News
Posted By MP Comrade

রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার বিষয়ে মিয়ানামারের কেন এত লুকোচুরি?


কার্যত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বেশ জটিলতা সৃষ্টি করে রেখেছে মায়ানমার। তারা স্বীকার করে নিয়েছে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এই প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের রাখাইন প্রাদেশিক সরকারের সচিব টিন মং সোয়ে জানিয়েছেন, ২৫শে অগাস্টের পর থেকে প্রায় ৫৩৫,০০০ মুসলমান মংডু ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৯৬৭ জন। এর বাইরেও অনিবন্ধিত আরও রোহিঙ্গা আছে বলে অনেকের ধারণা।

এত বিশাল পরিমাণ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের ১মকিস্তিতে বাংলাদেশ থেকে ৮ হাজার ৩২ জনের তালিকা দেয়া হলেও তারা এর মধ্যে আটশ জনেরও মতো রোহিঙ্গার নাম অনুমোদন করেছে মায়ানমার। মিয়ানমারের ইমিগ্রেশন ও পপুলেশন ডিপার্টমেন্টের স্থায়ী সচিব মিন্ট কায়িং জানিয়েছেন এমুহূর্তে তারা বাংলাদেশ থেকে ৬৭৫ জন শরণার্থীকে ফেরত নিতে প্রস্তুত আছে এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে জানিয়ে দিয়েছেন তারা। রাখাইন রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সচিব গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, গত বছর ২৫শে অগাস্টের আগে রাখাইনে “প্রায় ১০ লাখ পাঁচ হাজার মুসলিম” ছিল। যা এখন সে সংখ্যা প্রায় চার লক্ষ ৭০ হাজার জনের মত। এদিকে দেখা যাচ্ছে জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের যে হিসেব দিচ্ছে, তার তুলনায় মিয়ানমার সরকারের হিসেবে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ কম। যদিও মায়ানমার সরকারের তরফে এর পূর্বে রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়া বা সংখ্যার বিষয়ে সরাসরি কেউ মন্তব্য করেনি। রাখাইন সরকারের সচিব টিন মং সোয়ে প্রথম এতো বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলমান পালিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নিলেন।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সূত্র বলেছে, মিয়ানমারের প্রস্তাব বা শর্ত মেনে সুষ্ঠুভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ব্যাবস্থা নেওয়া হলেও দেশটি একের পর এক নানা অজুহাত দিয়ে কালক্ষেপণ করছে। তারা একদিকে যেমন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে, আবার অন্যদিকে একের পর এক আলোচনা, চুক্তি, তালিকা হস্তান্তর, যাচাই-বাছাইসহ নানা কিছুর পরও সেই অর্থে প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই। এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে সংখ্যায় কম হলেও প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত রয়েছে।

মিয়ানমারের এহেন আচরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতিতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ঢাকায় সফররত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠিকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে চুক্তি সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।

তথ্য মতে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে আসা ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর। আর নতুন আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে যে কত বছর সময় লাগবে, তা নির্ভর করছে মিয়ানমারের সদিচ্ছার ওপর। রাখাইনে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি রোহিঙ্গারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের আশংকা এলাকায় ফিরে নিজেদের ঘরবাড়ি যে চিহ্নিত করতে পারবে তারা এমন পরিস্থিতি সেখানে আর নেই।

এদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নানাবিধ সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। তারা যে সব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে তাদের অবশ্যই ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে রাজি হতে হবে তারপর আরও কয়েক স্তর পার হয়েই মিলবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব। মিয়ানমার চাইছে রোহিঙ্গাদের এই বাঙালি আখ্যা দিয়েই একটা পৃথক জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের মতে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ডে (এনভিসি) নাম থাকতে হবে এমন বিষয় তাদের অধিকার আদায়ে যথেষ্ট নয়। তথ্য মতে ২০১০ থেকে ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ মিয়ানমার সরকারের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাত্র ৭ হাজার ৬০০ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এই কার্ডে যুক্ত হওয়ার বিপরীতে নাগরিকত্ব পেয়েছেন হাতে গোনা কয়েক শ জন।

মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের এই অভিযানকে জাতিসংঘ আখ্যা দিয়েছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে। বিগত দিনগুলোতে মিয়ানমারের ভূমিকা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, চাপে পড়ে তারা কিছুটা নমনীয় হলেও, আবার নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে মিয়ানমার। দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যে তালিকা বিনিময় হয়েছে সে প্রক্রিয়া কার্যত আর এগোচ্ছে না। হতাশাজনকভাবে এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিপরীতে  মাত্র ৬০০ জনের ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে মিয়ানমার সরকার।

এদিকে এক সাক্ষাৎকারে ফিলিপাইন এর প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বলেছেন, মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে বাঁচাতে যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম দেশটি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক তিনি। দুতার্তে এ ব্যাপারে ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। যদি সত্যিই এমন কিছু বাস্তবে পরিণত হয় তবে রোহিঙ্গা এই সংকট থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে বাংলাদেশের।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে জাতিসংঘ। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।  রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইউএনএইচসিআরের সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার দেড় মাসের মাথায় মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন করে এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে। যদিও সমঝোতায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মায়ানমার কি ভূমিকা রাখবে তা স্পষ্ট নয়। তবুও সমঝোতা স্মারকটি কিসের ভিত্তিতে করা হবে সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দেশটির সরকারের সঙ্গে দুই সংস্থাই এক প্রকার মতৈক্যে পৌঁছেছে বলে ইউএনএইচসিআর তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।


View Comments
There are currently no comments.