রুমা খালের শিকড় সন্ধানে

অপূ ভাই দাড়ান…!!! সাদেকের কন্ঠস্বর-টা কেমন জানি চাপা মনে হল…!! ফিরে দাড়াতেই দেখি সে বেশ শুকনো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই সাদেক তার কয়েকদিনের অমানুষিক পরিশ্রমে ক্লান্ত মুখটা আরো ক্লান্ত করে যা বলল তার জন্য সে নিজেও হয়ত তৈরি ছিলনা…।

আমরা ভূল করে ফেলছি অপূ ভাই। আমাদের সাথে অল্প কিছু নুডলস্ ছাড়া আর কোন খাবার মনে হয় নেই। ফেলে আসা গ্রামটার নামেই কোথাও সমস্যা আছে। মনে হয় এখানে মেন্দরুই নামে কোন গ্রামই নেই। আমি এই পথে আগে কখনও আসিনি। এবং জানিনা আগামী দুদিনেও কোন গ্রাম আমরা পাব কিনা। আমাদের খাবারের জিনিসপত্র ঐ গ্রাম থেকেই নেয়া উচিত ছিল। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিল সাদেক। আর সেই সাথে নির্বাক আমরা-ও..!! কথা বলতেই যেন ভূলে গেছে সবাই। কি বলা যায় বা কি বলা উচিত কেউ বুঝতে পারছিনা.. গুগলে আর্থ-এ দেখা মেন্দরুই পাড়া-টা যে আসলে মেনতুক পাড়া তা আর আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার কোন দরকার পড়ছেনা এই মুহুর্তে। দু ঘন্টারও বেশী সময় আগে ফেলে আসা গ্রামের সাইনবোর্ডটার উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল সবারই। নিরবতা ভাঙ্গলো সাদেক-ই। আপনারা বসেন কোথাও, আমি ব্যাক করে ঐ গ্রাম থেকে যা পাই নিয়ে আসি। বেলা তখন ১২-টার কিছু বেশী। এ সময় ঐ গ্রামে ব্যাক ট্রেইল করে যাওয়া আর ফিরে আসায় কম করে হলেও যে কোন মানুষের পাঁচ ঘন্টার মত সময় লাগবে। তার মানে পুরো দিন নষ্ট।

গত তিনদিন আমরা রুমা খাল ধরে হেটেই চলেছি। পথ ফুরোনোর কোন নামতো নেই-ই বরং প্রতিমূহুর্তে-ই পথ যেন আরো ভয়ংকর রুপ নিচ্ছে। বিশাল বিশাল সব পিচ্ছিল পাথর, ঝিরি-র গভিরতা, এলোমেলো জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ করে এগিয়ে যাওয়ার কারনে হাটার গতি ক্রমশ মন্থর হয়ে পড়ছে। এদিকে আমাদের হাতে খুব বেশী সময় যে আছে তাও নয়। সমস্ত পরিকল্পনা যদি ঠিক রাখতে হয় তাহলে যে করেই হোক আগামী দুদিনের ভিতর আমাদের রুমা খালের উৎসমুখে পৌছাতে হবেই। এর পরের পাঁচদিন আমাদের দ্বিতীয় আরেকটা অভিযানের পরিকল্পনা তো রয়েছেই। অতএব কোন ভাবেই সময় নষ্ট করা যাবেনা। যা থাকে কপালে ভেবেই খাবারের চিন্তা-টা মাথা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে আবারও হাটা দিলাম সবাই। কিন্তু মানুষের মন বড় জটিল। খাবার না থাকলেই হয়ত ক্ষুধা-টা বেড়ে দশ হাজার গুন হয়ে যায় তাছাড়া সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়া-ও হয়নি তাই একবার থেমে বিশ্রাম নেয়ার ফাকে সাথে থাকা অবশিষ্ট নুডলস্ গুলো থেকে যতটা না খেলেই নয় ঠিক ততটা নুডলস্ রান্না করে খাওয়ার পর মনে হচ্ছিল নাহ এ যাত্রা কোনরকম বেচে গেলাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে কাজ নেই।

বিশ্রামের পর আবারও শুরু পথচলা। দুপাশের বিশাল বিশাল সব পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে, বড় বড় বোল্ডারের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে হেলে দুলে বেরিয়ে আসা রুমা খাল-টার প্রতিটা বাঁক যেন এক একটা রহস্যপুরী। ক্লান্তি যে কখন ভাল লাগায় পরিনত হয় এখানে তা টের-ই পাওয়া যায়না। পৃথিবীটা বড় বেশী শান্ত এখানে। নাম না জানা হাজারো পাখির গান, অবিরত বয়ে যাওয়া পানির ঝিরঝির আর জঙ্গলের বিচিত্র সব শব্দের সম্মোহনে মাতাল আমরা হেটেই চলেছি। এই আলোছায়ায় মোহনীয় পথে কখন যে দূপুর গড়িয়ে গেছে তা আমাদের কারোরই জানা নেই। জানার প্রয়োজন যে খুব বেশী তাও নয়। কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে প্রচন্ড রকমের নিষ্ঠুর হয়। বিকেল গড়িয়ে আসতেই আমাদের প্রধান লক্ষ্য একটা ক্যাম্প-সাইট খুজে বের করা। যেখানে কোনরকমে রাতটা পার করা যায়। রুমা খালের শুরুর দিকে অনেক ক্যাম্প-সাইট থাকলেও যতই উৎসের দিকে এগোচ্ছি ততই খালটা সংকীর্ন আর ভয়ংকর রুপ নিচ্ছে। গত দুদিনের ফেলে আসা দারুন দারুন ক্যাম্প-সাইট গুলোকে খুব মিস করছিলাম। কোথাও কোন সমান জায়গা নেই। সেই তিনটা থেকে চারটা বেজে ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত এমন কোন জায়গা পেলাম না যেখানে আমাদের তিনটা তাবু খাটানো যাবে। এদিকে একে-তো শীতকাল তার উপর পাহাড়ে সন্ধ্যা নেমে যায় অনেক তাড়াতাড়ি। কিভাবে কি করব ভেবে কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না। হেটেই চলেছি উদভ্রান্তের মত। এমন সময় অনেকটা মন্দের ভাল-র মতই হঠাৎ একটা জায়গা পেয়ে গেলাম যেটা আক্ষরিক অর্থে ভাল না হলেও একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে কাজ চালানো যাবে। জায়গাটা বেশ খোলামেলা হলেও যত্রতত্র ছড়ানো ছিটানো পাথরে ভর্তি। আরেকটা প্রধান সমস্যা হল পাহাড়ের অবস্থানের কারনে জায়গাটায় বাতাসের গতি-ও বেশ তীব্র। যেখানে এই বিকেলবেলার তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস সেখানে রাতের বেলা এই ধারালো ছুরির মত বাতাস-কে কিভাবে সামলাবো তা আমাদের কারো মাথায় না আসলেও এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যাওয়াটা বোকামী। অতএব কি আর করা লেগে গেলাম কাজে। নিচের সমস্ত এবড়ো খেবড়ো পাথর সরিয়ে। অল্প কিছু দুর থেকে মাটি কেটে এনে তার উপর কলা পাতা বিছিয়ে যখন আমাদের ক্যাম্প-সাইট তৈরি তখন দিনের আলোর ছিটে-ফোটা-ও নেই কোথাও।

এরপর সবচেয়ে কঠিন কাজের পালা আর তা হল যতটা সম্ভব টর্চের ব্যাটারী বাচিয়ে এই অন্ধকার হাতড়ে লাকড়ি খুজে বের করে এনে আগুন জ্বালানো। কুয়াশা ভেজা জঙ্গল, কোথাও আপাত শুকনো কিছু নেই বললেই চলে তারপর-ও এই ঠান্ডায় সুস্থ থাকার একমাত্র উপায় আগুন তাছাড়া আলোর ব্যাপারটা তো আছেই। অবশেষে ভয়ংকর এক অগ্নিপরিক্ষার শেষে যেন পুরো জঙ্গলকে আলোয় আলোকিত করে জ্বলে উঠলো আগুন। ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত-পা গুলো আর কোন কাজ করতে না চাইলেও উপায় নেই। প্রচন্ড পরিশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত শরীরটার এই মূহুর্তে সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হলো খাবার। আর তাই শরীর-টাকে কোনরকম গরম করেই লেগে পড়লাম আমাদের সাথে ঠিক কতটা খাবার আছে তা জানার কাজে। ব্যাগ-ট্যাগ হাতড়ে যা পেলাম তা মোটামুটি ২৫০ গ্রামের-ও কম চাল, ছোট দুই প্যাকেট নুডলস্, এক প্যাক সয়া নাগেট (যেটা রান্নার জন্য আর কোন উপকরন নেই), অল্প খই, দুইটা Munch চকোলেট আর কলাপাতা কাটতে গিয়ে পাওয়া একটা কলার মোচা(ফুল)-এই সীমাবদ্ধ। জড়ো করে রাখা নিতান্তই অল্প এই খাবারগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা আমাদের এই সাত জন চরম ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকিয়ে উপহাসের হাসি হাসছে। আমাদের সাথে থাকা পাহাড়ি দাদু-র জন্য ভাতগুলো রান্না করা হবে আর বাকী যা কিছু আছে তা দিয়ে আমরা কোনরকম খেয়ে নিব এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও খাওয়ার সময় দারুন সরল আর মমতায় ভরা বুড়ো মানুষটা আমাদের জন্য একপ্রকার জোড় করেই কিছু ভাত রেখে দিল। সিদ্ধ করা কলার মোচা দিয়ে ঐ যৎসামান্য ভাতগুলো একটা প্লেটে মেখে অরণী যখন এক এক করে আমরা ছয় ছয়টা ভয়ানক ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে তুলে দিচ্ছিল তখন আবার আরেকবার সবাই উপলব্ধি করছিলাম জঙ্গলের বন্ধু-র চেয়ে পৃথিবী-তে আপন কিছুই হয়না। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো অরণী-কে একবার মা বলে ডাকি। কিন্তু বেচারা লজ্জায় পড়ে যাবে ভেবে ডাকা হয়ে উঠেনি।

তাপমাত্রা খুব দ্রুত নামছে..!! মাঝে মাঝে আমরা মজা করছিলাম এই বলে যে আমরা কি হিমালয়ের কোথাও আছি নাকি….!!! সাত ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর পাহাড়ের খাঁজে অশুভ ছায়ার মত কনকনে ঠান্ডা বাতাসের দাপটে আমাদের সবারই খুব খারাপ অবস্থা। তাবু-র ভিতরে গিয়ে শোয়া তো দূরের কথা আগুনের পাশ থেকে নড়তেই যেন পারছিনা। এদিকে খাওয়াটা ও তেমন ভাল হয়নি। হঠাৎ সাদেক আর রুহী ভাই প্লান নিল খাল থেকে কিছু মাছ ধরতে পারলে খারাপ হয়না। তাহলে অন্তত খাওয়ার কিছু পাওয়া যাবে। যদিও আমার তেমন ইচ্ছে হচ্ছিলোনা এই কনকনে ঠান্ডায় তীর ধনুক নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার। কিন্তু ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী মাঝে মাঝে গদ্যময়-ই শুধু না তারও বেশী কিছু হয়ে পড়ে..!!! অতএব, তিলোভা আর ইতি আপুর হাতে আগুনটা জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব দিয়ে আমরা তিন জন নেমে গেলাম বরফ শীতল রুমা খালে। শিকার অভিযান(!) যে একেবারেই খারাপ হয়নি এবং আমাদের তৈরি তীর ধনুক যে খুব ভালই সফল তা বুঝলাম যখন দেখলাম বেশ কিছু চিংড়ি আর একটা কাকড়া আমাদের খাবারের তালিকায় যোগ হল। মিশন শেষে বেশ ভাবের সাথে ক্যাম্প সাইটে যখন ফিরলাম তখন সবার আনন্দ যেন আর ধরেনা। যাই হোক, যেহেতু আমাদের সাথে রান্নার জন্য কোন আনুসঙ্গিক উপকরন নাই অগত্যা বেচারাদেরকে কোনরকম আগুনে ঝলসেই পেটে চালান করে দিলাম। আমিষ বলেই  নাকি শিকারের আনন্দে যাই হোকনা কেন মনে হচ্ছিলো অনেক খেলাম।

সে রাতে কারোরই ঘুম হয়নি। তাপমাত্রা মাঝরাতের পর কাঁটায় কাঁটায় ছয় এর ঘরে দাড়িয়ে আছে। আমাদের স্লিপিং ব্যাগগুলো তাদের সর্বশক্তি দিয়ে খেটেও আমাদের-কে উষ্ঞ রাখতে পারছিলনা। বাইরে বৃষ্টির মত কুয়াশা, আগুনের পাশে যে বসে থাকব সেই উপায়ও নেই। সবাই শ্রেফ অপেক্ষা করছিলাম কখন ভোর হবে। আদৌ কি কোনদিন ভোর হবে..!!! অতঃপর প্রচন্ড শারিরিক আর মানসিক যন্ত্রনা সহ্য করার পর, যেন শত-সহস্র বছর পেরিয়ে দাম্ভিক কোন দানবের মত দাড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূড়াগুলো আলোয় আলোকিত করে দিয়ে এল কাঙ্খিত ভোর। কোন খাবার নেই তাই খাওয়ার কোন ঝামেলাও নেই। আগুনের পাশে শরীরটা একটু গরম করে নিয়েই সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। আবারও সেই হীমশীতল পানি ধরে হাটা। কিন্তু উপায় নেই। আজকে যে করেই হোক কোন একটা গ্রামে পৌছাতেই হবে।

এরপর সারাদিন ঝিরি পথে হাঁটা, বারবার পথ ভূল, জঙ্গল কেটে পথ তৈরী করা, ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়েও হাসি মুখে পথ চলা, এই শীতের সময়েও অবাক করে দেয়া জোকের অত্যাচার, ক্ষুধার যন্ত্রনায় তারা আলু নামের একটা গাছের শিকড় আর কোনভাবে জঙ্গলে বেড়ে উঠা চোকরের ফল খেয়ে, বারবার ছোট বড় অসংখ্য সব পাথুড়ে ক্যাসকেইড আর ঝর্ণা পেড়িয়ে আমরা যখন জিংসিয়াম সাইতার ঝর্ণায় পৌছুলাম তখন প্রায় বিকেল। শীতের দিনের প্রায় শুকনো জিংসিয়াম সাইতার দেখায় ‍যদিও তেমন কোন আনন্দ নেই তারপরও আমাদের খুশী দেখে কে..!! কারন জিংসিয়াম সাইতার মানেই কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা রুমানা পাড়ায় পৌছাব।

কিছু সময় জিংসিয়ামের সাথে কাটিয়ে যখন আমরা রুমানা পাড়ায় তখন সন্ধ্যা। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আমরা রুমানা পাড়া পৌছালে লিয়াং-এর বাসায় উঠবো। প্রচন্ড আলাপি আর হাসিখুসি মানুষ লিয়াং আর তার পরিবারের সবার সাথে আড্ডা দিয়ে, খাওয়া দাওয়া সেরে কখন যে আমরা প্রচন্ড ক্লান্ত, শ্রান্ত মানুষগুলো ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ঘর থেকে বেরুনোর পড় এটাই ছিল প্রথম রাত যেদিন আমরা বেশ আয়েশি ছিলাম। খাওয়া দাওয়ার কথা বলছিনা কারন সবাই ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন আমরা খাবার পেলে কি কি করতে পারি। তবে সেদিনের ঘুমটা ছিল অসাধারন। গরম গরম নকশী কাথার আর স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে বলা যায় মরার মত ঘুমিয়ে যখন ভোর পাঁচটায় উঠেছি তখন শরীরের কোথাও যেন ক্লান্তির ছিটেফোটা-ও নেই। বাকীদের সবাইকে ঘুমুতে দিয়ে আমি, রুহী ভাই আর সাদেক গেলাম জিংসিয়াম সাইতারের বাকী ধাপগুলো জিপিএস-এ মার্ক করে আনতে। ফিরে এসে দেখি সবাই একপ্রকার রেডী বেরুনোর জন্য। তাড়াহুড়ো করে খাওয়াটা শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম সবাই। মাত্র ৪৫ মিনিট ট্রেক করেই আমরা পৌছে গেলাম আমাদের কাঙ্খিত সেই জায়গায় যেখানে সলোভা আর পানকিয়াং নামের দুইটা ঝিরি এসে এক অদ্ভ্যুৎ ভালবাসায় পরস্পর-কে পরস্পরের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে জন্ম দিয়েছে অনিন্দ সুন্দর রুমা খাল-এর। জায়গাটা এতটাই নিরীহ আর শান্ত দেখতে যে, সেখানে দাড়িয়ে মনেই হবেনা এই রুমা খালটাই প্রচন্ড দাপটের সাথে রুমানা পাড়া ঝর্ণা, জিংসিয়াম সাইতারের মত দানবীয় তিন তিনটা ধাপের বিশাল ঝর্ণা, অসংখ্য ছোট বড় ক্যাসকেইড আর পাথুরে ঝিরির চোখ রাঙ্গানী-কে উপেক্ষা করে দস্যি একটা পাহাড়ি মেয়ের মত এক দৌড়ে গিয়ে মিশে গেছে ভালোবাসার সাঙ্গু-তে। বারবার আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো গত চারদিনের ফেলে আসা পথ। পথচলার ক্লান্তিতে বারবার গালাগালি করা রুমা খাল-টার জন্য মনটা এতটাই কাতর হয়ে পড়ছিল যে, ইচ্ছে করছিল আবার আরেকবার হেটে যাই সেই ভয়ংকর সুন্দর রুমা খালে। আবারও তীর ধনুক নিয়ে গা শিউরে উঠা পানিতে নেমে চিংড়ি শিকার করি দুরন্ত কোন কিশোরের মত। আবার তাবুর ভিতর কাপতে কাপতে পাড় করে দেই অনেকগুলো নির্ঘুম রাত। কিন্তু বাস্তবতা সব সময়ই আমাদের মনের বিপরীত মেরুতেই অবস্থান করে। আমাদের সামনে এখনও অনেক পথ। রাইখ্যিয়াং খালের উৎসমুখ-টা এখনও আমাদের অজানা। আর তাই রুমা খালটাকে নিষ্ঠুরের মত পিছনে ফেলে আবারো পথে নেমে আসলাম যে পথের দিগন্তটা কোন এক অজানা পাহাড়ে যেখানে জন্ম নিয়েছে রাইখ্যিয়াং নামের আরেক পাহাড়ি নদী।

সেই গল্প-টা আরেকদিনের জন্য রেখে দিয়ে আমরা এখন একটু পিছনের কথায় আসি। সময়টা ২০০৩-এর ফেব্রুয়ারি, প্রথম কেওক্রাডং যাবার সময় এই রুমা খাল ধরে বগালেক যাচ্ছিলাম। অসাধারন সুন্দর ঝিরিপথ, বিশাল বিশাল সব পাথর, ঘন বন, দুপাশে মাথা উচু করে দাড়িয়ে থাকা দানবের মত বড় বড় পাহাড়. বারবার এপাড় ওপাড় করা গুনে গুনে পথ চলতে চলতে বগামুখ নামে এক জায়গায় এসে আমাদের হঠাৎ করেই নিষ্ঠুরের মত রুমা খাল ছেড়ে দিয়ে অন্য একটা ঝিরি (খুব সম্ভবত ওটার নাম পাতাং ঝিরি) ধরতে হল। ভীষন আফসোস, রাগ বা অভিমানে মনটা খারাপ হয়নি বলা যাবেনা কিন্তু পথের স্বার্থেই ব্যাপারটা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। তার উপর বাড়তি পাওনা হিসেবে প্রথমবারের মত বান্দারবান অভিযানের ভীতি তো আছেই..।কিন্তু ঝিরি-র লোভ আমি কোনদিনই সামলাতে পারিনা আর তাই বেওয়ারিশ ঘুড়ি-র মত একটা ইচ্ছে-ও তখন থেকেই মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো যে করেই হোক একদিন এই রুমা খাল-টা পুরোটা হাটতে হবেই…। এরপর অনেকবার বান্দারবান গেছি, এমনকি রুমা খালের ঐ অংশ পর্যন্ত্য আরো কয়েকবার হেটেছি। কিন্তু ইচ্ছে-টা সেই, ইচ্ছেই রয়ে যাচ্ছিল….:( Google Earth-এ রুমা খালের উপর চোখ বুলানো ছাড়া আর কোনভাবেই রুমা খালে যাওয়া হচ্ছিলোনা।

সেই ইচ্ছে বাস্তবায়নের সংকল্প থেকেই করা এই অভিযান। এই অভিযানের সেই সব সময়ের হাসি, আনন্দ বা বেদনার স্মৃতিগুলো থেকে যতটা পেরেছি আপনাদের বললাম। হয়ত কোনদিন আবারও কোন পাহাড়ি ঝিরি, খাল বা নদীর গল্প নিয়ে আপনাদের মাঝে ফেরৎ আসবো।

আপনার মন্তব্য
(Visited 2 times, 1 visits today)

About The Author

Bangladeshism Desk Bangladeshism Project is a Sister Concern of NahidRains Pictures. This website is not any Newspaper or Magazine rather its a Public Digest to share experience and views and to promote Patriotism in the heart of the people.

You might be interested in