চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক নতুন ফিল্ম সিটি!
December 18, 2016
NahidRains (24 articles)
Share

চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক নতুন ফিল্ম সিটি!

বাংলাদেশে ধীরে ধীরে একটু একটু গড়ে উঠছে এক নতুন মিডিয়া সিটি, এক নতুন ফিল্ম সিটি আর পরিপূর্নতা পাচ্ছে একটি পূর্নাঙ্গ আধুনিক ফিল্ম সিটিতে। এর সবকিছুই হচ্ছে চট্টগ্রামে যা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে আর এর সবচাইতে বড় অংশীদার বাংলাদেশীজম প্রজেক্ট এবং নাহিদরেইন্স পিকচার্স।

সকলের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর হাসাহাসি পেছনে রেখে ২০০৮ সালে নাহিদরেইন্স পিকচার্স চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করেছিল অনেকটা জিদের বশে। চট্টগ্রামে কেন কিছু হয়না, কেন কিছু নেই – এমন একটা অনুভূতি থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল নাহিদরেইন্স পিকচার্সের। সেসময় চট্টগ্রামে সিনেমা বানোর কারিগর বা তার চর্চা কিছুই ছিল না। বিচ্ছিনভাবেই চলত সবকিছু। বাংলাদেশীজম প্রজেক্টেরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। সেসময় বাংলাদেশীজম প্রজেক্ট বলতে শুধু নামটাই ছিল।

৮ বছর পর, এখন সেই নাহিদরেইন্স পিকচার্সের চট্টগ্রামের ফিল্ম সিটি করার স্বপ্ন প্রায় পূর্নাঙ্গ রুপে এসেছে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে আধুনিক সিনেমা প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠান নাহিদরেইন্স পিকচার্স। আর বাংলাদেশীজম প্রজেক্ট হলো নাহিদরেইন্স পিকচার্সের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। শুরুর দিকে সবাইক অনেক তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করত চট্টগ্রামে ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানী করার জন্য। সবাই বলত “গ্রামে সিনেমা কোম্পানী” বা “খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই” এবং এধরনের নানা কমেন্ট। কিন্তু এসবকে পেছনে ফেলে চট্টগ্রামে মিডিয়া সিটি গড়ার জন্য যা যা করার দরকার ছিল সবই করতে হয়েছে। চট্টগ্রামে হবার কারনে সময় একটু বেশী লেগেছে – এই যা।

এই মুহুর্তে নাহিদরেইন্স পিকচার্স বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ন একটি সিনেমা প্রতিষ্ঠান। সিনেমা বানানোর প্রতিটি উপকরন প্রতিষ্ঠানের নিজেদের কাছেই আছে। যেমন অত্যাধুনিক সব সিনেমা ক্যামেরা, আধুনিক ফিল্ম পোস্ট প্রোডাকশন ল্যাব যা বাংলাদেশে অদ্বিতীয়, কয়েক ফ্লোরের স্টুডিও এবং ২০০ একর জায়গা নিয়ে একটি আউটডোর শুটিং লোকেশন যা চট্টগ্রামের অদূরে পটিয়াতে অবস্থিত। নাহিদরেইন্স পিকচার্সের কর্নধার এবং আমাদের এই বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের প্রেসিডেন্ট নাহিদ হেলাল চট্টগ্রামেরই মানুষ। আর তাই চট্টগ্রামের জন্য একটা সফট কর্নার সবসময় ছিল। যুগ যুগ অস্ট্রেলিয়া থাকার পর তিনি পরিবারের জন্য দেশে ফিরে সরাসরি চট্টগ্রামে তার এই স্বপ্ন পূরনের কাজ শুরু করেন।

নাহিদরেইন্স পিকচার্স এর সিইও এবং বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের প্রেসিডেন্ট নাহিদ হেলাল, যাকে অনেকেই “নাহিদরেইন্স” হিসেনেই চেনেন।

তবে শুরুটা অনেক কস্টের ছিল। সেসময় না ছিল কোন কাজ, না ছিল কোন ক্লায়েন্ট না ছিল দক্ষ জনবল। আর এই দক্ষ জনবলের অভাবটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল। সেসময় বাংলাদেশীজম প্রজেক্টঅ মোটামুটি পপুলার ছিল। ঠিক হলো নতুন একটি ফিল্ম স্কুল তৈরী করা হবে। যেখানে ট্রেনিং দিয়ে তাঁদের আবার প্রতিষ্ঠানে রিক্রুট করা হবে। প্রায় ১ বছর চলল সেই স্কুলের কার্যক্রম। আজ এই প্রতিষ্ঠানে ৩০ জনেরও উপর কর্মকর্তা এবং ক্রিয়েটিভস আছেন যাদের বেশীরভাগই সেই ফিল্ম স্কুল থেকেই ট্রেনিং নিয়েছিলেন। চটগ্রামেই সিনেমা রিলেটেড জনবল তৈরী করার জন্য এর চাইতে ভাল উপায় আর ছিল না।

নাহিদরেইন্স পিকচার্স বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিমকে অনেকটা পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে সবসময়। প্রতিষ্ঠানটির ধারনা, এই মুহুর্তে দেশীয় মিডিয়া অনেক বেশী দূষিত এবং নতুন মিডিয়া সিটি গড়তে গেলে পাশ কাটিয়ে নতুন ধ্যান-ধারনাতেই শুরু করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির বেশীরভাগ কন্টেন্টই ডিজিটাল কন্টেন্ট যা বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের মাধ্যমে এত বছর আপনারা অনলাইনে দেখতে এসেছেন। অনলাইনে তাঁদের গড়ে উঠেছে বিশাল এক ভিডিও লাইব্রেরী যেখানে আছে শত শত ভিডিও – সিনেমা, শর্টফিল্ম, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হতে শুরু করে মিউজিক ভিডিও, কমেডি আরো অনেক কিছু। সামনে আসছে একটি নতুন মেগা সিরিয়াল “কালপুরুষ” এবং নতুন সিনেমা “ভেলকি”।

অনলাইন কন্টেন্ট হলেও এই প্রতিষ্ঠানটির সব কিছু তৈরী করা হয় আন্তর্জাতিক মানের কথা ভেবে। ব্যবহার করা হয় আধুনিক এবং মূল্যবান সব 6K এবং 4K ক্যামেরা। ক্যামেরার মোশন কন্ট্রোল জন্য প্রতিষ্ঠানটির আছে বেশ কয়েকটি রোবোটিক আর্ম। সত্যিকারের সিনেমা ক্যামেরা এবং সিনেমা লেন্স দিয়ে ধারন করা হয় প্রতিটি শর্টফিল্ম। আছে নিজস্ব লাইটিং এবং প্রোডাকশন ক্রু। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে সবচেয়ে ভাল কোয়ালিটি উপহার দেয়া। হোক সেটা অনলাইনে। গতবছরের মাঝামাঝি সময় ইউটিউবে বাংলাদেশীজম এবং নাহিদরেইন্সের অফিশিয়াল চ্যানেল খোলা হয় এবং ১ বছরের মাথায় এখন এই চ্যানেলটির রয়েছে প্রায় ৩০,০০০ সাবস্ক্রাইবার এবং প্রায় ৩০০ ভিডিও। এই চ্যানেলে প্রতিদিনই আপলোড করা হয় নতুন নতুন ভিডিও।

 

চট্টগ্রামে থাকার কারনে প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিকে তেমন কোন ব্যবসা ক্লায়েন্ট না থাকলেও এখন এই প্রতিষ্ঠানের বেশীরভাগ ক্লায়েন্টই দেশের বাইরের। মুলত ভিডিও রিলেটেড আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির ্কর্নধার নাহিদ হেলাল বা নাহিদরেইন্স এই মিহুর্তে বিশ্বের বিখ্যাত ক্যামেরা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকমেজিক ডিজাইনের অন্যতম রিভিউয়ার। কিছুদিন আগে তাঁদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে নাহিদরেইন্সকে নিয়ে দেয়া হয়েছিল বেশ বড়সড় একটি ফিচার। ফিচারটির লিঙ্ক – এখানে পাবেন। এছাড়াও, ফিল্ম মেকারদের টাইমস খ্যাত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন “এশিয়ে ইমেজ” এর নভেম্বরের প্রিন্ট ভার্সনে এসেছিল নাহিদরেইন্সকে নিয়ে আরো একটি ২ পাতার ফিচার আর্টিকেল এবং ইন্টারভিউ। ব্ল্যাকম্যাজিক ছাড়াও আরো দুটি ক্যামেরা প্রতিষ্ঠান এবং ৩টি ফিল্ম টেক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত রিভিউয়ার তিনি।

Blackmagic Design এর সিঙ্গাপুরের অফিসে নাহিদরেইন্স

সিংগাপুরের ব্ল্যাকম্যাজিক সেন্টারে নাহিদরেইন্স রিভিউ করছেন নতুন কোন ক্যামেরা প্রযুক্তি।

দেশের বাইরের বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট হবার কারনে সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠছে প্রতিষ্ঠানটির ২য় শাখা। তবে বাংলাদেশেই থাকছে হেড কোয়ার্টার। চট্টগ্রামে ৪ টি ফ্লোর নিয়ে নাহিদরেইন্স পিকচার্সের মূল অফিস যা এন আর পি বিজনেস সেন্টার নামেই পরিচত। এই ফ্লোর গুলোতে রয়েছে অত্যাধুনিক পোস্ট প্রোডাকশন ল্যাব, কালার গ্রেডিং ল্যাব, স্পেশাল এফেক্ট স্টুডিও এবং ওপেন ফ্ল্যাট স্টুডিও যেখানে যখন যেমন খুশী সেট বানানো যায়।

নাহিদরেইন্স পিকচার্সের স্পেশাল ইফেক্ট স্টুডি ল্যাবের একটি অংশ – ক্রোমা স্টুডিও

আছে পূর্নাঙ্গ অডিও এবং ডাবিং স্টুডিও। বিদেশের বেশীরভাগ ক্লায়েন্ট এই প্রতিষ্ঠান থেকে “কালার গ্রেডিং” সার্ভিস নিয়ে থাকে যা বাংলাদেশে আর কোথাও দেখা যায়। কালার গ্রেডিং এবং পোস্ট প্রোডাকশন ল্যাবের সকল প্রযুক্তি ইন্সটল করতে সহায়তা করেছে ব্ল্যাকমেজিক ডিজাইনের কলাকুশলীগন। ১০-১২বিট কালার ডেপথের যেকোন ফুটেজ সেটি ফোর-কে বা সিক্স-কে বা এইট-কে যাই হোক না কেন, চট্টগ্রামের এই ল্যাবে কালার গ্রেড করা যায় যা যেকোন সিনেমার প্রিন্টের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এবং প্রতিষ্ঠানটি হলিউড কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে পারে এই ল্যাব দিয়েই।

ফ্লোর -৩ . নাহিদরেইন্স পিকচার্স। ধারন করা হচ্ছে কোন একটি অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন। চট্টগ্রামের টেলিভিশনে আধুনিক অনুষ্ঠানের জন্য নাহিদরেইন্সকেই ডাকা হয়েছিল সরকারকে এসিস্ট করার জন্য।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ব্রডকাস্ট রুমে মাননীয় মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাহেবের সাথে নাহিদরেইন্স

পোস্ট প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি বাদ দিয়ে, আউটডোর যে শুটিং লোকেশন যা এনআরপি ফিল্ম সিটি হিসেবেই পরিচত কিছু কিছু জায়গায়, এই জায়গার ডেভলপমেন্টও চলছে গুটি গুটি পায়ে। ২০০ একরের এই জায়গাটি নির্বিগ্নে শুটিং করার জন্যই নেয়া এবং এখানে তৈরী করা হচ্ছে বড় একটি ডরমিটারী । পাহাড় এবং দীঘিতে ঘেরা এই জায়গাটি যেকোন ধরএন্র শুটিং এর জন্য বেশ ভাল একটি লোকেশন। তবে জনসাধারনের জন্য জায়গাটি উন্মুক্ত নয়। ভবিষ্যতে হয়তো অন্যান্য সিনেমা নির্মাতাদের জন্য খুলে দেয়া হবে।

NRP FILM CITY

NRP FILM CITY

NRP Film City – 1

পোস্ট প্রোডাকশন ল্যাব – ১

পোস্ট প্রোডাকশন ল্যাব – ২

ল্যাব – ১ এর আরো বিশদ ছবি

ল্যাব ৪

ল্যাব ৫

চট্টগ্রামে তরুনদের মাঝে ফিল্ম মেকিং এর স্বপ্ন বুনে দেয়ার জন্য পাইওনিয়ার হিসবেই দেখা হয় নাহিদরেইন্স এবং বাংলাদেশীজম প্রজেক্টকে। আর ঠিক এভাবেই চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে একটি বড় মিডিয়া মার্কেট। তৈরী হচ্ছে ক্লায়েন্ট। তৈরী হচ্ছে নতুন ধাচের সিনেমা এবং নানা রকম ভিডিও প্রোডাকশন। ২০১৭ তে আসছে নতুন সিনেমা – এই প্রতিষ্ঠান থেকেই। যা সম্পূর্ন চট্টগ্রামেই তৈরী করা হবে। চট্টগ্রামে বসে ঢাকার মিডিয়ার তেমন একটা সহায়তা পাওয়া যায় না এমনকি নিউজমিডিয়াও কোনদিন কাভার করতে চায় না বা পারলেও করে না। আর তাই, নাহিদরেইন্স পিকচার্স বুঝতে পেরেছিল, নিজেরা কিছু করতে গেলে দরকার হবে নিজেদের কোন মিডিয়া, নিজেদের একটি দর্শকদের বেইজ – আর ২০১১ সালে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের। এরপরেরটা – সবই এখন ইতিহাস। এই মুহুর্তে বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের ফ্যানের সংখ্যা প্রায় ১ মিলিয়ন এবং নাহিদরেইন্সের ফেসবুক পেজটি ছিল বাংলাদেশের ২য় ফেসবুক পেজ যা ভেরিফাইড হয়েছিল প্রথমে। যদিও এগুলো নিয়ে কারো কোম মাথা ব্যাথা ছিল না।

চট্টগ্রামে কিছু করতে গেলে সবকিছু নিজেদেরই করতে হবে – কেউ এগিয়ে আসবে না – এই মনোভাব নিয়েই শুরু হয়েছিল সবকিছু। এখনও চলছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির এখন রয়েছে বিশাল এক ক্লাব যেখানে আছে অভিনেতা অভিনেত্রী হতে শুরু করে গায়ক, প্রোডাকশন ক্রু এবং আরো অনেক কিছু। এই ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৩০০ এর উপরে এবং নাহিদরেইন্স পিকচার্সের প্রতিটি প্রোডাকশনে থাকে এই সদস্যদের পদচারনা। এই ক্লাবেরও রয়েছে নিজস্ব আলাদা অফিস এবং মেম্বারশিপ খুব রেস্ট্রিকটেড করে রাখা হয়েছে। ফিল্মের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস মানুষরাই এই ক্লাবের মেম্বারশিপ অর্জন করতে পারে।

সামনে এই নাহিদরেইন্স পিকচার্স এবং বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের আসছে বেশ বড় সড় কিছু চমক। দেশকে খবু বড় ধরনের কিছু দেখানোর প্ল্যান আছে আমাদের। আশা করি সাথে থাকবেন। আর হ্যাঁ, ইউটিউব চ্যানেলটি একবার ঘুরে আসতে ভুলবেন না যেন আর অবশ্যই সাবস্কাইব করে রাখবেন। হতে পারে, আপনিও হয়ে যাবেন নতুন কোন ইতিহাসের একটি অংশ।

আপনার মন্তব্য