in

ইন্টারস্টেলার বিশ্লেষণ (শেষ পর্ব)

এই পর্ব পড়ার আগে ইন্টারস্টেলার বিশ্লেষণ পর্ব ১ ও ২ পড়া থাকতে হবে।

শুরু করি তৃতীয় পর্ব।

তারা ম্যান’স প্লেনেট এ গিয়ে ম্যান কে জাগিয়ে তুলল, সে এই গ্রহের আবহাওয়া বোঝাতে লাগলো তাদের। বলতে লাগলো এখানে ৬ মাস দিন, ৬ মাস রাত থাকে। প্রয়োজনীয় অক্সিজেন আছে। কিন্তু এক পর্যায়ে কুপার বুঝতে পারে এ সব মিথ্যা। ম্যান একা একা এই গ্রহে মারা যাওয়ার সাহস পায়নি, তাই সে সিগনাল দিয়েছিলো নিজে বাচার জন্য, সে কুপার দের একটা শিপ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে মারা পড়লো.. কুপার রা হারালো আরো কিছু সময়।

শিপে ফিরে গেলো তারা, এর মধ্যে তারা দেখলো মার্ফ এর মেসেজ এসেছে।

ড. ব্রান্ড হাসপাতাল এ অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। এমিলিয়া মেসেজ পেয়ে কাদতে কাদতে যেই মেসেজ বক্স বন্ধ করতে যাচ্ছিলো, তখন মার্ফ বলল, তুমি কি জানতে? এমিলিয়া? তুমি জানতে সব মিথ্যা? তোমার বাবা কোনোদিন চতুর্থ মাত্রার সমীকরণ সমাধান করার চেষ্টা করেনি। সে জানতো না কিভাবে করতে হবে? সে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে, আর তোমরা পৃথিবীতে আমাদের কে মারা যাওয়ার জন্য ফেলে রেখে চলে গেছো.. তোমরা ভ্রুন নিয়ে গেছো নতুন মানবজাতি জন্ম দেয়ার জন্য, আমাদের কে বাচানোর কোনো উদ্দেশ্য তোমাদের ছিলোনা। আমার বাবা কি জানতো? Did he abandon me? I just want to know this.. Did my father abandon me?

কিন্তু ততক্ষনে তাদের যোগাযোগ মাধ্যম একপক্ষীয় হয়ে গিয়েছিলো। পৃথিবী থেকে মেসেজ আসছিলো কিন্তু মহাকাশ থেকে মেসেজ যাচ্ছিলো না। কুপার এবং এমিলি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো.. তাদের কে মিথ্যা আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো যে পৃথিবীর মানুষ কে বাঁচানো যাবে..

আসলে ড. ব্রান্ড এর শুধু একটা প্ল্যান ই ছিলো, ভ্রুন গুলো অন্য গ্রহে স্থাপন করে মানবজাতি টিকিয়ে রাখা। পৃথিবীর মানুষ দের বাচানো নয়..

মার্ফ হাল ছাড়েনা, সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। সে তার বয়ফ্রেন্ড কে নিয়ে তার পুরানা বাসায় ফিরে যায়,যেখানে ছোটবেলায় সে থাকতো, যে রুমের বুকশেলফ এ কেউ তাকে মোর্সকোড এর মাধ্যমে কথা বলতো। মার্ফ একটা আশা নিয়ে যায়,তার রুমের সেউ ভুত যদি তাকে কোনো সমাধান দেয়? কুপার রাও এডমুন্ড গ্রহ পায় যা মানুবজাতির বসবাস যোগ্য। তারা ব্ল্যাকহোল এর চারিদিকে পরিভ্রমন করে এডমুন্ড গ্রহে পৌছাতে হবে,কিন্তু ব্ল্যাকহোল তাদের শিপের ভর অনেক বেশী হয়াতে তাদের টানতে থাকে এবং তাদের গতি কমে যেতে থাকে, তখন কুপার সিদ্ধান্ত নেয় তার যা হারানোর হারিয়ে গেছে সে এখন রিস্ক নিয়ে হলেও সিংগুলারিটির সমাধান ব্ল্যাকহোল থেকে সংগ্রহ করবে। সে তার শিপ টি এমিলিয়ার শিপ থেকে ডিটাচ করে ফেলে। কুপার জানে ব্ল্যাকহোল এর যাত্রা তার কাছ থেকে পৃথিবীর হিসাবে ৫১ বছর নিয়ে নিবে, তা জেনেও কুপার ব্ল্যাকহোল এ পরে যায় এবং এমিলিয়ার শিপ এডমুন্ড গ্রহের দিকে যাত্রা করে……..

ব্ল্যাকহোল এ পরার সময় কুপার তার শিপ থেকে ইজেক্ট হয়ে যায় এবং ইনফিনিটি গর্রতে পড়তে থাকে.. তার মনে হচ্ছিলো সে মারা যাচ্ছে, এটা কি আফটারলাইফ? সে প্রশ্ন করতে থাকে নিজেকে..

তার সাথে তার সংগি রোবট টারস ও ব্ল্যাকহোল এ পরে গেছে.. কুপার চারিদিক তাকায় বোঝার চেষ্টা করে সে কি দেখছে? কোনো শেষ প্রান্ত নেই, সে হঠাত লক্ষ্য করে এখানে অসীম সংখ্যার বই স্তরে স্তরে সাজানো.. অনেক অনেক বই, বই এর মধ্য দিয়ে সে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে পারছে.. হঠাত কুপার একটি বইয়ের ফাকে মার্ফ কে দেখতে পায়,সেই ছোট্ট মার্ফ.. কুপার চিতকার করে ডাকতে থাকে.. মার্ফ তার ডাক শোনেনা..;

কুপার চিতকার করতে করতে কয়েকটা বই ধাক্কা দেয়,শেল্ফ থেকে পরে যায় বইগুলো.. মার্ফ অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকায়

কুপার ও অবাক!! এই ছোট্ট মার্ফ কে সে বুকশেলফ এর মধ্য দিয়ে কিভাবে দেখছে? কিছুক্ষন এর মধ্যে কুপারের আর বুঝতে বাকি রইলো না সে ৫ম ডাইমেনশন এর মধ্যে আটকা পরে আছে, যা হচ্ছে “সময়”। কে বা কারা সময় কে ফিসিক্যাল রুপ দিয়েছে, আর তা করার জন্য তারা ব্যাবহার করেছে মার্ফ এর রুম টিকে। মার্ফ এর রুমের অসংখ্য ইনফিনিটি মুহুর্ত কে এক করেছে ব্ল্যাকহোল এর ভেতরে। যেখানে কুপার ভেসে বেড়াচ্ছে মার্ফ এর অতীত থেকে বর্তমানের প্রতিটি মুহুর্তে..

এদিকে মার্ফ তার রুমে এসে দাড়িয়ে আছে,তার রুমের সেই ভুত কি তাকে গ্র‍্যাভিটি এর সমাধান দিবে? কিন্তু ইতিমধ্যে গ্র‍্যাভিটি এর সমাধান কুপারের হাতে,কারন সে অলরেডি ৫ম ডাইমেনশন এ আছে, চতুর্থ ডাইমেনশন তার কাছে এখন মোর্সকোড মাত্র। কিন্তু কুপার মার্ফ কে সেই তথ্য কিভাবে পাঠাবে?

হ্যা তার এই ইনফিনিটি ফিসিক্যাল টাইম ডাইমেনশন এর মধ্যে সঠিক মুহুর্ত টা খুজে বের করতে হবে.. মনে আছে কুপার মার্ফ কে একটি ঘড়ি দিয়েছিলো? সেই ঘড়ি ই হতে পারে তাদের সমীকরণ আদান প্রদান এর মাধ্যম। মার্ফ তার রুমে দাড়িয়ে আছে, ঘড়িটি শেল্ফ এ রাখা, হঠাত মার্ফ দেখলো তার ঘড়ির কাটা কোনো একটি মোর্সকোড দেখাচ্ছে.. মার্ফ চিতকার করে উঠলো.. চিতকার করে বলতে লাগলো ” Dad didn’t abandon us!! He saved us!! he was my ghost!! all this time!! he was my ghost!! ” মার্ফ গ্র‍্যাভিটি এর সমীকরণ পেয়ে গেলো। তারপর?? কুপারের কি হলো? যে বা যারা এই ৫ম ডাইমেনশন টি শুধু কুপারের জন্য তৈরী করেছিলো তারা এর ফিসিক্যাল রুপের কাজ শেষ হয়ার পর সব ধ্বংস করে ফেলল, এবং একটি মহাকাশ স্ট্যাশন কুপার কে পেলো। স্ট্যাশন এর নাম ছিলো ” কুপার স্ট্যাশন ” নামকরণ হয়েছে মার্ফ কুপার এর নামে, কারন সে চতুর্থ মাত্রার সমীকরণ সমাধান করেছিলো।

কুপার কে স্ট্যাশন এর তারা জানালো মার্ফ বারবার বলতো সমীকরণ টি সে তার বাবার কাছে পেয়েছে, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি.. কুপার তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে! কত বছর পার হয়েছে পৃথিবীতে? -৯০ বছর।

মার্ফ? সে কি বেচে আছে?

হ্যা, সে হিমাগারে থেকে অপেক্ষা করেছে আপনার জন্য, সে বলত আপনি তাকে প্রমিস করেছিলেন আপনি ফিরে আসবেন..

কুপার মার্ফ কে দেখতে গেলো.. মার্ফ মৃত্যু পথ যাত্রী। থুরথুরে বুড়ি, কুপার ৩৩ বছরের যুবক।

মার্ফ এর হাতে তার বাবার দেয়া ঘড়িটি। মার্ফ কাদতে লাগলো, “বাবা আমি জানতাম তুমি আসবে.. কিন্তু সন্তানের মৃত্যু কোনো বাবার দেখা উচিত না,তুমি চলে যাও.. –

Cooper- কোথায় যাবো আমি?

Murf- ব্রান্ড এর কাছে, যে একা কোনো এক নির্জন গ্রহে বসতি গড়ছে..”

মানববসতি আবার নতুন করে যাত্রা করছে। স্পেস স্ট্যাশনে গ্র‍্যাভিটি বলতে কিছু নেই, বাড়িঘর গুলো বৃত্তাকারে বানানো, ঠিক যেভাবে তারা কল্পনা করেছিলো।

ইন্টারস্টেলার মুভিটা শুধু সায়েন্স ফিকশন না, এটি মানবিক।

বাবা-মেয়ের মধ্যে যে সুন্দর সম্পর্ক টা দেখিয়েছে তা বলার বাহিরে, ঠিক যে সময় কুপার গ্র‍্যাভিটি এর মোর্সকোড পেয়েছে ঠিক তখন ই মার্ফ তার সেই রুমে উপস্থিত হয়েছে, কারন তাদের বন্ডিং।

মুভিটি নিয়ে আমি একবার ক্লাসে লেকচার দিয়েছিলাম, হাতে কলমে বোঝাতে পাড়লে হয়তো আরো মজার কিছু ইনফরমেশন দিতে পারতাম। এরকম মুভি শুধু এন্টারটেইনমেন্ট ই নয়, অনেক বেশী কিছু শেখা যায় এসব মুভি থেকে। এবং মুভিটি পুরোপুরি ফ্যামিলি মুভি।

IMDB রেটিং : ৮.৬/১০

আমার রেটিং: ১০/১০

অতিমাত্রায় ভক্ত আমি এই মুভিটির। সামনে আরো মুভি নিয়ে আলোচনা করতে চাই, পাঠক যদি নির্দিষ্ট কোনো মুভি নিয়ে আলোচনা করার জন্য রিকুয়েস্ট করেন, অবশ্যই চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।

What do you think?

Written by Mrinmoyi Jahan

Comments

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

একটি আবেগশূন্য টাকার মেশিন

কুয়োর ব্যাঙঃ বাঙালিত্ববোধ ও মূল্যবোধের হন্তারক