bangladeshism

আপনার মন্তব্য