একজন বীরের বিদায়

29
SHARE

ইউসুফ হায়দার

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অনেক বীরের জন্ম দিয়েছে। কিংবা অন্যভাবে বললে বলতে হয়, অনেক বীরের সাহসী ত্যাগের কারণেই আমরা জয় পেয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে। যাদের অবদান জাতি হয়তো কোনো দিনই ভুলতে পারবে না। তেমনি একজন বীর ছিলেন হেমায়েত উদ্দিন। যিনি নিজের নামেই গঠন করেছিলেন এক দুর্ধর্ষ বাহিনী। যা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে হেমায়েত বাহিনী নামেই সুপরিচিত আছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য যাকে বীরবিক্রম খেতাব দেওয়া হয়, তিনি বিদায় নিয়েছেন ২২ অক্টোবর ২০১৬, শনিবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে।

খবরে বলা হয়েছে, শনিবার সকাল ৬টা ১০মিনিটে ঢাকার মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়।তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া গ্রামে। তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন।

আসুন আমরা আমাদের এই বীরের কিছু অবদান সম্পর্কে জেনে নেই। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, হেমায়েত উদ্দিন (ডিসেম্বর ৩, ১৯৪১ – অক্টোবর ২২, ২০১৬) ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হেমায়েত বাহিনী পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে অংশ নেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।

হেমায়েত উদ্দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ছুটিতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিভিন্ন বাহিনীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোট দল গঠন করেন। তাঁদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের রাতের পর ২৯শে মার্চ তারিখে ঢাকার জয়দেবপুর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাঞ্জাবি সৈন্যদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য এবং কর্মকর্তাগণ মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরেন। বিদ্রোহী সৈন্যদের অন্যতম ব্যান্ডপার্টির হাবিলদার হেমায়েত উদ্দিন কয়েকজন সৈন্যকে নিয়ে ফরিদপুরে আসেন।

এ সময় ফরিদপুরের স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় তিনি পাকিস্তান সৈন্যদের প্রতিহত করলে বেশ কিছুদিন ফরিদপুর পাক সৈন্য মুক্ত থাকে। কিন্তু ঢাকা থেকে আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রসহ পাকিস্তান সৈন্য ফরিদপুর গেলে হেমায়েত উদ্দিন সঙ্গীদের নিয়ে ২৮ শে এপ্রিল নিজ গ্রাম কোটালিপাড়ার টুপুরিয়ায় সরে আসেন। এ সময় স্থানীয় রাজাকারেরা তাকে আত্মসমর্পন না করলে তার ছেলে এবং স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুকমী প্রদান করে। হুমকীর খবর শুনে হেমায়েতের স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। হেমায়েত সেখান থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সহায়তায় মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি এবং তার সঙ্গীরা কোটালিপাড়া থানা আক্রমণ করে প্রচুর অস্ত্র নিজেদের দখলে নেয়।

কিছুদিনের মধ্যেই হেমায়েতের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি একটি বিরাট বাহিনীতে রূপ নেয়। এ বাহিনীতে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল সর্বমোট ৫,৫৫৮ জন। এ বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র বরিশালের উত্তরাঞ্চল, খুলনা-বাগেরহাট ও যশোরের কালিয়া সহ গোপালগঞ্জ এবং মাদারীপুরের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হেমায়েত বাহিনী পরিচালনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ বাহিনী ৪২টি দলে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি দলে কমান্ডার, সহকারী কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ভাবে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হত। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কোটালিপাড়ার জহরেরকান্দি হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। হেমায়েত বাহিনীর মধ্যে বিচার বিভাগও ছিল। নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২ জন গ্রুপ কমান্ডার সহ মোট ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে হেমায়েত বাহিনী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রায় ৫০০ পাকিস্তানি সেনাকে পরাস্ত করে এই এলাকা শত্রুমুক্ত করে।

আজ আমরা এমন একজন বীরকে হারিয়ে গভীর শোকাহত। এমন বীরেরাই আসলে আমাদের জন্য মুক্তি এনেছে, স্বাধীন করেছে দেশ, স্যালুট তাদের সবাইকে।

রিলেভেন্ট এই বিষয়গুলোর উপর ভিডিও দেখতে চাইলে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি – ঠিকানা –YouTube.com/Bangladeshism

আপনার মন্তব্য