কালবৈশাখী রাতে, রামগড়ের জঙ্গল…!!!
December 10, 2016
Bangladeshism Desk (754 articles)
Share

কালবৈশাখী রাতে, রামগড়ের জঙ্গল…!!!

রাত তিনটার-ও বেশী কিছু। গালে ঠাস ঠাস করে দুইটা সেইরাম লেভেলের থাপ্পড় খেয়ে বোকার মত জেগে উঠা চোখ গুলো থেকে ঘুমটা উধাও হতে না হতেই আবারো একটা…!! কিন্তু চোখ খোলার পর যা ঘটতে দেখলাম তাতে থাপ্পড়ের উৎস খোজা তো দূরের কথা আমার নিজের উৎসই বিপন্নপ্রায়। ঘন্টায় কত কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে সেটা হয়ত আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবে..!! তবে যে কারো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য যে তা যথেষ্ট তা বেশ ভালই বুঝতে পারছিলাম। বাতাসের তোড়ে আমার তাবু-টা বুঝি যায় যায়। হুড়োহুড়ি করে উঠে বসে তাবুর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখলাম পাশের তাবুতে শোভন ভাই টর্চ জ্বালিয়ে বাতাস জরিপ করার ব্যার্থ চেষ্টায় ব্যাস্ত। আর আমার টেন্ট পার্টনার রুমী ভাই-ও এরইমধ্যে জেগে উঠে ঘুম আর ভয় মেশানো হাতে তাবুটা সামলানোর চেষ্টা করলেও তেমন সুবিধা করতে পারছেনা। খুব-ই বিশ্রী একটা অবস্থা….

এবার একটু পিছনের কথায় আসা যাক। কদিন ধরেই প্লান করছিলাম একটা ক্যাম্পিং-এর। কিন্তু কারো সাথেই আমার সময় মিলছেনা তাই একসময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম একা একা হলেও যাবো..!! প্রায় সব প্লান যখন শেষ তখন একদম শেষ সময়েই বলা যায়, হঠাৎ করে শোভন ভাই আর রুমী ভাই-এর প্রস্তাব ওরা-ও যাবে। দুজনেই আমার অনেক পছন্দের মানুষ অতএব, না করে দেয়ার কোন কারন তো নেই-ই বরং উনাদের কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ। উনারা না থাকলে সে রাতে হয়ত ভয়ংকর কিছু-ও ঘটতে পারত। যাই হোক হলাম তো তিনজন কিন্তু যাবো কোথায়..!! আমি একা হলে হয়ত আমার পছন্দের এবং খুব সহজে যাওয়া যায় এমন কোন জায়গায় চলে যেতাম কিন্তু ওদের প্রস্তাব হল একটু জঙ্গল না হলে বা কাছে একটা ঝর্ণা না থাকলে কেমনে কি…!! অতঃপর টুকটাক প্লান করেই রওনা দিয়ে দিলাম সেই তথাকথিত জঙ্গল আর ঝর্ণার দিকে। গরমে খটখটে হয়ে যাওয়া পাহাড়, ঝিরি এসব পিছনে ফেলে ঝর্ণাটায় যখন পৌছুলাম তখনও বিকেল হয়নি। রোদ আর ডিহাইড্রেশন তো আছেই  ফোটা ফোটা পানি থেকে ফ্লাক্স-টা ভরতে মনে হচ্ছিলো যুগ পার হয়ে যাবে…

এসব না হয় গেল কিন্তু এরচেয়ে-ও ভয়ংকর ব্যাপারটা হল তাবু ফেলার মত তেমন ভালো কোন জায়গা পাচ্ছিনা। একবার ভাবছি অন্য কোথাও যাই আবার ভাবছি এখানেই কোন একটা ব্যাবস্থা করি এভাবে দোনামনা করতে করতে একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম এখানেই যেভাবে হোক থেকে যাই। যদিও আমাদের কারো কাছেই জায়গাটা ক্যাম্প করার পক্ষে ভাল মনে হচ্ছিলনা। প্রথমত জায়গাটা ৪0/৪৫ ফুট বা তারও বেশী উচু একটা ঝর্ণার ঠিক নিচেই যেখানে বৃষ্টি মানেই পাহাড়ি ঢলের ভয়, তার উপর এখানে ওখানে কদিন আগের বেশ কিছু পাহাড় ধ্বসের চিন্হ আমাদের দিকে দাত বের করে যেন হাসি-ঠাট্টায় ব্যাস্ত। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বাতাস, কারন জায়গাটা এতটাই সংকীর্ন একটা কুপের মত যেখানে বাতাস বেশ দাপট দেখিয়েই ঘুরে বেড়ায় অতএব একটা কালবৈশাখী মানেই আমাদের দফারফা..!!

কিন্তু কি আর করা, ব্যাকপ্যাকগুলো রুমী ভাইয়ের দায়িত্বে রেখে আমি আর শোভন ভাই বেরুলাম জায়গাটা একটু ঘুরে দেখতে, আসল উদ্দেশ্য হল কাছাকাছি এমন কোন জায়গা খুজে বের করা যেখানে ঝড়-বৃষ্টি হলে তড়িঘড়ি ক্যাম্প সরিয়ে নেয়া যাবে। অতঃপর পাওয়া গেল এমন একটা জায়গা যেখানে আর যাই হোক পাহাড় ধ্বস বা ঢলে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। যদিও খাবার মত পরিস্কার পানি একমাত্র সেই ঝর্ণাতেই তারপরও এটাকেই সবচেয়ে যুৎসই জায়গা ভেবে ফিরে গিয়ে রোদ কমার অপেক্ষা করছি। এরই মাঝে বিশাল এক ঝামেলা হয়ে গেল শোভন ভাইরে নিয়ে। কিভাবে কিভাবে যেন সে, ভয়ংকর ঝুড়ঝুড়ে মাটি আর পাথর বেয়ে ঝর্ণা-টার গায়ে একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেল…..!!! না পারছে নামতে. না উঠতে….!!! সে গল্প-টা কালকেই বলব…. যাইহোক, শেষমেষ শোভন ভাই নামতে পারল। এরই মাঝে রোদ-টাও প্রায় নেই.. লেগে গেলাম ক্যাম্পিং এর যোগাড় যন্ত্রে।নুডলস খাওয়া, ফড়িং, প্রজাপতি, পাখির পিছে ছুটে বেড়ানো, বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রকম গল্প, ছবি তোলা, তারা দেখা, গান সব মিশেমিশে বেশ ছিলাম সময়গুলো।

অতঃপর, পরদিন খুব ভোরে উঠে আরো দু-তিনটা ঝর্ণা ট্রেক করার স্বপ্ন দেখতে দেখতে যখন ঘুমাচ্ছিলাম ঠিক তখনই এই উপদ্রব….

কিভাবে সমস্ত কাপড়-চোপড়, ক্যামেরা, খাবার-দাবার. তাবু সবকিছু গুছিয়েছি আমরা মনে হয় কেউ-ই জানিনা। প্রচন্ড বাতাস, পিঠ ফুটো করে দেয়া বৃষ্টি আর ঠান্ডায় থরথর করে কাপতে থাকা শরীর ছাড়া আমার তেমন কিছুই মনে নেই। মাথার ভিতর একটাই চিন্তা ঢল-টা আসার আগেই এই দোজখ-টা ছেড়ে যেতে হবে। আর উপরি পাওনা হিসেবে পাহাড়ধ্বস আর ঝর্ণার উপরের মাতালের মত দুলতে থাকা গাছগুলো ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা তো আছেই। সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে এই ভয়ংকর অবস্থায় আমরা যখন বিকেলের দেখে আসা জায়গাটায় এসে পৌছেছি তখন বৃষ্টি-টা কিছু কমেছে। কোনরকমে তাবু বিছিয়ে ঝড় থামার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কতক্ষন সেটা জানিনা, মনে হয় অনন্তকাল পরে যখন ঝড় থেমে গেছে তখন আমাদের ক্লান্ত, বিধ্ধস্ত শরীর আর কিছুই মানছেনা। ঘুম আর ঘুম…… পরেরদিনের ভোরের সমস্ত প্লান সত্যিকারের স্বপ্ন-ই হয়ে গেল। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে রাতে ভিজে যাওয়া সমস্ত জিনিসপত্র শুকিয়ে যখন আবার ট্রেইলে তখন দূপুর গড়িয়ে গেছে। এর পরের সময়টা যে একেবারে খারাপ গেছে তা কিন্তু নয়। সেই গল্পটা আগামীর জন্য রেখে দিলাম…

ছবি এবং গল্পঃ Living with Forest

পুনশ্চঃ বনে ঘুরতে গেলে বা ক্যাম্পিং করতে গেলে পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোন প্রকার আচরন করা থেকে বিরত থাকুন। সমস্ত অপচনশীল আবর্জনা নিজের সাথে নিয়ে আসুন বা উপযুক্তভাবে ধ্বংস করে আসুন। আরেকটা ব্যাপার হলো, থাপ্পড়-টা কোন অশরিরির ছিলোনা। আমার তাবুর আধখোলা দরজাটাই কাজটার জন্য দায়ী।

আপনার মন্তব্য