নিজেই নিজেকে মমিতে পরিণত করে ! ! ! !

30
SHARE

বৌদ্ধ ধর্মের সামগ্রিক শিক্ষা ও লক্ষ্য নির্বাণ প্রাপ্তিকে ঘিরে । এই মতানুসারে,  চূড়ান্ত নির্বাণ প্রাপ্তি ছাড়া সত্ত্বা জীবন চক্রে আবর্তিত হতে থাকে । আর এই চূড়ান্ত নির্বাণ প্রাপ্তির জন্য  আপন সত্ত্বাকে বস্তু জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়া জরুরী । ধর্মীয় বিশ্বাসের এমনই এক গভীর উপলব্ধী থেকে বহু বছর আগে জাপানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীগণের মাঝে নিজেকে নিজে মমিতে পরিণত করার রেওয়াজ বা প্রথা শুরু হয় । যা ১৮শ শতকের শেষের  দিকেও প্রচলিত ছিল ! ১৯শতকের শুরুর দিকে এই প্রথাকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনায় এনে আইন করে 4বন্ধ করা হয় ।

সাধারণ দৃষ্টি ভঙ্গিতে এটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে এক গভীর বিশ্বাস ও উপলব্ধি ! এটি সহজ বোধ্য নয় ! কারণ, একজন সাধারণ আত্মহননকারী ক্ষণিকের উত্তেজনায় হঠাৎ করে নিজের প্রাণ কেড়ে নেয় ! যা একটি আকস্মিক উত্তেজনার ফল ! এতে বিবেচনা বোধকে কাজে লাগানোর সুযোগ  থাকেনা বললেই চলে, কারণ এটি তাৎক্ষণিক ভাবে ঘটে যায়  ! কিন্তু যদি সেই  প্রস্তুতি হয় ধীর ও সময় সাপেক্ষ ?! কয়েক বছর ধরে যদি এর প্রস্তুতি নেয়া হয় ?! তাহলে কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন করার, নিজের বিবেচনা বোধকে কাজে লাগানোর ও বিচার বিশ্লেষণ করার অনেক সুযোগ থাকে ! কিন্তু তারপরও যদি আত্মহননকারী সে পথ থেকে ফিরে না আসেন ????  তারমানে সাধারণের বোধের উর্দ্ধে কোন এক গভীর উপলব্ধি তার মাঝে ক্রিয়াশীল !

হয়ত আমাদের মাঝে সেই উপলব্ধি ক্রিয়াশীল নয় বলে আমরা তা বুঝতে পারব না ! কিন্তু কেমন করে জাপানের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীগণ দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রস্তুত করতেন মমিতে পরিণত হবার জন্য , সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ! চলুন জেনে নেইঃ

এই প্রক্রিয়ায় একজন সন্ন্যাসী ২০০০ দিন অর্থাৎ প্রায়  সাড়ে ৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করতেন !!!

শুরুতেই তাঁরা নিজেদের শরীর থেকে সমস্ত চর্বি ঝরিয়ে ফেলতেন ! আর এর জন্য তাঁরা প্রথম ১০০০ দিন শুধুমাত্র বাদাম ও নানান রকম বীজ খেয়ে থাকতেন ! এছাড়া আর অন্য কোন রকম খাবার এ সময় তাঁরা গ্রহণ করতেন না !

এরপর তাঁরা শরীরকে যত বেশি সম্ভব  পানি শূন্য করে তুলতেন ! এর জন্যও তাঁরা ১০০০ দিন সময় নিতেন । এ সময় তাঁরা খুব সামান্য পরিমাণে পাইন গাছের বাকল ও শিকড়  ছাড়া অন্য কিছু খেতেন না ! এই সামান্য বাকল ও শিকড়ই তাঁদের খাবার ও পানীয় চাহিদা পূরণ করত এবং ধীরে ধীরে শরীরকে পানিশূন্য করে তুলত !

urushi-tree-2

এরপর তাঁরা উরোশী গাছের রস থেকে তৈরি এক ধরনের চা পান করতেন; যা অত্যন্ত বিষাক্ত । এটি পান করার ফলে যদি ভীষণ ডায়রিয়া ও বমি শুরু হত তাহলে তাঁরা বুঝতেন যে কাজ হচ্ছে !!! এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কারণ এর ফলে শুধু যে , শরীর থেকে বার্তি রস বেরিয়ে যায়, তাই নয় ; বরং, এই উরোশী গাছের রস অত্যন্ত বিষাক্ত বলে এটি পরে শরীরকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করে !

এরপর তাঁরা একটি ছোট্ট কক্ষে প্রবেশ করতেন । চারপাশে পাথর দ্বারা ঘেরা ছোট্ট সে কক্ষে শুধু তাঁদের পদ্মাসনে বসার মত জায়গা থাকত ! বের হবার পথ বাহির থেকে বন্ধ থাকত ! আর সরু একটি নল বাহির থেকে কক্ষে ঢুকিয়ে দেয়া হত বাতাস সরবরাহ করার জন্য ! সেখানে তাঁরা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতেন ! এসময় তাঁদের হাতে থাকত একটা ছোট্ট ঘণ্টা ! মাঝে মাঝে সেটা বাজিয়ে তাঁরা বোঝাতেন তাঁরা এখনও বেঁচে আছেন ! যখন আর ঘণ্টার শব্দ শোণা যেতনা  সবাই ধরে নিত তাঁরা নিজেদের সফলভাবে মমিতে পরিণত করেছেন !!! তখন বাতাসের নলটি সরিয়ে নেয়া হত ও  এভাবে আরও ৩ দিন অপেক্ষা করা হত ! তারপর বের করে আনা হত তাঁদের সফলভাবে মমিকৃত দেহ !!!

এভাবে অনেকেই যেমন  নিজেকে সফলভাবে  মমিতে পরিণত করেছে , তেমনি অনেকে আবার ব্যার্থও হয়েছেন , বরং ব্যার্থতার হার ই  বেশী !

mummy-002

ভাবছি, আগেকার দিনে মানুষ সত্যকে জানতে বুঝতে কতই না ত্যাগ স্বীকার করতেন। কত গভীর ছিল তাঁদের চিন্তা ভাবনার প্রক্রিয়া, বিশ্লেষণ ক্ষমতা !!! অথচ, আজকের দিনে আমরা অটি সামান্যতেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যাই ! পুরোটা না শুনেই বা না পড়েই উত্তেজিত হয়ে যাই ; মন্তব্য আর বিশ্লেষণের তুবড়ি ছোটাই ; কিংবা উপহাসে নেমে পড়ি !  আমাদের এই চঞ্চলতার অবসান হবে কবে …… কিভাবে ……আদৌকি হবে ?!?!?!

আপনার মন্তব্য