শুধুমাত্র মুসলিমদেরকেই কেন ‘সন্ত্রাসী’ বলা হচ্ছে?

236
SHARE

আজকালকার বিশ্ব মিডিয়া “মুসলিম” শব্দটাকে একটা বীভৎস রুপ দিয়েছে। শুধু মাত্র মুসলমান হবার জন্য একজন মানুষকে নানাভাবে হেয় করা হয়। নিজের অভিজ্ঞতা যদি বলতে যাই, তবে অনেক উদাহরন দেয়া যায়। যেমন একবার লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে কোন কারন ছাড়া ৬ ঘন্টা আটকে রাখা কিংবা মেলবোর্ন কাপের উদ্বোধনে ঢুকতে যাওয়ার সময় অন্যদের সাধারন নিরাপত্তা চেক করা হলেও নিজের আইডিতে মুসলমান নাম থাকার কারনে একটু ‘স্পেশাল’ চেক বা বেশী সময় নিয়ে চেক করা তো অহরহ ঘটনা হয়ে গেছে। পাসপোর্ট বা নাগরিক যে দেশেরই হই না কেন। আর মুসলিম দেশের পাসপোর্ট হোল্ডার হলে তো সে এক বিভীষিকা! ট্রেনে বা স্টেশনে মাথায় টুপি পড়া কাউকে দেখলে তো পশ্চিমা দেশ এমনকি অনেক মুসলিম প্রধান দেশেও মানুষ আঁতকে ওঠে! মুসলমানদের ব্র্যান্ডিং এমনভাবেই করা হয়েছে গত কয়েক যুগ ধরে। তবে ইতিহাস ঘাটলে হিসেবটা কেমন জানি গোলমেলে ঠেকে।

ইতিহাস বই ঘাটলে দেখা যায়, পৃথিবীর সব নৃশংসতম ঘটনাগুলোতে মুসলমানদের তেমন কোন হাতই নেয়। কখনও শুনেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানরা কিছু করেছে বা তার পরের যুদ্ধে? মুসলমানরা কি কোনদিন কোথাও পারমানবিক বিস্ফোরন ঘটিয়েছে? কই না তো! তবে মুসলমানদের দেশগুলোকে কোনভাবেই পারমানবিক শক্তির অংশ হতে দেওয়া হয় না কারন যদি ফাটিয়ে দেয়! কিন্তু কারা এগুলো ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে তা ইতিহাস ঘাটলেই বোঝা যায়। হিটলার কি মুসলিম ছিল নাকি? কই শুনি নাই তো? হিরোশিমা বা নাগাসাকিতে কে আনবিক বোমা ব্যবহার করেছিল? বা হলোকাস্ট কাদের কাজ?

বাদ দিলাম যুদ্ধের কথা। পৃথিবীর পরিবেশগত এ দুরবস্থার কারন কি? নানা রকমের এই দূষণগুলো কোথা থেকে শুরু হয়েছিল? ক্যাপিটালিজম এর কারনেই তো আজকের গ্রীন-হাউজ ইফেক্ট। এই ক্যাপিটালিজমে কারা বিশ্বাসী? মুসলমানরা? কই না তো? আচ্ছা ব্রিটিশরা কি করেছিল শত শত বছর ধরে? শাসন আর শোষন এমনকি আমাদের এই প্রান্তেও! ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কথা কি কারো মনে নেই নাকি?

তাহলে মুসলমানদের ওপর চড়াও কেন বিশ্বের একটি বিশাল অংশ। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড কেন? খেয়াল করে দেখুন – প্যালেস্টাইনের উপর কি মারাত্মক বর্বরতা চলে আসছে আজ কত বছর ধরে। কই? ইসরায়েলিদের তো সন্ত্রাসী নাম দেয়ার চেস্টা হচ্ছে না। বরং তাদের সাপোর্ট করার জন্য উল্টো নানা বিশ্ব কনফারেন্সে চাপ প্রয়োগ করা হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোর উপর।

টুইন টাওয়ার হামলার পর কি জানি হয়ে গেল পুরো দুনিয়াতে। টুইন টাওয়ারে মারা গিয়েছিল হাজার খানেক মানুষ। আর টুইন টাওয়ারের হামলার পর পর যেসব যুদ্ধ হয়েছে, তাতে মারা গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু সেই সুবাদে শত শত তেলের খনির মালিকানা চলে যায় যুদ্দবাজদের কাছে। পশ্চিমা দেশগুলো মোটামুটি ভাগাভাগি করেই সেই বিশাল সম্পদের ভাগ-বন্টন করেছিল এবং এখনও করে যাচ্ছে। অস্ত্রের বাজারও বেশ চাঙ্গা। যুদ্ধ অনেক জনপদের উপর নির্মমতা টেনে আনলেও কিছু দেশের জন্য আশির্বাদের মত বিশেষ করে অস্ত্রের বিক্রির উপর যাদের অর্থনীতি নির্ভর করে। আল-কায়েদা, আই এস এগুলো তো তাদেরই সৃষ্টি। কিন্তু সেটা তারা সরাসরি শিকার করে না। জোর জার মুল্লুক তার – এখনকার পৃথিবীতে এটাই হচ্ছে। আর মুসলমানরা এখানে হয়ে গেছে একটা বিজনেস মডেলের অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থ-প্রাচুর্যের অভাব নেই কিন্তু সেখানকার মুসলমানরা তেমন একটা শিক্ষিত হয় না। অনেক আগে মুসলমানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পারদর্শী হলেও এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের শেখরা শুধু সম্পদের খরচে ব্যস্ত। প্রচুর অর্থ প্রাচুর্যে থাকার কারনে তারা কোনদিনও নিজেদের আরাম আয়েস ছাড়া অন্যকিছুতে মনযোগ দিতে পারে নি। রাজনীতি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, কন্সপিরেসি এসবের থোড়াই কেয়ার করে। আর এসবের সুযোগগুলো বুদ্ধিমান দেশগুলো বেশ ভালভাবেই কাজে লাগিয়েছে।

আপনি জানেন, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের উপমহাদেশের কেউ কোন কাজে গেলে বা জীবিকা নির্বাহ করতে গেলে তাদের কি বলে সম্বোধন করে? “মিসকিন” বলে। কতটা অপদার্থ হলে তারা এসব করতে পারে বা বলতে পারে? কতটা অশিক্ষিত হলে তারা এগুলো করতে পারে? গরীবদের তারা ঠিক মানুষ মনে করে না, মনে করে মিসকিন। যাদের চিন্তাভাবনা এমন, তাদের আর কি বা বুদ্ধি থাকতে পারে? বাংলাদেশী শ্রমিকরা কিন্তু কম অত্যাচারিত হয় না মধ্যপ্রাচ্যে। রেসিজম কি সেটা সেখানে গেলেই ভালই টের পাওয়া যায়। তবে হাতে যদি আমেরিকা বা অস্ট্রেলীয়ার পাসপোর্ট থাকে, তবে এসব আরবী শেখরাই আপনাকে খাতির করতে করতে মুখ দিয়ে ফেনা বের করে ফেলবে।

নানা দেশের মুসলমানদের মধ্যে আসলে কোন ইউনিটি নেই তেমন। যেমনটা আছে অন্যান্য দেশের অন্যান ধর্মালম্বীদের মাঝে। আমরা আমাদেরকেই মারতে ব্যস্ত থাকি। আর আমাদের অজ্ঞতার কারনেই দুষ্ট পক্ষ সৃষ্টি করে আইএস, আল-কায়েদা বা আরও নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আর এরা মূলত মুসলমানদেরই আগে মারে। হয় নামে না হয় প্রানে। ইউনিটির বদলে আজ মুসলমানদের মাঝে হাজারো বিভেদ। আর এই বিভেদ দিন দিন মুসলমানদের দুর্বল আর কোনঠাসা করে দিচ্ছে। যত ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে এতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি মুসলমানদেরই হচ্ছে – জানে এবং মালে। নতুন করে তৈরী হচ্ছে বিভেদ। নতুন করে তৈরী হচ্ছে দেয়াল। এককালের প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র আজ একজন আরেকজনের শত্রু। এসবের আচ এসে লাগছে এখন আমাদের দেশেও। কারন বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। আঁচ তো লাগবেই। এখানেও গড়ে উঠছে এসব সন্ত্রাসীদের আস্তানা। কিন্তু এরা তো আসলে ক্ষমতাধর দেশগুলোর এজেন্ট ছাড়া কিছুই না।

আমরা মুসলমানরা এক কালে শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি – সবকিছুতে এগিয়ে থাকলেও আজকের চিত্র দেখুন। কোথায় পড়ে আছি আমরা। নিজেদের মাঝে যুদ্ধ করতে করতেই আমরা হয়রান। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা আর কি করব। আর এই সুযোগের সদব্যহার করছে অন্যরা – যে যেভাবে পারে। কেউ যুদ্ধ লাগিয়ে আবার কেউ বন্ধু হয়ে। এখন যদি কোন দেশ খ্রিস্টান বা অন্য কোন ধর্মের মানুষজনকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়, তাহলে দেখবেন পুরো পৃথিবী থেকে প্রতিবাদ হবে – ইন্টেলেকচুয়াল পদ্ধতিতে। হাতাহাতি করে না বা গালি দিয়ে না। নিজেদের প্রেস্টিজ তারা কোনদিন নামতে দিবে না। কিন্তু যখন আমাদের দেয়া হয়, তখন আমরা কেউ কেয়ার করি, বাকীরা পাত্তাই দেই না। কারন আমাদের মাঝে এখন হয়ে গেছে হাজারো ভাগ।

ধর্ম মানুষের জন্য। মানুষ ধর্মের জন্য না। পৃথিবীতে সব ধর্মের স্থান আছে আর সব ধর্মের মানুষের বেচে থাকার অধিকার আছে। সম্পর্ক হতে হবে মানুষে মানুষে। ধর্মে ধর্মে না। কিন্তু আজ ধর্মটাই অনেকের কাছে বিশাল একটা ব্যবসা হয়ে গেছে। একজন মুসলমানকে সন্ত্রাসী বলে সম্বোধন করা এখন শুধু রেসিজম না, এটা একটা বিজনেস মডেল! ঠিক একই রকমভাবে একজন হিন্দু ব্যক্তিকে কিছু বলা বা আক্রমন করাও কোন ধর্মযুদ্ধ না – একটা ব্যবসায়িক উদ্যোগ মাত্র।

দুঃখ একটাই, অন্য সবাই ভাল ব্যবসায়ী হলে গেলেও, আমরা মুসলমানরা ভাল ব্যবসায়ী হতে পারি নি। কারন আমরা নিজেদেরই আগে বিক্রি করতে উঠে পড়ে লেগে থাকি। এমনই চলতে থাকবে আরো শত বছর যদি না পরিবর্তনটা আমাদের ভেতর থেকে না হয়। কিন্তু সেটা আর কোথায় হলো!

 

আপনার মন্তব্য