বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পাহাড়ি নদী..!!!


সেই সেপ্টেম্বর থেকে নানা রকম প্লান-প্রোগ্রাম করেও যখন বান্দারবান যাওয়াটা অনেকটাই অনিশ্চিত তখনও অথৈ সমুদ্রে খড়খুটোর মত অরনীর জেদ-টাই আঁকড়ে থাকা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিলনা। কারন আমি জানি, একমাত্র অরনী-র পক্ষেই সম্ভব প্রবল প্রতিকুল পরিস্তিতিতেও বান্দারবান যাওয়ার জন্য হাসতে হাসতে প্লান করা। কয়েকবার বাস/ট্রেন-এর টিকেট কেটেও যখন রওনা হয়ে যাওয়াটা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে দাড়াচ্ছিল তখন-ও ফোনে অরনীর একটাই কথা ভাইয়া তুমি কোথাও যেওনা আমরা যেকোন দিন চলে আসব। কেউ না এলেও আমি আসবোই, তুমি শুধু রেডী থেকো। অতঃপর শুধুই অপেক্ষা। এবার আসি প্লানের কথায়। যেখানে আমাদের বান্দারবান যাওয়াটা প্রায় অনিশ্চিত সেখানে অনেকটা নাছোড়বান্দা, অবুঝ, অবাধ্য শিশুর মত-ই দুইটা প্লান আমাদের হাতে। এক, পুরো রুমা খাল হেঁঠে রুমা খালের উৎসমুখ পর‌্যন্ত পৌছানো আর দুই, যেভাবেই হোক রাইখ্যিয়াং খালের উৎস খুজে বের করা।


তবে অাসল সমস্যাটা হলো তখনই যথন কোনভাবেই আমরা সময়ের ফাঁক-ফোঁকড়ের সাথে আমাদের প্লান-টাকে মেলাতে পারছিলাম না। নুন্যতম দশ দিন সময় হাতে নিয়ে বেরুনো দরকার কিন্তু হরতালের বাজারে ৭ দিনের বেশী সময় আর মহাভারতের ১০৮-টা নীল পদ্ম যেন সমার্থক। এমতাবস্থায় ২৫শে ডিসেম্বর, ক্রিসমাসের এই তারিখ-টা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত হাতে চলে এলো। ঐদিন হরতাল থাকবেনা আর ৩রা জানুয়ারী শুক্রবার থাকবে সব মিলিয়ে চমৎকার একটা টাইমিং। আর সেভাবেই সমস্ত প্লান গুছিয়ে রওনা হয়ে গেলাম Trekkers of Bangladesh এবং Living with Forest-এর আমরা পাঁচ সদস্য আর আমাদের গাইড এবং প্রিয় ছোট ভাই সাদেক।


প্রচন্ড ঠান্ডায় কাপতে কাপতে ক্যাম্পিং, জমে যাওয়া পা নিয়ে সহ্যের শেষ সীমায় পৌছে গিয়েও ঝিরি পথে হাঁটা, বারবার পথ ভূল, জঙ্গল কেটে পথ তৈরী করা, ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়েও হাসি মুখে পথ চলা, এই শীতের সময়েও অবাক করে দেয়া জোকের অত্যাচার, খাবার ফুরিয়ে যাওয়ার পর ঝিরির চিংড়ি, কাঁকড়া এমনকি গাছের শিকড় বাকড় খেয়ে চলা দটো বিশাল দিন, এক প্লেট ভাত-কে ছয় জন মিলে ভাগ করে খাওয়া, তিলোভা-র যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যাকপ্যাক নিয়ে সারাক্ষন ওকে পচানো, অরনীর সদ্য কেনা শখের DSLR-টা খালের পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাওয়া, পাহাড়-এর সরল মানুষগুলো সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়ার আনন্দ, এমন হাজারো আনন্দ বেদনা মিলিয়ে ১০ দিনের এই সফল অভিযান শেষ করে এলাম।


এখনো আমাদের সবার নাকে চোখে পাহাড়ের গন্ধ, এখনো ঘুম ভেঙ্গে মনে হয় স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে আছি। এখনো তীব্রভাবেই মনে হতে থাকে আজ সারাদিন কতটুকু পথ পাড়ি দেয়া যাবে।এক অদ্ভ্যুৎ ঘোর লাগা সময় পার করছি এই যান্ত্রিক শহরে বসে থেকেও। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল আবার কবে যাবো এটাও একটা বিশাল প্রশ্ন সবার মনে……!!! Jon Krakauer –এর ভাষায় “HAPPINESS IS REAL WHEN SHARED” আর তাই এই অসংখ্য মূহুর্তের মাঝে থেকে ফ্রেমে বন্দি করে নিয়ে আসা কিছু সময় আপনাদের সবার জন্য উৎসর্গ করলাম। আশা করি আপনাদের সবার ভাল লাগবে। আপনাদের সবার সুবিধার্থে আমরা আমাদের পুরো অভিযান-কে দুটো আলাদা অ্যালবামে ভাগ করছি, একটা রাইখ্যিয়াং খাল আর অন্যটা রুমা খাল হিসেবে। এখানে রাইখ্যিয়াং খালের কিছু ছবি দেয়া হল। বাকিগুলো ধীরে ধীরে দেয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি সবাই আমাদের সাথেই থাকবেন।


এই অভিযানে যারা সাহায্য, সহযোগিতা, উপদেশ, ট্রেইল ম্যাপ ছাড়াও অন্যান্য সকল বিষয়ে আমাদের পাশে ছিলেন তাদের কাছে আমরা অনেক কৃতজ্ঞ এবং তাদের প্রতি আমাদের অকৃপন ভালবাসা এই ছোট্ট পরিসরে লিখে বা বলে কখনোই শেষ করা যাবেনা, আর যার কাছে আমি এবং আমরা শুধু কৃতজ্ঞ-ই নই আরো ব্যাপক কোন ঋনে আবদ্ধ তিনি হলেন আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন তারিক ওবায়দা ভাই। আপনাদের সাহায্য ছাড়া আসলেই আমাদের সফলতা বা স্বপ্নপূরন কোনভাবেই সম্ভব হত না। এই অভিযানের সমস্ত কৃতিত্ব Trekkers of Bangladesh এবং Living with Forest-এর যৌথ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। আশা করি অারো অনেক অভিযানে আমরা এভাবেই পাশাপাশি অনেক পথ পাড়ি দেব।

রাইখ্যিয়াং খালঃ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি-র Lombok Row রেঞ্জের বুকের মাঝখান দিয়ে হিম হিম ঠান্ডা পানি নিয়ে চরম উচ্ছলতায় এলোমেলো নিয়মে ছুটে চলা তুলতুলে সুন্দর একটা পাহাড়ি ঝিরি হলো রাইখ্যিয়াং। এই রাইখ্যিয়াং ঝিড়ি-র জন্ম Thingdawl Te Tlang নামের এক অটল পাহাড়ের এর বুকের প্রায় ২৫১৯ ফুট উচুতে। জন্ম থেকেই সে অবাধ্য, দুষ্টু। এত বড় বড় পাহাড়, গাছ, পাথর, কারো কথাই সে না শুনে ছুটে চলেছে আপন নিয়মে, মুক্ত গতিতে। তার চলের পথে সে কাছে ডেকে নিয়েছে ছোট বড় আরো অনেক ঝিড়িধারাকে। এই সহযাত্রী জলধারারগুলোর মধ্যে রয়েছে Chawndraw Khang Cheng Aw, Dhaenie Aw, Maran Aw, Mang Lang Aw, Tum Aw এবং Rang Komma… সবাই মিলে এক জোট হয়ে দিনে দিনে হয়েছে পরিনত, হয়েছে আরো বড়, শেষমেশ আকাশ ছোঁয়া পাহাড় আর পাহাড় ছোঁয়া মেঘগুলোকে কাচকলা দেখিয়ে বিলাইছড়ির বিস্তীর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে মিশেছে কাপ্তাই লেকে…

এখানে উল্লেখিত সব ঝিড়ি-র নাম স্থানীয় লোকজনের সাথে কথোপকথন এবং Jaruchori গ্রামের Yongrong Mro Murong-এর কাছ থেকে সংগৃহীত।

 

ছবি ও তথ্যঃ Living with Forest

আপনার মন্তব্য
Previous ফেসবুক আপনার ফোনের কথোপকোথন শুনছে !
Next বাংলাদেশের জঙ্গী ইস্যু । বিশ্বনেতারা কোথায়?