রামপাল নিয়ে আমাদের কান্ড

68148
SHARE

সুন্দরবনের রামপাল ইস্যু নিয়ে ইতিমধ্যে সবাই অবহিত আছেন। আচ্ছা, সত্যি করে বলেন তো রামপাল ইস্যু নিয়ে ঠিক কতটা জানেন? বাহ কথাটা এভাবে বলি – সুন্দরবন নিয়ে কে কতটা চিন্তিত একটু ভেবে দেখা যায় কি? নাকি “Go with Flow” টাইপের চিন্তাভাবনায় আছি আমরা? সুন্দরবন নিয়ে কি আমরা কোন দোটানায় আছি? হচ্ছে টা কি সুন্দরবনে? কেন আমাদের মাথা ঘামানো উচিত? আসলে কি আমরা মাথা ঘামাচ্ছি?

উপরের প্রশ্নগুলো করার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারন আছে। অনেকটা অভিমানের বশে এই প্রশ্নগুলো প্রথমে করার প্ল্যান থাকলেও আমাদের এই ছোট্ট কেইস স্টাডি এখন সেই প্রশ্নগুলোকে ঘিরেই। না, কাউকে কোন দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু কিছু ছোট পরিসংখ্যান, কিছু সংখ্যা সামনে নিয়ে আসতে চায়। যা একরকম রামপাল নিয়ে আমাদের চিন্তাধারাকে প্রতিফলিত করে, ছোট্ট পরিসরে হলেও। চলুন দেখা যাক কিছু পয়েন্ট।

  • রামপাল নিয়ে আলোচনা বা আন্দোলন শুরু হয়েছে বেশ অনেক দিন হয়ে গেল। দফায় দফায় আন্দোলন, দফায় দফায় আলোচনা। খুব ভাল কথা। কিন্তু গনমানুষের অংশগ্রহন কেমন ছিল? বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঠিক কত পার্সেন্ট মানুষ এই রামপালের ভয়াবহতা নিয়ে সবকিছু জানে?
  • অনলাইন বা ফেসবুক আন্দোলন কি আসলে কার্যকর হচ্ছে? মানুষ কি পার্টিসিপেট করছে যারা অনলাইনে আছেন? বা যারা অন্তত অনলাইনে বিচরন করেন, রামপাল নিয়ে ২/১ টা কথা দেখেছেন, তারাও কি আছেন?
  • শুধু গত ১ সপ্তাহের কথা ধরেন; কি হয়েছে রামপাল নিয়ে? আমরা – আপনারা কি করেছি? এমনকি অনলাইন এক্টিভিজমেও কি জড়িত হয়েছি সক্রিয়ভাবে?

গত ১০ দিন ধরে, আমরাও সুন্দরবনকে বাচানোর লক্ষ্যে অনলাইনে মাঠে নামি। আমাদের ক্ষমতা অনেক সীমিত তাই হয়তো বেশী কিছু করতে পারি না। তবে যাই হোক, আমাদের অনলাইন প্রেজেন্স একটু শক্ত হবার কারনে অনলাইনেই আমরা নামি। রামপাল নিয়ে কিছু কেস স্টাডি, কিছু পোস্ট আমরা পাবলিশ করি আমাদের সাইটে যা ইন্টার-লিঙ্কড করা ফেসবুক ভেরিফায়েড আর্টিকেল দিয়ে যেমনটা দেখছেন আপনারা এই মুহুর্তে আপনাদের স্মার্টোফোন থেকে। স্মার্টফোনে যেকোন ওয়েবসাইটের তুলনায় আমাদের সাইট ফেসবুক থেকে খুব দ্রুত খুলে এবং কোন ডাটা কাটেনা তেমন একটা। কথাটা বলার পেছনে একটা কারন আছে। এ সুবিধা গুলো থাকার কারনে, আমাদের সাইটে মানুষ প্রায় গিজ গিজ করে। যদিও আমরা কোন নিউজপেপার না, তাও ভিজিটরের কমতি নেই আমাদের। যেহেতু পাঠকের অভাব নেই, সেহেতু আমরা রামপাল নিয়ে কিছু কাজ করব চিন্তা করেই মাঠে নেমেছি। কিন্তু, কিছু পরিসংখ্যান আমাদের ধারনাকে একটু অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছে।

গত ১০ দিনে, আমাদের সাইটে অন্তত ১০ ধরনের আর্টিকেল, কেস-স্টাডি, জনসচেতনতা, আন্তর্জাতিক ইস্যু, সন্ত্রাসবাদ আর শিক্ষনীয় – সব ধরনের ক্যাটাগরীতে আর্টিকেল পোস্ট করা হয়েছে এবং নিয়মিত হচ্ছে। রামপাল নিয়েও একটা খুব ভাল কেইস স্টাডি আমরা করেছি এবং সেটা পাবলিশও করেছি। সেই সাথে ছিল আমাদের আইএস বিরোধী প্রচারনা, জঙ্গী আক্রমন থেকে নিরাপত্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টস নিয়েও ২/৩ টা আর্টিকেল আমরা দিয়েছি।

আমাদের আইএস বিরোধী আর্টিকেলগুলোতে দিনের যে সময়েই পাবলিশ করা হোক না কেম মানুষের অভাব থাকে না। গিজ গিজ করতে থাকে ভিজিটর। কারন মানুষ চিন্তিত আর হয়তো আমাদের পোস্টগুলো থেকে উনারা অনেক কিছু শিখছেন, জানছেন, হয়তো কোন হেল্পও হচ্ছে আমাদের আইএস বিরোধী প্রচারনায়। এমনকি, আমাদের সাধারন পোস্টগুলোতেও পাঠকরা আসছেন। ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের যতগুলো পোস্ট গত কিছুদিনে দেয়া হয়েছে, তার সবকটাই স্যোশাল নেটওয়ার্কে শেয়ার হয়েছে ২০ হাজার বারেরও উপরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, রামপাল নিয়ে আমাদের প্রচেস্টায় সেই তুলনায় তার ১০ ভাগের এক ভাগ মানুষও পার্টিসিপেট করেনি। এমনকি আলাদা করে গুরুত্ব দিয়েও কোন লাভ হয়নি। গতকাল সন্ধ্যাইয় আমরা এমনকি একটা অনলাইন সার্ভে পোস্ট করেছিলাম সবার মতামতের জন্য। এই কেই স্টাডি লেখা পর্যন্ত ভোটের সংখ্যা ৩০০ এর নিচে ছিল মোট। অথচ, পাঠকের সংখ্যা সারাদিন ব্যাপী হাজার খানেকের নীচে নামে নি। বিশ্বাস হয় না? নীচের স্ক্রিনশটগুলো দেখুনঃ

 

আর ভোট পড়েছে মাত্র ৩০০ এর মত। বুঝতেই পারছেন, আমরা বেশীরভাগ আসলে কি নিয়ে মেতে আছি! শুধু আমাদের নেটওয়ার্ক না, অন্যান্য সাইট, নেটওয়ার্ক সবকিছু পরখ করে দেখুন, দেখবেন, একটা ইফেক্টিভ অনলাইন আন্দোলনের ধারেকাছেও নেই। বাংলাদেশীজম প্রজেক্ট থেকে কিন্তু আমরা আগেও অনেক ধরনের আন্দোলন করেছিলাম, বেশ ইফেক্টিভ ছিল, যেমন পহেলা বৈশাখের সেই ঘটনায়, অথবা শিশু নির্যাতন নিয়ে আমাদের ক্যাম্পেইন বা আরো অনেক কিছু। এমনকি বর্তমানের এন্টি-আইএস ক্যাম্পেইনেও মানুষের অংশগ্রহন দেখার মত। কিন্তু, রামপালে কেউ নেই। সুন্দরবন বাচাতে আমরা শত চেষ্টা করেও মানুষকে টানতে পারছি না। টানলেও খুব বেশি না।

আমাদের ইনবক্স করে অনেকেই বলেছেন আমরা যেন কিছু করি বা অনেকেই অভিমান করে বলেছেন কেন আমরা কিছু করছি না! কিন্তু বাস্তবে, আমরা করছি ঠিকই, কিন্তু মানুষের তত মাথাব্যাথা নেই সুন্দরবন নিয়ে। তো আমরা একটা ব্যাপার ভালই বুঝতে পেরেছি। আর সেটা হলো, আমাদের গায়ের উপর কোন কিছু এসে না পড়লে আমরা বুঝিনা। আমরা প্রতিবাদও জানাই না। আইএস, ভূমিকম্প এসব আমাদের গায়ের উপর এসে পড়েছে তাই এগুলো নিয়ে আমরা মেতে আছি। কিন্তু সুন্দরবন – নাহ, গায়ের উপরে এখনও এসে পড়েনি। এর মানে হলো আমাদের সুদুরপ্রসারী চিন্তার মধ্যে সুন্দরবনের তেমন কোন স্থান পাচ্ছেনা। আমরা বুঝতে পারছিনা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে আসলে আমাদের কতটা ক্ষতি হবে। কারন, এটা আমাদের এখনও গায়ের উপরে এসে পড়েনি। কই সুন্দরবন কই আমরা – অনেকটা এমন চিন্তাভাবনা নিয়েই আছি। যে কারনে রামপাল নিয়ে মানুষের আওয়াজ তুলনামূলকভাবে কম। এটাই বাস্তবতা যা আমরা বুঝতে পেরেছি। অনেক চেষ্টা করেও আমরা মানুষকে বূঝাতে পারছিনা। ফেসবুকের “কোন মলমে যৌন ক্ষমতা বাড়বে” টাইপের পোস্টগুলোতেও হাজার খানেক শেয়ার থাকে, যেখানে রামপালের ইস্যুতে সবাই নীরব। আমরা বোকার রাজ্যে বাস করছি আসলে। ভবিষ্যতে খারাপ কিছু হবে এটা আমরা ভাবতে পারি না। সুন্দরবনের যদি কোন ক্ষতি হয় সেটার কি রকম প্রভাব পড়বে সেটা আমাদের বেশীরভাগেরই কল্পনায় আসছে না। এই পোস্ট কতজন পড়েছেন আমি জানিনা, কিন্তু যতজন পড়েছেন তাদের মধ্যে কতজন চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে পারবেন সুন্দরবনের ক্ষতিটা কি রকম হতে পারে?

মানুষই যদি ঠিকভাবে পার্টিসিপেট না করে, কিভাবে আর আন্দোলন করে সুন্দরবন ঠেকানো যাবে? আমরা যদিও হাল ছাড়ব না। মানুষ পার্টিসিপেট করছেনা একটা কারনে, কারন তারা এখনও জানেনা আসলে কি হতে পারে সুন্দরবনের ভাগ্যে। আর এই হালকা আন্দোলন সরকার কিভাবে আমলে নিবে? এর চাইতে বড় বড় আন্দোলন নাকের নীচ দিয়ে চলে গেছে। জানিনা আপনাদের মতামত কি, কিন্তু এই মুহুর্তে আমাদের সংখ্যাগুলো এসবই বলছে। বাকীটা আপনারা জানেন। তবে আমরা হাল ছাড়ছি না।

আপনার মন্তব্য