“আইএসআইএল” কাহিনী ও এর নেপথ্য নায়ক।

667
SHARE

পাশ্চাত্যের গোপন ও প্রকাশ্য-মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী দল ‘আইএসআইএ’   এর উত্থান কোনো কল্পকাহিনী নয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার সময় সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করে ‘আইএসআই’  অর্থাৎ ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক। পরে নাম পরিবর্তন করে হয় আইএসআইএল। আরেক সন্ত্রাসী দল আল-কায়দার পর তাদেরই উত্তরসূরি হিসেবে নতুন সংস্করণে এসেছে আইএসআইএল পুরো অর্থ ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড লিভান্ট। ‘আইএসআইএল মূলত একটি ওয়াহাবি-সালাফি পন্থি জঙ্গি সংগঠন যা  গ্রুপটির নাম থেকেই বোঝা যায় আর তারা উগ্র/কথিত সালাফি ইসলামের ভিত্তিতে ইরাক ও আশশাম তথা লেবানন, ফিলিস্তিনসহ প্রাচীন সিরিয়ায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদিও তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে উদ্দেশ্য সাংঘর্ষিক।

২০০৬ সালের শেষের দিকে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ‘আইএসআই’- আনুষ্ঠানিকভাবে আবু ওমর আল বাগদাদিকে তাদের নেতা বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল আবু ওমর নিহত হলে গ্রুপটির নতুন প্রধান হয় আবুবকর আল বাগদাদি যার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে গ্রুপটি ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। তখন  ‘নতুন বিন লাদেন’ নামে খ্যাত বাগদাদিকে ধরিয়ে দিতে তৎকালীন মার্কিন সরকার দশ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। মূলত বাগদাদির আসল নাম ছিল আবু দায়া। যদিও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে অন্যরকম চিত্র, তাদের পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা…! শোনা যাচ্ছে বাগদাদির পূর্বের ইহুদী নাম। নাম যাই হউক এই বাগদাদি অর্থাৎ আবু দায়া ইরাকি নাগরিকদের অপহরণের পর তাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া এবং একগাদা অভিযোগ দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ফাঁসি দিয়ে দিত। ভাবুনতো কি নির্মম ও নিষ্ঠুর মনের অধিকারী ছিলেন তিনি।

২০০৫ সালে তাকে হত্যা ও অপহরণসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগে গ্রেফতার করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকের উম্মে কাসর শহরের একটি মার্কিন কারাগারে বন্দি রাখা হলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন সেখানে তাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অন্যথা তার বিরুদ্ধে এত হত্যা অভিযোগের পরও কেন মুক্তি দেয়া হল? শুধু তাই নয় সাথে মুক্তি দেয়া হয় হাজার হাজার চরমপন্থি বন্দীকে কাসরের ‘বুকা’ কারাগার থেকে।

বাগদাদি ২০১১ সালে বাগদাদের একটি মসজিদ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এ ছাড়াও সে ইরাকের সুন্নিদের প্রতিনিধি বা নেতা হিসেবে খ্যাত খালেদ আল ফাহদাওয়িকেও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়। ইরাকের কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দক্ষ বাগদাদি গোপনে বিচরণ করে, তার কর্মী ও ভক্তরদের মধ্যে খুব কমই তার সাক্ষাৎ পেয়েছে। সে প্রায় সব সময়ই তার মুখ ঢেকে চলেন যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। ২০০৩ সালের আগেও সে আল-কায়দার সদস্য ছিল বলে ধারনা করা হয় আর আল-কায়দার অন্য যে কোনো নেতার চেয়ে এই আবুবকর বাগদাদি অনেক বেশি উগ্র চিন্তাধারায় বিশ্বাসী বলে জানা যায়।

সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে পাশ্চাত্য, ইসরাইল এবং তাদের আঞ্চলিক সরকারগুলোর মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীদের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হলে ‘আইএসআই’ও বিদ্রোহীদের পক্ষে এ যুদ্ধে অংশ নেয়।

অপরদিকে ২০১১ সালে সিরিয়ায় গঠিত আন নুসরা ফ্রন্টও ‘আইএসআইএল’-এর একটি শাখা হিসেবে দেশটির সরকারি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে আবু বকর আল বাগদাদি এক অডিও বার্তায় জানিয়ে দেয় যে ‘জিবহাতুন নুসরা’ বা ‘আন নুসরা ফ্রন্ট’  ‘আইএসআই’-এর অর্থ ও সহায়তা নিয়েই গঠিত হয়েছে এবং এই দুই গ্রুপ একত্রিত হয়ে ‘আইএসআইএল’ নাম ধারণ করেছে।

কিন্তু এই দুই গ্রুপের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতা ও অর্থ নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব। লাগামহীন এই দুই গ্রুপের সদস্যরা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন উভয় গ্রুপের কাছে শ্রদ্ধেয় আল-কায়দার নেতা আইমান আল জাওয়াহেরি এতে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সিরিয়ার জন্য আন নুসরা ফ্রন্টকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং আন নুসরার নেতার অনুগত থাকতে বাগদাদিকে নির্দেশ দেন। আপাত দৃষ্টিতে মোটামোটি তাদের এই ক্ষমতার দ্বন্ধ নিরসন হলেও তাদের অর্থের উৎস মধ্য প্রাচ্যের তেলের খনির নিয়ন্ত্রন নিতে এখনও পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত। বর্তমানে তাদের মধ্যে এই অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ইউনিট গুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা কেন্দ্রীয় নেতারা। এদিকে রাশিয়ার উপর্যুপরি বিমান আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়া আইএসআইএল আর্থিক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তাদের যোদ্ধাদের মাসিক বেতন অনেক কমিয়ে আনার। সর্বোপরি দিশেহারা আইএসআইএল ইসলামের ধুয়া তুলে বিচ্ছিন্নভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় শান্তিপ্রিয় নিরিহ মানুষজনের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণে মননিবেশ করেছে। কি লাভ? কিছু সাধারণের জীবন নেয়া ছাড়া আদৌ কি ইসলামের আকিদা রক্ষা পাবে? ইসলামতো তা বলেনা।

‘আইএসআইএল’-কে আমেরিকা ও ইসরাইল ছাড়াও গোপনে অর্থ, অস্ত্র, রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি সরকার। এর পেছনে ব্যাক্তিক বা মুষ্টিমেয় স্বার্থ জড়িত থাকলেও অশান্ত হয়ে পড়ছে গোটা বিশ্ব। এখনো চুপচাপ ও শান্ত থাকা অপরাপর সুপার পাওয়ার সমৃদ্ধ দেশগুলি যদি এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয় তখন যেন আবার বলে না বসি ইসলামের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ।

বিশ্বের এই ধরাধামে শান্তিতে বাঁচুক সবাই… এইতো কামনা।

আপনার মন্তব্য