গুলশান হামলা – এক জটিল রহস্য !

25466
SHARE

গুলশান হামলার ঠিক ১ মাস  হয়ে গেল। এ নারকীয় হামলা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং এখন পর্যন্ত তার প্রভাব সবার মধ্যে বিরাজমান। ভয়, ক্ষোভ আর সামনে কি হবে – এসব নিয়ে নানা মত, নানা প্রশ্ন। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন – এই গুলশান ট্রাজেডীর কিছু রহস্য। যে রহস্য গুলো এখন পর্যন্ত উদঘাটিত হয়নি অথবা উদঘাটন করা হলেও অন্তত সাধারন মানুষ বা মিডিয়াতে আসেনি। অদ্ভুত এক রহস্যের বেড়াজালে চলে গেছে গুলশান হত্যাকান্ড। বেশ অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুজছে দেশবাসী। পুরো দেশবাসী কিন্তু এই ঘটনা ট্র্যাক করে আসছে প্রথমদিন থেকে আর দিন যত যাচ্ছে রহস্যগুলো আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

প্রথম রহস্য – সেই হাসনাত। গুলশান হামলা থেকে অদ্ভুতভাবে রক্ষা পাওয়া নর্থসাউথের এককালীন লেকচারার হাসনাত এবং তার পুরো পরিবার পুরো পরিবার এখন বিশাল এক রহস্য। সে নিজেকে ভিক্টিম দাবী করলেও তার নানা ধরনের কার্যকলাপ নানা রকমের প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। হত্যাকান্ডের ১-২ দিনের মাথায় সবার ফেসবুক ফিডে গোপনে ধারন করা হামলার ভিডিওচিত্রে ফুটে উঠেছে কিছু প্রশ্ন। সন্ত্রাসীদের সাথে হাসনাতের সাবলীল মেলামেশা দেখে তাকে ভিক্টিম না বরং অপরাধীদের একজন বলেই মনে হচ্ছিল। তার ভাবঙ্গী আর চলন দেখে পুরো হামলার মাস্টারমাইন্ড মনে হচ্ছিল – অন্তত গোপন ভিডীও চিত্রে ফুটে উঠা কিছু ব্যাপারে। আর কোরিয়ান সেই ভদ্রলোকের করা মোবিয়াল ভিডিওগুলো কিন্তু কারও প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। কেউ জানতনা এধরনের কিছু ভিডিও আসতে পারে বা কেউ রেকর্ড করতে পারে। সন্ত্রাসীরা তো জানতই না।

যদি তার ভিডিও গুলো অনলাইনে না আসত তাহলে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল কিন্তু এখন আর না। বিশাল বড় বড় সব প্রশ্ন ঠেলে দিয়েছে সেই কোরিয়ান লোকের মোবাইল ভিডিওগুলো। হাসনাতকে হয়তো ছেড়েই দিতো! সেই ভিডিওগুলোতেই দেখা যায় আরও অনেক অসাঞ্জস্য অনেক কিছু। শুধুমাত্র হাসনাতকে ছেড়ে দেয়া না, তার পেছন পেছন আরও কে কে যেন বেরিয়ে গিয়েছিল যাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন ক্ল্যারিফিকেশন আসেনি। হয়তো তদন্তের সার্থে এগুলো লিক হচ্ছে কিন্তু মানুষের উদ্যেগ বাড়ারও যথেষ্ট কারন আছে। এই হাসনাতকে বহিস্কার করা হয়েছিল নর্থসাউথ থেকে কারন তার হিজযুব তাহরীর সাথে যোগাযোগ ছিল। এরপর তার ফেসবুকের প্রোফাইল ঘাটলেও বেশ কিছু ব্যাপার গোলমেলে ঠেকে। আচ্ছা তার ব্যাংক একাউন্ট কি চেক করা হয়েছে যেখানে বড় কোন লেনদেন হয়েছে সম্প্রতি? অথবা বিদেশের কোন ব্যাঙ্ক একাউন্ট বা বেনামে বিশাল অংকের কোন লেনদেন? সাধারনত এধরনের মাস্টারমাইন্ডদের যারা খুব স্কিল্ড, তাঁদের ব্রেইনওয়াশের চাইতে টাকা দিয়ে কেনা হয়। উল্লেখ্য, পুলিশের মতে হাসনাতই সন্ত্রাসীদের মোবাইলে ২ টি প্রোগ্রাম ইন্সটল করে দিয়েছিল হত্যাযজ্ঞের ছবি পাঠানোর জন্য। আর অদ্ভুত ব্যাপার তারা সাইট ইন্টেলিজেন্সের কাছেই পাঠিয়েছে। এই সাইট ইন্টেলিজেন্স কি তবে আইএস এর মিডিয়া উইং?

২য় রহস্য – তাহমিদ? তাহমিদ কোথায়? তাকেও যথাসম্ভব আটকে রাখা হয়েছে এবং সন্দেহের তালিকায় আছে। একটা ভিডিওচিত্রে দেখা যায় হাসনাত, তাহমিদ আর নির্বাস ছাদের উপরে হেটে হেটে যাচ্ছে যেখানে হাসনাত সিগারেট খাচ্ছিল আর হাসনাতকে ফলো করছিল তাহমিদ আর নির্বাস ঠিক যেমনটা শিষ্য গুরুকে অনুসরন করে। চিত্র দেখে মনে হয় না বন্দুকের জোরে হাটছে কেউ। আর এতবড় একটা ট্র্যাজিক সময়ে ঠিক কিভাবে সন্ত্রাসীরা হাসনাতকে সিগারেট খাওয়ার জন্য এলাও করল সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু তাহমিদের সংশ্লিষ্টতা কি? নানা জায়গায় তাহমিদকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনেক আকুতি আসলেও তাহমিদের কি কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা আছে এই হামলায়? মারা যাওয়া সন্ত্রাসীদের যে ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড বা ফ্যামিলি ইনফরমেশন পাওয়া যায়, তাহমিদেরও তো একই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড। এদের সবার ভেতরে কানেকশনটা কি?

৩য় রহস্য – স্টেটমেন্টের অমিল। ভেতরে আসলে কি ঘটনা ঘটেছিল এ ব্যাপারে কারো সাথে কারোর স্টেটমেন্টের কোন মিল নেই। এই ব্যাপারে একটা জগাখিচুরী অবস্থা। তদন্তের সার্থে হয়তো অনেক কিছু গোপন রাখা হচ্ছে তবে প্রশাসনের তরফ থেকে যেসব বিবৃতি আসছে সেগুলোর কিছু কিছু হয়তো অসাঞ্জস্যপূর্ন। গুলশান ট্রাজেডীর সাথে সম্ভবত্ বড় কোন কিছুর লিঙ্ক আছে যা প্রশাসন এই মুহুর্তে প্রকাশ করছে আর প্রকাশ করাও উচিত হবে না।

৪র্থ রহস্য – নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি। এই হামলায় এবং আরো অনেক ব্যাপারে নর্থসাউথের ছাত্রছাত্রীদের যে লিঙ্ক পাওয়া গেছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে আইএস এর রিক্রুটিং এর জন্য নর্থসাউথ বেশ বড় একটা স্থান। কিছুদিন আগে নর্থসাউথের প্রোভিসিকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের সবার মধ্যে লিঙ্কটা কোথায় আর ঠিক কোথা থেকে সব নির্দেশ আসছে?

কিন্তু পাবলিল ক্লারিফিকেশনেরও দরকার আছে কারন প্রশাসনের উপর মানুষের আস্থাটাও জরুরী। মানুষ এখন প্রশাসনের উপর আস্তা রাখতে চাইছে। এটাই বুঝতে চাইছে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে পারবে কিন আমাদের প্রশাসন। মানুষকে একটু স্বস্তি দেয়াটারও প্রয়োজন আছে। কেননা, সাধারন মানুষের কিন্তু নিরাপত্তা প্রটোকল থাকে না। সরকারের উপর নির্ভর করে আর তাই কিছু কিছু ক্ল্যারিফিকেশন মানুষকে একটু হলেও স্বস্তি দিবে।

আমাদের এই বাংলাদেশকে বাঁচানোর সময় এসেছে। বাংলাদেশকে এবার প্রটেক্ট করতে হবে সব ধরনের ষড়যন্ত্র আর র‍্যাডিকালিজম থেকে। যেকোন মূল্যে। হাত গুটিয়ে আমরা সাধারণ মানুষরা বসে থাকলে হবেনা। এলার্ট হবার সময় এসেছে। অভিযানে আমাদেরও নামতে হবে। আত্মশুদ্ধির অভিযান। সচেতন হবার অভিযান। শুধু নিজেকে না, আশেপাশের সবাইকে নিরাপদে রাখার অভিযানে নামতে হবে। বসে থাকার সময় এখন আর নেই। গতকাল গুলশানের রেস্তোরায় হয়েছে। কাল কোথায় কি হবে সেটা কিভাবে কে বলতে পারবে।

এবার কিছু একটা করতেই হবে। অনেক সহ্য করা হয়েছে সব। অনেক। ১৬ কোটি মানুষের চাইতে ১৬ জন বা ১৬০ জন সন্ত্রাসী কিছুই না। এবার এসব টেররিস্টকে দেখাতে হবে সাধারণ মানুষের কতটা ক্ষমতা।

বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় নিরাপত্তা টাস্কফোর্স হোক। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অব্জারভেশন সেন্টার করা হোক। বর্ডার কন্ট্রোল আর ভিসা কন্ট্রোল আরও জোরদার করা হোক। খুঁজে বের করা হোক সব নাঁটেরগুরুদের। এরা আমাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং গবেষকদের ডেকে সমস্যার গোঁড়া খুঁজে বের করা হোক। এরপর গোঁড়া সহ উপড়ে ফেলা হোক।

এসব টেররিস্ট গ্রুপ বাংলাদেশের না। বাইরে থেকে এদের পেট্রোনাইজ করা হয়। আর এই পেট্রোনাইজিং গুলো বাংলাদেশে বসেই কেউ না কেউ করে। ব্রেইন ওয়াশ সেন্টারগুলো খুঁজে বের করা হোক। এসব জঘন্য টেররিস্টগ্রুপের এজেন্টদের খুঁজে বের করা হোক।

একে অন্যের উপড়ে দোষ না চাপিয়ে কাজে লেগে পড়া উচিত এখনই। আর এখানে সাধারণ মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। কারণ মনে রাখবেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য কোন প্রটোকল থাকে না। সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য নিজেদের কাছেই বেশী থাকে আর কারও কাছে না।

আপনার মন্তব্য