ভঙ্করতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি

29
SHARE

বাংলাদেশের সাগর উপকূলে প্রতি বছর একাধিকবার নিম্নচাপ, ঘূণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে কোনো কোনোটা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক হয়ে দেখা দেয়। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্নিঝড়সমূহের মধ্যে ১৯৭০ সালেরটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্নিঝড় এবং এটি সর্বকালের সবচেয়ে । এ ঝড়ের কারণে ৫ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যার অধিকাংশই অতি জলোচ্ছ্বাসের কারণে ডুবে মারা যান।

ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে ১৯৭০ সালের ৮ই নভেম্বর সৃষ্ট হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ই নভেম্বর এটির গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘন্টায় ১৮৫ কিমি (১১৫ মাইল) এ পৌঁছায় এবং সে রাতের শেষভাগে তা উপকূলে আঘাত করে। জলচ্ছ্বাসের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। এতে ঐসব এলাকার বাড়ি-ঘর, গ্রাম ও শস্য স্রোতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ছিল তজুমদ্দিন উপজেলা, সেখানে ১৬৭০০০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭০০০ জনই (৪৬%) প্রাণ হারায়।

আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর। উনিশ’শ সত্তরের ১২ নভেম্বর ভোলা চট্টগ্রাম নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর পটুয়াখালী সহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিল ভোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজো আঁতকে ওঠেন ওই অঞ্চলের মানুষ। ঘটনার এতদিন পরও জলোচ্ছ্বাস আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে উপকূলবাসীকে।

৪৬ বছর আগের এই দিনে এক রাতের ব্যবধানে ভোলার চার ভাগের একভাগ মানুষ নিমিষে নিঃশেষ হয়ে যায়। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় এখানকার বিস্তীর্ণ জনপদ। সাগর পাড়ের মনপুরা, কুকরী-মুকরী ঢালচরসহ ছোট ছোট দ্বীপচর এবং নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর বেশিরভাগ মানুষই প্রাণ হারায়। এমনকি ভোলা শহরও জলচ্ছ্বাসের ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি।

স্থানীয়ভাবে সেই ঝড়ের পরিচিতি ছিল ‘গোর্কি’ নামে। এর ভয়াল থাবায় সৃষ্ট বাস্তবতা বুঝাতে তখন পত্রিকার শীর্ষ সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল ‘ভোলার গাছে গাছে ঝুলছে লাশ’। গোটা এলাকা পরিণত হয়েছিল মানুষ আর গবাদিপশু’র লাশের স্তূপে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, মা তার প্রিয় সন্তানকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সত্তরের সেই বিষাদ আর যন্ত্রণাময় স্মৃতি নিয়ে এখনো দিন কাটছে গোর্কির মুখ থেকে বেচে আসা মানুষগুলো।

প্রতিবছর ১২ নভেম্বর এলে এই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ দিনটিকে গভীর শোক ও আতঙ্কের সাথে স্মরণ করে। কেননা প্রত্যেকেই হারিয়েছিলেন তাদের প্রিয় স্বজনকে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মিত হয়নি। বেড়িবাঁধগুলোও সংস্কার করা প্রয়োজন এবং কোথাও কোথাও পুননির্মাণ করা প্রয়োজন। অনেক প্রকল্প ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

তাছাড়া, যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেসবও যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় সে জন্য কঠিন নজরদারীতে রাখা প্রয়োজন। তা না হলে দেখা যাবে বেশিরভাগই বিফলে যাবে।

রিলেভেন্ট এই বিষয়গুলোর উপর ভিডিও দেখতে চাইলে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি – ঠিকানা – YouTube.com/Bangladeshism

আপনার মন্তব্য