in

কালনাগিনী সম্পর্কে আমাদের কুসংস্কার!

বাংলাদেশের খুব পরিচিতি এবং জানাশুনো একটি সাপের নাম কালনাগিনী। কালনাগিনী নামটা সবার পরিচিত কম বেশি। কিন্তু খুব কম মানুষ এই সাপ কে দেখেছে। আবার এই সাপকে নিয়ে বিভিন্ন গল্প, সিনেমাও তৈরি হয়েছে।
বেহুলা-লখিন্দর থেকে শুরু করে কালনাগিনীর প্রেম, নাগ নাগিনী, শীষনাগ, নাগিনী কন্যা, নাগ পূর্ণিমা, নাগরানী, সতী নাগকন্যা, নাগমহল, নাগিনা, নাগজ্যোতি, নাচে নাগিন, রূপসী নাগিন ও নাগিনী সাপিনী এমন অসংখ্য সিনেমা তৈরি হয়েছে কালনাগিনীর নামে।
এই সাপকে সাধারণত বিষাক্ত সাপ হিসেবে জানি আমরা। বিভিন্ন হাটে বাজারে এই সাপকে সাপুড়িরা বিষাক্ত সাপ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন আমাদের। গ্রামে এই সাপকে সবাই ভয়ের চোখে দেখে। সবাই এই সাপকে উড়ন্ত সাপ, উড়াল মহারাজ সাপ, কালসাপ বা কালনাগ বলে ডাকে। সেই সঙ্গে নাগ-নাগিনীর বিষে মানুষের মৃত্যু হয় বলেও কথিত আছে। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে এসব গল্প-কাহীনি এবং সিনেমা শুধুই কাল্পনিক। বাস্তবে সাপটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রাণিজগতের সবচেয়ে সুন্দর সাপগুলোর মধ্যে অন্যতম সাপ হচ্ছে কালনাগিনী নামের এর এই সাপটি। যার ইংরেজি নাম হলো- (Ornate Flying Snake) ও বৈজ্ঞানিক নাম (Chrysopelea ornata)।
সাপটি বাস্তবে উড়তে পারে না যদিও ইংরেজিতে এর নাম (Flying Snake)। খাদ্যগ্রহণ, বৈশিষ্ট এবং চরিত্রগত কারণে উঁচু গাছের ডাল থেকে নিচু গাছের ডালে লাফ দিয়ে চলাফেরা করে সাপটি।
বাস্তবে এই সাপটির কোন বিষক্রিয়া নেই। এদের কামড়ে কারো মৃত্যু হয়েছে এমন কোন সঠিক তথ্যও নেই। কিন্তু বিভিন্ন গল্প সিনেমাতে এই সাপটিকে বিষাক্ত এবং বিষধর সাপ হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। এসব কাল্পনিক শুধমাত্র। ভুলভাবে উপস্থাপ করছে বিভিন্ন সিনামা গল্প দিয়ে। ফলে ভয়ঙ্কর ধারণা থেকেই সাধারণ মানুষ যখনই সাপকটিকে দেখে বিষাক্ত ভেবে মেরে ফেলে। তাই এ প্রকৃতির সাপ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
কিন্তু একটি কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করা হয়েছে শুক্রবার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র মহসীন মিয়া মধুর বাসা থেকে। বিকেলে এটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হবে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গলের পরিচালক সজল দেব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন । এর আগে সিলেটের চা বাগানসহ মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে সাপটির দেখা মিললেও বর্তমানে তেমন দেখা যায় না।
তবে গভীর বনে এদের দেখা মেলে। এদের দৈর্ঘ্য ১০০ থেকে ১৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। মাথা লম্বা ও চ্যাপ্টা এবং মুখের সামনের দিকে চৌকোনা আকৃতির। এদের দেহের রঙ পিঠের দিকে সবুজ। আবার হালকা সবুজ রঙয়ের এবং কালচে ডোরাযুক্ত হয়। ঘাড় থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত মেরুদণ্ড বরাবর কমলা রঙের এবং লাল দাগ দেখা যায়।
এই সাপগুলো সাধারণত পোকামাকড়, গিরগিটি, ছোট পাখি, টিকটিকি, ব্যাঙ এসমস্ত প্রাণি খেয়ে জীবন ধারন করে থাকে। জুন থেকে জুলাই মাসে এদের প্রজনন মৌসুম। এবং এ সময় এরা সাধরারণত ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। এবং এই ভাবে এদের বংশ বিস্তার করে।
‘সাপ বেঁচে থাকুক আমাদের প্রয়োজনে’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশে সাপের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে দেশের আনাচে-কানাচে কাজ করেছেন কামরুজ্জামান বাবু এবং প্রসেনজিৎ দেববর্মা।
তারা বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাপকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু জীববৈচিত্র্যের এ গুরুত্বপূর্ণ সাপটি নিয়ে রয়েছে আমাদের অজ্ঞতা।
নাগ-নাগিনী বলতে কোনো সাপ নেই, এই সুন্দরীকে সাপকেই বলা হয় নাগ-নাগিনী। এদের বিষ নেই। কুসংস্কার ও বিভিন্ন সিনেমায় সাপটিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের কারণে মানুষের মনে ভুল ধারণা জন্মেছে। সাপটিকে দেখলেই মেরে ফেলছে মানুষ। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে সাপটি। যদিও মাঝে মাঝে চা বাগানে সাপটিকে দেখা যায়।
নাগ-নাগিনী কিংবা কাল সাপ বলে কোন সাপ নেই। মানুষের ভুল উপস্থান করার কারণে আমরা এই সাপকে বিষাক্ত সাপ হিসেব জানি। আর এ জন্য এই সাপকে আমরা যেখানে দেখি মেরে ফেলার চেষ্টা করি। যার কারণে সাপটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে। সাপ সম্পর্কে কুসংস্কার দূর করে মানুষ সচেতন হলেই রক্ষা পাবে নাগ-নাগিনী তথা এ প্রকৃতির সাপ। কুসংস্কার এই সাপটিকে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে ফেলছে। তাই এসব কুসংস্কার বিশ্বাস না করায় শ্রেয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে এই সাপটিকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু কুসংস্কার এবং ভুল উপস্থাপনায় আমরা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে ফেলতি বসছি প্রায়। কারণ এই সাপ সম্পর্কে আমরা এখনো অজ্ঞাত, কুসংস্কার আমাদেরকে এই সাপ সম্পর্কে অনেক মিথ্যা শিখিয়েছে। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে সাপটি।

What do you think?

Written by Md Meheraj

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

চেঙ্গিস খান

পৃথিবীর অদ্ভুত সুন্দর কিছু গাছ