in

বিদায়

-হ্যালো
-কেন কল দিয়েছো?
-হঠাৎ মিস করছিলাম।
-ও
-পাহাড়তলির সেই গাছটার নিচে আসলাম। হঠাৎ মনে হলো, তুমি পাশে নেই।
-এই কথা গুলো কেন বলছো? যেন তুমি কলটা কাটার পর আমার রাত নির্ঘুম কাটে?
-আসাদ
-প্লিজ এই নামটা যেন আর একবারো তোমার মুখে না শুনি।

কথাটা বলেই কল কেটে মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম। আবার শুরু হলো। এসবের মানে কি? সে কেন এখনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে? মেয়েরা এমন হয় কেন? চলেও যাবে, যাবার পর ছেলেটা যদি তাকে ছাড়া সুখে থাকতে শিখে যায়, তাও সহ্য করতে পারে না। যত্তসব ভন্ডের দল।

ঝিম ধরে বসে রইলাম। আবার রিং বাজছে ফোনে। আমার বুক ধ্বক ধ্বক করতে লাগলো। মোবাইলটা নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নীলার কন্ঠ। আমি কি এটাই আশা করছিলাম? কখনোই না। নীলা নামে কেউ আমার জীবনে নেই। নীলা নামের কাউকে আমি চিনতাম না, চিনি না, চিনবো না।

অদ্ভুত, সে কাঁদো কাঁদো গলায় কথা বলছে কেন? সমস্যা কি মেয়েটার?

-কল কাটবে না প্লিজ। একটু পাহাড়তলির এখানে আসতে পারবে যেখানে আমরা প্রতিদিন দেখা করতাম। কিছু কথা ছিল।
-পারবো না।
-রিকুয়েস্ট করছি। একটু আসো প্লিজ।

আবার ফোন কেটে দিলাম। একটু পরই আবিষ্কার করলাম আমার অস্থির অস্থির লাগছে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হৃদয়ে বিষের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। মোবাইলটা বের করে নাম্বার ডিলিট করে দিলাম। এই মেয়ের বিন্দু মাত্র অস্তিত্বও আমার জীবনে রাখা যাবে না।

লাইব্রেরী তে গেলে কেমন হয়? ওখানে গেলে নিশ্চয় সময় কীভাবে কেটে যাবে টেরই পাবো না। কিন্তু আজ কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। মাঝে মাঝে এমন হয় কেন? কোন কারণ ছাড়া সব এলোমেলো লাগে; মনে হয় জীবনটা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। আসলেই কি কোন কারণ ছাড়া?

প্রায় ৩ মিনিট মনের সাথে যুদ্ধ করার পর গেলাম লাইব্রেরীতে। আমার নানা স্বপ্নে গড়া ছোট ছিমছাম একটি ঘর। ঠিক করলাম প্রথমেই চোখে যে বইটা পড়বে সেটা পড়বো। হাত বাড়াতেই উঠে এলো হুমায়ূন আহমেদের রুমালী। ইজি চেয়ারে বসে পড়তে শুরু করলাম। একটু পর পর দেখি কি পড়ছিলাম মনে নেই। আমি অন্য কিছু ভাবছি। কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। কিছুই ভালো লাগছে না।

বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। একটা রিকশা ঠিক করলাম। রিকশাওয়ালা রসিক টাইপের মানুষ। কথাই কথাই মজা করার স্বভাব। অথচ কত পরিশ্রম করেই না দিন কাটাতে হয় তাদের। তবু যদি মনের ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষার এতটুকুও পূরণ হতো! এক গাল হেসে কত সুন্দর করে কথা বলে লোকটা। দেখতে ভালো লাগে। এরকম মানুষকে প্রথম পরিচয়েই পছন্দ করাটা স্বাভাবিক।

-কই যাইবেন ভাইসাব?
-পাহাড়তলি। যাবা?
-পাহাড়ের আবার তলিও হয়! হ যামু।
-কত?
-কত দিতে চান?
-২০ টাকা ভাড়া।
-যত দেন আর কি। আমি তো আর মারামারি কইরা টাকা নিতে পারুম না। কি কন?

বলেই সে আয়োজন করে হাসতে লাগলো। হাসার ফাঁকে পানের পিকও ফেলে নিয়েছে বেশ কায়দা করে। আমি রিকশায় উঠে পড়লাম। রিকশাওয়ালা সাহেব আলাপ জমানোর চেষ্টা করছে।

-ভাইসাব দেখলেন রিকশা কেমন রকেট গতিতে চলতাসে। বুঝলেন ভাইসাব আমার রিকশায় পেসেঞ্জার এসির স্বাদ পায়। ওই বাসটারে দেখসেন না? দেখেন কেমনে পেলাস্টিকটারে ওভারটেক করি।

মানুষটাকে প্রথমে ভালো লাগলেও এখন লাগছে না। এত কথা বলছে কেন সে? মানুষ মানুষের মনের অবস্থা বোঝার একটা ক্ষমতা থাকলে ভালোই হতো। মানুষটার এত কথা শুনতে হতো না। সে নিজেই চুপ হয়ে থাকতো। সে অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে। একসময় সহ্যের বাহিরে চলে গেল ব্যাপারটা। বেশ শক্ত করেই বললাম, “আপনি আর কথা বলবেন না প্লিজ। কথা বললে প্রতি একটা শব্দের জন্য রিকশা ভাড়া থেকে এক টাকা করে করে কাটা হবে। আপনার রিকশা চালাতে যেমন কষ্ট হচ্ছে, আমারও কথা শুনতে কষ্ট হচ্ছে। আশা করি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন।”

রিকশাওয়ালা মনে হয় বেশ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সেই ধাক্কাই রিকশা চলার গতি কমে গেলো। সে একটা শব্দও করছে না। আমার বুদ্ধি আছে বলা যায়।

পাহাড়তলিতে এসে পৌঁছুলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। রিকশা থেকে নেমেই যা দেখলাম তা অনেকটা এরকম; একজন তরুণী এই বিকেলে একটা বটগাছের নিচে বসে কার জন্য অপেক্ষা করছে, এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বেশ ভালো মতোই সাজগোজ করেছে। পরনে নীল শাড়ি। সে হয়তো
ভাবছে আমার পছন্দের রঙের একটা শাড়ি পরে এলেই আমি আগের মতো চোখ ছলছল করে কিশোরীর মতো আবেগী গলায় বলবো, ‘কী ভয়ংকর সুন্দর লাগছে তোমাকে!’

যদিও দৃশ্যটা আসলেই সুন্দর।

আমার তাকিয়ে থাকার ব্যাঘাত ঘটিয়ে সে দেখে ফেললো আমাকে। তবে উঠে এলো না। চুপচাপ আগের মতো বসেই রইলো। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকার মতো দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি, কী বিচ্ছিরি কান্ড।

তার এভাবে তাকানোটা একটুও বদলায় নি। প্রথম প্রথম যখন সে আমাকে চিনতো না, একবার স্কুলে আমার দিকে এভাবে তাকিয়েছিল। আমি বিকেলে মামার টঙে আড্ডায় সবাইকে বললাম, ‘জানিস সে আজকে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল একটা সাপ আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, একটু পরই ছোবল মারবে’

সকলে বেশ ভালোভাবেই আমার দুঃখ হেসে উড়িয়ে দিলো। এখানেই শেষ হলো না, সেদিন থেকে বন্ধুমহলে নীলার নাম হয়ে গেল “সর্পমণি”।

নীলার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না তার আজকে উঠার প্ল্যান আছে। আমিই অবশেষে তার কাছে গেলাম। আমার দিকে সে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমি মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছি।

-কি ব্যাপার? শুধুই চেহারা দর্শন করতে ডেকেছো?
-তুমি সত্যিই আমাকে ভুলে থাকতে চাও?
-অবশ্যই চাই। তুমি এখনো কি আমার প্রেমিকা? তোমাকে ভেবে কেন কষ্ট পাবো? যদি পাই, সে কষ্টের দাম কে দিবে? তুমি?
-আসাদ।
-তোমার হাতে আর ৫ মিনিট সময় আছে। কি বলবে তাড়াতাড়ি বলে ফেলো।
-আমরা কি আবার আগের মতো হতে পারি না?
-না। তুমি সেদিনই হারিয়ে ফেলেছো আমাকে। জীবনে যা একবার হারিয়েছো তা আবার ফিরে পেতে চাইবে না। তোমার হাতে আর ৩ মিনিট আছে।
-কাজ থাকলে শেরে আসো। আমি অপেক্ষা করবো।
-প্রয়োজন নেই। এটাই আমাদের শেষ দেখা নীলা।
-এমন করছো কেন?
-তুমি আমার পুরনো প্রেমিকা দেখে অযথা কথা বলে আমার সময় আর টাকা নষ্ট করার জন্য তোমার কাছে সেই টাকা ফেরত চাইলাম না। যাই আমি। ভালো থেকো।

নীলা কেঁদে দিল। তার কান্না দেখার সময় এখন আমার নেই। ঘুড়ে দাঁড়ালাম। মনটা কেমন যেন করছে। এক মুহূর্তের জন্য আবেগে অন্ধ হয়ে যেতে চাইলাম, পরমুহূর্তে মনে পড়লো, নীলাই আমাকে শিখিয়েছে যা একবার ভুলতে শিখেছি সেদিকে কখনো ফিরে তাকাতে হয় না।

What do you think?

Written by Tahsin Kamal

Comments

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

গেম অফ থ্রোনসঃ S07E01 Review

আবার কখনও কি এমন JOLSHA(জলসা)’র আসর বসবে???