আনলাকি থার্টিনের কবলে হুমায়ূন আহমেদ

31
SHARE

ইশতিয়াক আহমেদ 

১৩ সংখ্যাটির উপর কারা যে ‘আনলাকি’ অপবাদটা প্রথম দিয়েছিল, তা জানি না। তবে শুনেছি প্রাচীনকাল থেকেই এই বিশ্বাসটা মানুষের মধ্যে ছিল। আর সেটাও আবার কোনো নির্দিষ্ট দেশের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধও ছিল না। তার মানে হচ্ছে, যুক্তি থাক বা না-থাক এ বিশ্বাসের পেছনে একটা সার্বজনীনতা আছে।

তাই অনেকে এ সংখ্যাটিকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। তারপরও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে গেলে ভাগ্যের পরিহাস বলেই মনে করেন। কিন্তু চাইলেই কি আর সব সময় একে এড়িয়ে থাকা যায়? নিশ্চয়ই না। যার কপালে লেখা আছে তাকে আনলাকি থার্টিনকে মেনে নিতেই হয়।

তবে এটা সত্য যে, ইচ্ছা কিংবা দৈব যেভাবেই হোকনা কেন কারো সঙ্গে ‘আনলাকি ১৩’ জড়িয়ে গেলেই সেটা যে সবার জন্য সমান দুর্ভাগ্য বয়ে আনবে তা কিন্তু নয়। এই যেমন আমাদের বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র হুমায়ূন আহমেদ। তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর। কম-বেশি দুঃখ, আঘাত সবার জীবনেই থাকে। হুমায়ূন আহমেদের জীবনেও ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের সবটাই কি আনলাকির কালো ছায়ায় ঢাকা ছিল?

মোটেই না। যদি তাই থাকত, তাহলে তিনি আজ বাংলা সাহিত্যের আকাশের এতটা জায়গাজুড়ে আলো ছড়াতে পারতেন কীভাবে?   

নিজের জন্মক্ষণ নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ তারআমার ছেলেবেলায় লিখেছেন, ‘আমার জন্ম ১৩ই নভেম্বর ১৯৪৮ সন শনিবার রাত ১০টা তিরিশ মিনিট শুনেছি ১৩ সংখ্যাটাই অশুভ এই অশুভের সঙ্গে যুক্ত হল শনিবার শনিমঙ্গলবারও নাকি অশুভ রাতটাও কৃষ্ণ পক্ষের জন্ম মুহূর্তে দপ করে হারিকেন নিভে গেল ঘরে রাখা গামলার পানি উল্টে গেল একজন ডাক্তার যিনি গত তিন দিন ধরে মা সংগে আছেন তিনি টর্চ লাইট জ্বেলে তার আলো ফেললেন আমার মুখে ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, এই জানোয়ারটা দেখি তার মাকে মেরেই ফেলেছিল! আমি তখন গভীর বিস্ময়ে টর্চ লাইটের ধাঁধানো আলোর দিকে তাকিয়ে আছি চোখ বড় বড় করে দেখছিএসব কী? অন্ধকার থেকে আমি কোথায় এলাম? জন্মের পর পর কাঁদতে হয় তাই নিয়ম চারপাশের রহস্যময় জগৎ দেখে কাঁদতেও ভুলে গেছি ডাক্তার সাহেব আমাকে কাঁদাবার জন্যও ঠাশ করে গালে চড় বসালেন আমি জন্মমুহূর্তেই মানুষের হৃদয়হীনতার পরিচয় পেয়ে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলাম

আসলে আনলাকি বলে পরিচিত হলেও জ্যোতিষশাস্ত্র মতে ১৩ একটি রহস্যময় সংখ্যা। এর অধীনে যারা থাকেন তাদেরও জীবনেও রহস্যময়তার সুস্পষ্ট ছাপ থাকে। হুমায়ূন আহমেদের জীবনের দিকে তাকান, রহস্যময়তা খুঁজতে হবে না, বরং সেটাই যেন তাঁর আসল অবয়ব। শুধু তাই নয়, তাঁর গল্প, উপন্যাসের চত্রিগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু ভাবুন, বুঝতে পারবেন রহস্যময়তা কাকে বলে।

হুমায়ূন আহমেদ একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ নাটক চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্পউপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর এই কালপর্বে তাঁর গল্পউপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনাহীন। তাঁর সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি শুভ্র চরিত্রগুলি যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে

বাংলা সাহিত্যের এই রাজপুরুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। কিন্তু আজো তাঁর বইগুলোর জন্য বাংলাএকাডেমির বই মেলায় পাঠকের ভিড় জমে। তাঁর স্বপ্নের বীজ ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ’ এখনো আলো ছড়াচ্ছে নেত্রকোনায়।গাজীপুরের নুহাশপল্লী মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করে সকল শ্রেণির মানুষদের। আজ আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র এই মানুষটির জন্মদিন। তিনি নেই তবু আসুন, আমরা সবাই বলি- শুভ জন্মদিন; প্রিয় লেখক, আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, ভালো থাকুন এটাই আমাদের প্রার্থনা।

রিলেভেন্ট এই বিষয়গুলোর উপর ভিডিও দেখতে চাইলে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি – ঠিকানা – YouTube.com/Bangladeshism

আপনার মন্তব্য