ফারাজ আইয়াজ হোসেন এবং আমাদের লজ্জা

1365
SHARE

গুলশান ট্রাজেডির যখন আমরা সর্বপ্রথম জানতে পারলাম ফারাজ আইয়াজ হোসেনের কথা তখনও হয়তো আমরা অনেক কিছু মাথায় আনিনি। পরে মিডিয়াতে আসল, বন্ধুদের জন্য ফারাজ নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। আর ফারাজের প্রশংসায় আমাদের আমজনতার ফেসবুক ফিড আর মুখরিত। ফারাজ সেই মুহুর্তে আমাদের ন্যাশনাল হিরো। আমাদের মুখে ফারাজ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

পরের দিন, আবার সেই মুখেই এই আমরাই ফারাজকে হিরো থেকে জিরো বানানো শুরু করি। কিছু তথাকথিত ফেসবুক সেল্ব্রিটি আর নামছাড়া অনলাইন পত্রিকার টাইটেল দেখে নিজেদের মুখে ফেনা তুলা শুরু করি। ন্যাশনাল হিরো থেকে ফারাজকে বানিয়ে দেই সন্ত্রাসী! ১ দিনের মাথায় আমরা সব বদলে ফেলি অনায়াসেই! যেসব অনলাইন নিউজপেপার আর ফেসবুক সেলিব্রিটির পেজে “যৌন রোগের ওষুধ” অথবা “নায়িকার নগ্ন ভিডিও” টাইটেলের নিউজ শোভা পায়, ঠিক তাদের কথায় আমরা ফারাজকে একেবারে জিরো বানিয়ে দেই। মাটিতে পড়ে থাকা ফারাজের গলা কাটা, কবজি কাটা লাশও আমাদের থামাতে পারে নি। এই হলাম আমরা। আর এই হলো আমাদের লজ্জা।

কি মনে হয়? অন্যদের ব্রেইনওয়াশের গল্প আমরা শুরু করি তখন তাই না? বিশ্বাস করতে পারিনা, ব্রেইনওয়াশ কেমনে করে? অথচ আমরা নিজেরাই ব্রেইনওয়াশড হয়ে বসে থাকি নিজের চোখের সামনে সব পরিষ্কার দেখেও। তাহলে এসব জঙ্গি – সন্ত্রাসীদের দোষ দিয়ে লাভ কি? আমরা তো নিজেরাই ব্রেইনওয়াশড! ফ্রিডম অফ স্পিচ আর সেন্সলেস স্পিচের মধ্যে হাজার পার্থক্য আছে। আমরা ফ্রিডম অফ স্পিচে বিশ্বাসী না। আমরা প্র্যাকটিস করি “সেন্সলেস স্পিচ”। আর আমাদের এসব কর্মকান্ডই বাইরের দুনিয়ায় আমাদের জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়?

“বাংলাদেশী? আরে ওরা তো নিজেদের পায়ে নিজেই কুড়াল মারে। নিজেদের বীরদের, নিজেদের ভাল লোকদের তারা ইচ্ছা মত লাথি মারে”। যখন আমরা ফারাজকে হিরো থেকে জিরো বানাচ্ছিলাম, তখন বেশীরভাগ শিক্ষিত মানুষরাই তো এসব করছিল! তাহলে কেমন শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা? ফারাজ তো নিজের জান দিল বন্ধুদের জীবন বাঁচাতে। বিশ্ব মিডিয়া তার এই ত্যাগকে অনেক বড় সম্মান দিল। কিন্তু আমরা, আমজনতা, যারা “সেন্সলেস স্পিচ” দিয়ে বেড়াই যত্রতত্র, তারা কি করলাম?

তাদের কথায় ফারাজের ত্যাগ ছোট হয়ে যাবে না কিন্তু ফারাজের কাছে তো আমরা ছোট হয়ে গেলাম আজীবনের জন্য। জাতি হিসেবে। সন্দেহ আর বিশ্বাস এক জিনিষ না। আর আমাদের একটা অভ্যাস হলো – অতি অল্প বিদ্যায় আমরা উপসংহারে চলে যেতে পারি অনায়াসেই। চিলে কান নিয়ে গেছে – এই গল্পটা আসলে আমাদের জন্যই প্রযোজ্য। ফেসবুকের আরিফ আর হোসেন ভাই একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন সেদিন

“আজকে বাবুল আক্তারকে নিয়ে লেখি we_are_babul_yehh

কাল আবার ওটা তাড়াতাড়ি মুছে লেখি why_babul_why?

চুই করে হিরো, হয়ে গেলো জিরো

ফারাজের ক্ষেত্রেও সেইম … গতকাল যে আমাদের ন্যাশনাল হিরো ছিল, তাকে আজকে ভিলেন বানিয়ে চোখ চুক্ষা করে তার জুতার রং দেখি

আমরা-আপনারা যারা চোখ বড় বড় করে ভাবছিলাম, “এই ব্রেইন ওয়াশ জিনিসটা কেমনে হয়”, তারা বরং নিজেদের দেখি

২৪ ঘন্টার হোমপেইজ এভাবে আমাদের মগজ ধোলাই করতে পারলে, ২/৩ মাসের ধোলাইয়ে সুইসাইড মিশনে যেতে রাজি করানো তো পানি ভাত

প্রব্লেম যে আমাদের ব্রেইনের ব্রেইনে”

আসলে, এসব আইএস, জঙ্গি, দেশের নানা সমস্যা – এসব ঠিক করতে হলে আগে আমাদের নিজেদের ঠিক হতে হবে। অভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে। সেন্সলেস স্পিচের প্র্যাকটিস বন্ধ করতে হবে। মাঝে মাঝে তো মানে হয়, আসলে এই দেশের জন্য ফেসবুক বা সামাজিক নেটওয়ার্ক না। আমরা রেডি না এসবের জন্য। আমাদের শিক্ষার বড় অভাব। সুশিক্ষার অভাব।

ফারাজের জন্য দোয়া রইল। এর চাইতে বেশী তো আর কিছু আমরা দিতে পারলাম না। এটা হয়তো ফারাজেরই খারাপ কপাল ছিল যে সে এই দেশে জন্মেছে। এটাই আমাদের লজ্জা। এবং হ্যাঁ, লজ্জাজনক কাজ করেও আমরা লজ্জিত না। কারণ যারা ফারজকে নিয়ে দুনিয়ার আজেবাজে পোস্ট দিচ্ছিল, তাকে জিরো বানাচ্ছিল, তাদের তরফ থেকে একটা স্টেটমেন্টও দেখিনি যেখানে তারা বলেছে “Faraz, I am Sorry”।

তাই, তাদের হয়ে ফারাজকে আমরাই বলে দিলাম “Faraaz, we are sorry…but you know our habit right? You know how we are as a nation right?”

ফারাজের এই ত্যাগ আমাদের দেখা সেরা বাংলাদেশীজম। আর তাই, ফারাজকে আমাদের পক্ষ থেকে জানাই “বাংলাদেশীজম স্যালুট”।

আপনার মন্তব্য