খইয়াছড়া ঝর্ণায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান

59
SHARE

গত রাতের ক্যাম্পিংটা খুব একটা আরামের হলনা… সেই লেভেলের বৃষ্টি তার উপর যেটাকে আপাত সমান জায়গা ভেবে ক্যাম্পিং করলাম সেটাই যে একটা এক ইঞ্চি গভিরতার লেক-এ বিবর্তিত হবে কে জানতো। আর ফলাফল ও হাতে নাতেই… কাপড় চোপড় থেকে শুরু করে ক্যামেরা পর্যন্ত সব ভিজে যেতে দেরী হয়নি একটু-ও…
সব কষ্টের-ই একটা শেষ আছে আর সেই শর্তে রাজী হয়েই হয়ত একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। ঘুম-টাও হল মন্দের ভাল-র চেয়ে কিছুটা বেশী। অতঃপর ভোর। ভোরে ঘুম ভাঙ্গতে যা দেরী, সব কোনভাবে শুকিয়ে নিয়ে, ক্যাম্প গুছিয়ে বের হচ্ছি। মাথার ভিতর একটাই চিন্তা আমি বড়তাকিয়া রেল লাইনে পৌছাব কখন! প্রায় নয়-টা বাজে অথচ সবাই সাতটার ভিতর চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেয়ার কথা! এতক্ষনে না জানি আমার কয় পুরুষের পিন্ডি চটকানো হচ্ছে। তবে আরমান আর রুপা দুজনেই যেহেতু আছে সেটা একেবারে আমার ফিফটি সিক্সথ জেনারেশনের কম হবার কথা না! এর ভিতর রুপার কড়া ফোন, ওই অপূ ভাই তুমি আসতে থাক আমরা ঝর্ণার দিকে গেলাম। ক্লিন আপটা ঝর্ণার শেষ থেকেই শুরু করুম | আর আমি, পাহাড়ে চড়তে চড়তে কোন রকমে হ্যাঁ সুচক একটা শব্দ করেই রেখে দিলাম ফোনটা। বলা তো যায়না ফোনে-ই যদি চটকানো শুরু করে দেয়! গত রাতে আশফাক ভাইয়ের বেশ জ্বর ছিল তাই প্লান ছিল উনাকে ঢাকা-র গাড়িতে তুলে দিয়ে আমি খইয়াছড়া-র দিকে রওনা দিব। কিন্তু মাথা নষ্ট মানুষটা হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত পাল্টে বলল চল আমি-ও যাব। নিষেধ করে কোন লাভ নেই জেনে দুই ভাই রওনা দিলাম। একটা সিএনজি-তে খইয়াছড়া রেল লাইনে পৌছে দেখি পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু-তে অবস্থান করছে আমাদের আজকের অভিযান। গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলোর মাথাতেই ধরছেনা, কেন আমরা এত কষ্ট করার প্লান করছি, আমরা কেন ঝর্ণায় ময়লা কুড়াতে যাব! এসবের কিছু বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারছিল যে ওদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের ঝিরি-টা আর এলাকার পরিবেশ-টা বাচাতে এর বিকল্প কিছু নেই। আর এতটুকু বোঝানোর কৃতিত্ব-টা পুরোটাই আমাদের টিম মেম্বারদের। ওরা বেশ সাবলীলভাবেই এলাকার সাধারন মানুষ, ধর্মগুরু, প্রসাশনিক লোকজনকে বুঝিয়েছে কেন এখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা ঠিক না, এভাবে আবর্জনা জমতে থাকলে আমাদের এবং প্রকৃতির কি ক্ষতি হতে পারে ইত্যাদি। রেল লাইনের লোকজন আমাকে যখন এসব বলছিল আমার তখন নিজেকে এত এত ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল এই ভেবে যে, উফফ!!! আমি ঐ দারুন টিম-টার একজন..!! যে মানুষগুলো প্রায় সমস্ত কাজ-কর্ম বাদ দিয়ে, তুমুল বৃষ্টি-কে মাথায় রেখে, ভয়ানক বিশ্রী পিচ্ছিল পথ বেয়ে শুধু ঝর্ণাটা বাচাতে ছুটে এসেছে কোন ধরনের প্রাপ্তির আশা না করেই!!!


অতঃপর, চতল (খইয়াছড়া ঝর্ণার প্রথম ধাপ। টিমের একটা অংশ দেখলাম ময়লার একটা স্তুপ পাহারা দিয়ে বসে আছে। যদিও ঝর্ণার সাথে পাল্লা দিয়ে সমানে প্রোফাইল ফটো, কভার ফটো-ও তোলা হচ্ছে মাঝে মাঝে জানা গেল বাকী সবাই আলাদা আলাদা গ্রুপে ভাগ হয়ে আবর্জনা সংগ্রহ আর বেড়ানো দুইটাতেই অনেক ব্যাস্ত।আমিও নিজ কর্তব্য বুঝে নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম বেশ। অবাক করার মত সব জিনিসপত্রের আবিস্কারে আমরা সবাই এতই বিস্মিত যে নিজেকে মানুষ ভাবতেই লজ্জা করছিল মাঝে মাঝে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চকোলেট, চিপস্, চানাচুর, কেক, পাউরুটি, কনডম ইত্যাদির প্যাকেট, কোমল এবং কড়া দুরকমের-ই পানীয়-র বোতল, এলুমিনিয়াম ক্যান, ব্লেড, ছেড়া প্যান্ট, স্যান্ডেল, জুতো, মাথার ক্লিপ, মানিব্যাগ থেকে শুরু করে কি নেই!!! বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমরা আদৌ কি কোন ঝর্ণায় নাকি সিটি কর্পোরেশনের কোন ডাস্টবিনে!!

যাই হোক, অবশেষে সারাদিনের পরিশ্রম-টা অনেকটাই স্বার্থক মনে হচ্ছিলো যখন দেখলাম কোথাও কোন আবর্জনার চিহ্নমাত্র নেই। বাকী শুধু ফিরে যাওয়ার পথটা। সেটাও যাওয়ার সময় পরিস্কার হয়ে যাবে কোন সন্দেহ নেই।

একেবারে ঝকঝকে, চকচকে একটা ঝর্ণায় চোখে মুখে দারুন আনন্দ নিয়ে সবাই বসে আছি। এমন সময় আমাদের আনন্দ-টা দুশো গুন বাড়িয়ে দিতেই যেন আশফাক ভাইয়ের ঘোষনা, চল র‌্যাপলিং করি..!! এখানে একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের আগের দিনের প্লান-টা ছিল একটা Root Hunting ইভেন্ট। কোথাও একটা Vertical Rock Wall খুজে পাওয়াই ছিল আমাদের মুল প্লান। অতএব, সমস্ত Climbing Gear তো সাথেই আছে!! র‌্যাপলিং-এর কথা শুনে তো সবার আনন্দ আর ধরেনা.. কে কার আগে নামবে তাই নিয়ে হৈ চৈ, হুড়োহুড়ি। কেউ ঝর্ণার মাঝখানে দাড়িয়ে ভিজছে, কারো ঝুলে থাকা অবস্থার একটা ছবি চাই, কেউ পড়ে গিয়ে আবার সামলে নিয়ে রক্তাক্ত দাত বের করে হাসছে সে এক কান্ড কারখানা আমাদের!!


অতঃপর সমস্ত হৈ চৈ আর অস্থির সুন্দর ঝর্ণাটা পিছনে ফেলে বেড়িয়ে পড়লাম । সংগ্রহ করা সমস্ত আবর্জনা ভাগাভাগি করে নিয়ে ফিরতি পথের বাকী সব ময়লা কুড়াতে কুড়াতে সন্ধ্যার কিছু পর সবাই ফিরে এলাম রেল লাইনে। বৃষ্টির কারনে ময়লাগুলো পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি তাই সেগুলোর দায়িত্ব রেল লাইন সংলগ্ন ব্যাবসায়ীদের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে, মানুষগুলোর অবাক চোখের সামনে দিয়ে ফিরে চললাম সবাই।
এই ইভেন্টে অংশগ্রহন করা অনেককে-ই আমি চিনি না এমনকি নাম ও জানা নেই..!! তাই নির্দিষ্ট কিছু নাম উল্লেখ করে অন্যদের ছোট করতে মন চাইছেনা। সবার কাছে সবাই আমরা আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা এখানেই থেমে যাবনা। আমরা আবারও একত্রিত হব। আবারও দল বেধে নেমে পড়ব কোন ঝিরি, ঝর্ণা বা পাহাড়ি পথে। আমরা চাইনা আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোথাও আর এক চিলতে আবর্জনাও পড়ে থাকুক। আগামী-র মানুষগুলোর জন্য তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-ময় কোন পৃথিবী নয় একটা সবুজ পৃথিবী আমরা রেখে যাবই.!!!


এই গল্পে Living With Forest, Trekkers of Bangladesh, ClimberHub সহ কয়েকটা সক্রিয় দলের কথা না বললেই নয়। ওদের সাহায্য ছাড়া পুরো ইভেন্ট-টা এতটা সুন্দরভাবে শেষ করা সম্ভব হত কিনা আমার জানা নেই। এছাড়া-ও বনের প্রতি তীব্র ভালবাসায় আসক্ত মিরশরাই রেঞ্জের কিছু বন কর্মকর্তা, কর্মচারী সহ স্থানীয় মানুষ, ধর্মগুরু ও জনপ্রতিনিধি-দের কাছে আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

আসুন সবাই যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ-এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সচেষ্ট হই। একমত হই, ডাস্টবিন নয় একটা সবুজ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে।

আপনার মন্তব্য