আন্দোলন কি নিয়ে? রামপাল নাকি সংবিধান?

25134
SHARE

সম্প্রতি facebook এ রামপালে  বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার প্রতিবাদে সংবিধানের ১ম ভাগের ৭(১) অনুচ্ছেদের রেফারেন্স টানা হচ্ছে ! যেমনঃ  আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে এই প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে আমি সুন্দরবনে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাইনা।

facebook এ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধীদের মাঝে এটি এখন বেশ জনপ্রিয় একটি স্ট্যাটাস ! তবে বাঙালী জীবনের আর দশটা রাজনৈতিক ও  সামাজিক সমস্যার মত সুন্দরবন রক্ষার ক্ষেত্রও মানুষ দ্বিধা বিভক্ত ! অনেকেই আন্দোলনকারীদের হেয় করার চেষ্টা করছে ! তাদের নিয়ে বিদ্রূপাত্মক লেখা লিখছে এবং  রামপালে  বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পক্ষে হাস্যকর যুক্তি তুলে ধরছে ! যেমন, অতি সম্প্রতি একটা লেখা পড়লাম। তার একটা আংশ হুবহু তুলে ধরলামঃ   হঠাৎ করে দেশের মানুষ সংবিধান বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে। ব্যাপারটা খুবই উৎসাহব্যাঞ্জক। আশাবাদী হওয়ার অনেক কারণ আছে। এসব কিউট জনতার হাত ধরে বিপ্লব আসবেই …
তার আগে বলে রাখি, এই কিউট বিপ্লবী জনতার ৯৯.৯৯ ভাগ কোনদিন বাংলাদেশের পকেট সংবিধান উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখছে কিনা সন্দেহ আছে।তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য আমার এই লেখা…
কিউট বিপ্লবী জনতা স্ট্যাটাস দিচ্ছে, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণই দেশের মালিক। তাই রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না, কিউট বিপ্লবী জনতা তাঁদের মালিকানা ফেরত চাচ্ছে।
তার আগে একটু দেখে যাক কি আছে বাংলাদেশের সংবিধানে।
১ টি প্রস্তাবনা, ৭ টি তফসিল, ১১ টি ভাগ, ১৫৩ টি অনুচ্ছেদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সংবিধান গঠিত। সেই ১৫৩ টি অনুচ্ছেদের একটি অনুচ্ছেদ ৭(১)-যেখানে বলা আছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”। এই অনুচ্ছেদ কে সামনে এনে কিউট বিপ্লবীরা বলতে চাচ্ছে তারা সব কিছুর মালিক। আসলে কথাটা ভুল!”

আগেই বলছি সংবিধানের মোট ভাগ আছে ১১ টা, এই ১১ ভাগে সর্বমোট অনুচ্ছেদ আছে ১৫৩ টা। ৭ অনুচ্ছেদ আছে সংবিধানের ১ম ভাগে, প্রথম ভাগ হচ্ছে প্রজাতন্ত্র নিয়ে, মানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, রাজধানী কোথায় হবে, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় প্রতীক, নাগরিকত্ব ইত্যাদি।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি আছে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে। অনুচ্ছেদ ৮ থেকে ২৫ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। এই ভাগের ১৩ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে দেশে মোট ৩ ধরনের মালিকানা থাকবে, (১)রাষ্ট্রীয় মালিকানা, (২)সমবায়ী মালিকানা, (৩)ব্যক্তিগত মালিকানা।
রামপাল হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, কোন ব্যক্তিগত মালিকানা না! আর রাষ্ট্রীয় সম্পদের অধিকার দেশের সকল মানুষ ভোগ করবে, তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সকলের। কিন্তু কিউট বিপ্লবী জনতা সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ না পড়েই মালিকানা দাবি করে বসে আছে। তাহলে সবাই দাবি করা শুরু করবে পুরো দেশের মালিকানা সবার! হানাহানি মারামারি শুরু হয়ে যাবে পুরো দেশ জুড়ে। “

এদিকে বসে নেই আন্দোলনকারী কিউট জনতারাও ! তারা এধরনের কিউট আর্টিকেলের কিউট রচয়িতাদের নতুন প্রজন্মের ( কিউট !) রাজাকার বলে সম্বোধন করতে শুরু করেছেন ! ৭১’এর রাজাকারদের চেয়ে এই রাজাকাররা আরো ভয়ংকর আরও নীচ এবং আরও বেশি সবার্থপর ও ধর্মান্ধ !

কারা সঠিক সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না ! কারণ, আমরা অন্ধ নই , বিবেকহীনও নই ! আমরা বুঝি – সবই বুঝি !!!

শুধু বুঝতে পারলাম না একটা জিনিস, কিউট আর্টিকেলের কিউট রচয়িতা তার কিউট আর্টিকেলে যে আশংকার কথা বলেছেনঃ ” তাহলে সবাই দাবি করা শুরু করবে পুরো দেশের মালিকানা সবার! হানাহানি মারামারি শুরু হয়ে যাবে পুরো দেশ জুড়ে। ” —  এই কথাটা  !! সবার মাঝে দেশের জন্য মালিকানাবোধ জাগ্রত হলে দেশের তো উন্নতি হবার কথা , কেউ আর বলবেনা , দেশ রসাতলে গেলে আমার কি  ?   এখানে মারামারি কেন হবে ?! বুঝতে পারলাম না এ ধরনের আমূলক আশংকা প্রকাশের জন্য কিউট আর্টিকেলের কিউট রচয়িতা তার বিবেচনা বোধের কোন কিউট পর্যায়কে ব্যাবহার করেছেন ?! আপনারা বুঝতে পারছেন কি ?

এবার আসা যাক কিউট আর্টিকেলের কিউট রচয়িতার সংবিধান জ্ঞানের প্রসঙ্গে ! তিনি লিখেছেন ,” বাংলাদেশের সংবিধানে ১ টি প্রস্তাবনা, ৭ টি তফসিল, ১১ টি ভাগ, ১৫৩ টি অনুচ্ছেদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সংবিধান গঠিত। সেই ১৫৩ টি অনুচ্ছেদের একটি অনুচ্ছেদ ৭(১)-যেখানে বলা আছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”। এই অনুচ্ছেদ কে সামনে এনে কিউট বিপ্লবীরা বলতে চাচ্ছে তারা সব কিছুর মালিক। আসলে কথাটা ভুল!”

আমাদের আপত্তি “আসলে কথাটা ভুল ! ” এই অংশটুকু  নিয়ে ! কথাটা কোন ভাবেই ভুল না ;  সঠিক; সঠিক না হলে সংবিধানে আসল কিভাবে ?!

তাহলে প্রশ্ন আসে ব্যাপারটা কি ?!  ব্যাপার হল “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ ” –  এটি মূলত সংবিধানের একটি প্রস্তাবনা । সংবিধানের ১ম ভাগের এই ৭(১)  অনুচ্ছেদের উপর ভিত্তি করে জনগণ যদি রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সরকারী সিদ্ধান্তের বিপক্ষে আদালতের স্মরণাপন্ন হয় তাহলে আদালত তা আমলে নিবে না ! কারণ, প্রস্তাবনা-র কোন আইনি গ্রহণযোগ্যতা নাই !

এক মাত্র সহায় ছিল পরিবেশ অধিদপ্তর ! তারাও ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে ! পরিবেশ অধি দপ্তরের যুক্তি , যে উন্নতমানের কয়লা ব্যাবহার করা হবে , উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যাবহার করা হবে , ভালোভাবে রক্ষনাবেক্ষণ করা হবে এবং ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনী ব্যাবহার করা হবে ! তাহলে আর কোন সমস্যা নেই !!!! যা এক কথায় অবান্তর !!!

আরেকটি সহায় হতে পারত আমাদের পরিবেশ আইন ! ভারতের পরিবেশ আইন তাদের বনাঞ্চল গুলোর ২৫ কিমি র মধ্যে কোন ধরনের শিল্পায়নকেই অনুমতি দেয় না ! তাই ভারতের বনাঞ্চল গুলোর ২৫ কিমি র মধ্যে কোন ধরনের শিল্পায়ন হয়নি ! বেঁচে গেছে তাদের বনাঞ্চল ! কিন্তু আমাদের পরিবেশ আইনে তেমন কোন কার্যকরী বিধি নিষেধ নেই যা এই মূহুর্তে সুন্দরবনকে রক্ষায় কাজে লাগতে পারে ! তাছাড়া আমাদের দূর্ণীতি তো রয়েছেই !!!

তাহলে উপায় ?!?!?!?

উপায় একটা আছে ! সেটা হল দেশের সবার্থে জনগণ যদি কোন সরকারী সিদ্ধান্তের বিপক্ষে আদালতের স্মরণাপন্ন হয় তাহলে আদালত আধিক্যসংখ্যক জনগণের মতামতকে আমলে নিয়ে সরকারী  সিদ্ধান্তকে বাতিল করতে পারে !!!!

তাহলে দেখা যাচ্ছে , সুন্দরবনের একমাত্র সহায় এখন এদেশের দেশপ্রেমী পরিবেশ সচেতন জনগণের একাত্বতা ! আইনি লড়াইয়ের এই একটি পথই কেবল খোলা আছে !!! তাই এই পথেও জনগণকে আস্তে না দেয়র জন্য চলছে কিউট আর্টিকেলের কিউট রচয়িতাদের সুপার কিউট চক্রান্ত !

তাই আসুন ” আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে এই প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে আমি সুন্দরবনে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাইনা। ” — এ স্লোগানকে সামনে রেখে সুন্দরবনকে রক্ষায় জনমত গোড়ে তুলি !

জয় বাংলা ! জয় বঙ্গবন্ধু !  

 

আপনার মন্তব্য