মিশন চিম্বুক-২, বান্দরবান

57
SHARE

মুরং দাদাটা যখন তার দোকান থেকে মাথা বের করে দাঁত কেলিয়ে একটা হাসি দিল তখন কিঞ্চিৎ লজ্জাই পেলাম । বেশ কিছুক্ষণ শুধু তিনটা দোকানের পাশে ঘুরঘুর করছি কিন্তু পথের চিহ্নমাত্র নেই । কিছুক্ষণ আগেই এই দাদাকে বলেছিলাম “আমরা পাহাড়ের উপর দিয়ে ওই দিকে যাবো, আমাদের কাছে পথ চেনার মত মেশিন (GPS Device) আছে কোন সমস্যা হবেনা” । দাদাটা অবশ্য সরাসরি বলেই দিলেন “কোন মানু(মানুষ) নিয়মিত ওদিকে যায়না, পথ নাই” ।

শুরুতেই এভাবে গুলিয়ে ফেলবো ভাবতেই পারিনি । গুলিয়ে ফেলার যথেষ্ট কারণও ছিল বটে, গুগলআর্থে যে জায়গাটা খালি ছিল সেখানে এখন তিনটা দোকান আর ইট-বালির বিশাল ভান্ডার দাঁড়িয়ে আছে । যেভাবেই হোক পথ খুঁজে নিতেই হবে । থানচি ব্রীজ থেকে যতবারই চিম্বুক রেঞ্জের এই পাহাড় সারির দিকে তাকিয়েছি, ততবারই মনে হয়েছিল পাহাড় গুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে । আর এই রেঞ্জের দুটো বড় চুড়ায় উঠে দাড়ানোর স্বপ্ন তো ছিলই।

উপায় না পেয়ে শেষ পর্য্যন্ত দোকানের পিছন দিয়ে ঢুকে শনের জঙ্গল হাতড়ে ট্রেইল খুঁজে বের করলাম । জিপিএস যেটাকে ট্রেইল দেখাচ্ছে আমরা সেটাকে ঘন ছনের জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই দেখছি না । জানতাম সামনে একটা পাড়া আছে, তাই বুকে সাহস নিয়ে এগুতে থাকলাম । কিছুক্ষন পর নতুন আপদের উদয় হল “কাঁটা গাছ” । মনেহল যেন সে কিছুতেই এগুতে দিবেনা আমাদের । কখনও পেন্ট আবার কখনও গেঞ্জি টেনে ধরে রাখতে চাইছে । জুমের সাথে এই পাহাড়ের হাঁটার পথটাও পরোপুরি বদলে গেছে । ঘন্টা দুয়েক পরেই দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত পাড়ার জুম ।

আহা এবার মনেহয় একটু শান্তিতে হাঁটতে পারবো । অবশেষে পারায় পৌঁছাতে সন্ধা নেমে এল । কিন্তু পাড়ার অভ্যর্থনাটা যে এতটা বাজে ভাবে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি । পাড়ায় ঢুকতেই কোত্থেকে একটা বিষাক্ত পোকা যে মাথায় এসে পড়লো বুঝতেই পারিনি একটা কামড়েই মাথা আর হাতে প্রচন্ড যন্ত্রনা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো। পরদিন কলাই পাড়া থেকে বিদায় নিয়ে যথারীতি রওয়ানা হলাম মনটং পাহাড়কে টার্গেট করে, এরপর চিম্বুক-২ । খনচুঅং পাড়ার পরে কিছু জুমের রাস্তা ছিল মনটং পাহাড়ের নিচ পর্যন্ত । তারপর আবার যেই লাউ, সেই কদু । জঙ্গল ঠেলে মনটং-এর চূড়ায় যেতেই বিষাক্ত কালো পিপড়ারা হুল ফুটানো শুরু করলো ।

পড়ি কি মড়ি, চুড়া জয়ের আনন্দ ভুলে কোনরকমে GPS রিডিং-টা নিয়েই ভাগলাম । মনটং থেকে কাপখুং পাড়ার পথটা ভালই ছিল । এরজন্য ওই পাহাড়ের গয়াল গুলোকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না। কাপখুং পাড়ার পরেই শুরু হল আবার সেই কঠিন পরীক্ষা । এবার একটু ভিন্ন স্টাইলে । আগুন লাগানোর অপেক্ষায় কেটে রাখা নতুন কাপখুং পাড়ার জুমের জমিগুলো থেকে চূঁছালো বাঁশ গুলো যেন পায়ে হুল ফোঁটানো শুরু করলো ।

প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছিলো এই পা বুঝি এবার আর বাড়িতে ফেরৎ নেয়া যাবেনা । এভাবে ১ঘন্টা কাটা বাশেঁর সাথে যুদ্ধের পর আবার শুরু হল জঙ্গল হাঁতানো। আধঘন্টা জঙ্গল হাঁতড়ে অবশেষে আমরা কাঙ্খিত চূঁড়ায় পৌঁছাতে পারলাম । চূঁড়া থেকে নামার পথে আবারো সেই বিরক্তিকর ঘন জঙ্গল । যতদ্রুত সম্ভব নামতেই হবে, কারণ সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে ।

পথে বেশ কবার কয়েকটা গোখরা বেশ ভয় পাইয়ে দিলেও মনকে শক্ত করে, অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্ভন আর বার বার ট্রেইল হারিয়ে বিদ্যামনি পাড়ায় পৌছাতে রাত আটটা বেজে গেল । এবং যথারীতি বিদ্যামনি পাড়াটাও শান্তির হলনা। পাড়ার যুবক ছেলেরা একের পর এক প্রশ্ন আর হুমকি দামকি শুরু করলো । কেন গেছি ওই পাহাড়ে? আমরা কি সাংবাদিক নাকি? আমাদের কি কাজ? ইত্যাদি প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে পড়লেও কিছুই করার ছিলনা। শেষমেষ, থানছির এক বন্ধুর মাধ্যমে পাড়ার লোকজনের কাছ থেকে মুক্তি পেলাম, সেই সাথে শেষ করলাম ছোট্ট অথচ প্রচন্ড ঝামেলায় পরিপূর্ন চিম্বুক-২ ও মনটং চুড়া অভিযান।

এখানে একটা কথা না বললেই নয়। বিদ্যামনি পাড়া থেকে খুব সহজেই চিম্বুক-২ এর চুড়ায় যাওয়া যায় তবে সেক্ষেত্রে দারুন সুন্দর ট্রেইলটার অনেক কিছু ছাড় দিতে হবে।

 

কৃতজ্ঞতায়ঃ Mangminung Nahid এবং Living with Forest.

আপনার মন্তব্য