ফেসবুকে অবক্ষয় !

4091
SHARE

ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আমাদের জীবনকে অনেকাংশে সহজ করে দিয়েছে। আবার বলা চলে, অনেকভাবে বদলেও দিয়েছে। এক সময় যা কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল, আজ ঠিক সেই ব্যাপারগুলো জীবনের প্রতিটি ঘন্টার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। প্রযুক্তির উতকর্ষতার শীর্ষে আছি আমরা এখন। বাংলাদেশও কিন্তু কোন অংশে পিছিয়ে নেই এই প্রযুক্তি যাত্রায়। এই মুহুর্তে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি বা তারও একটু বেশী এবং এ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে অনেকটা চক্রবৃদ্ধির হারে। আর এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বেশ বড় একটা অংশের বিচরন থাকে ফেসবুকে – পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্যোশাল নেটওয়ার্ক। পৃথিবীতে আর কোন সাইট বা স্যোশাল নেটওয়ার্ক এত বেশী পরিমান ইউজারকে কখনও এত বছর আটকে রাখতে পারে নি। এখন ফেসবুকে হয় না এমন কিছু নেই। নতুন বন্ধু হতে শুরু করে ব্যবসা – কি হয় না এই ফেসবুকে। ইতিবাচক অনেক কিছুই দিয়েছে ফেসবুক মানুষকে। কিন্ত, সেই সাথে ফেসবুক নিয়ে এসেছে কিছু অবক্ষয়।

কথাটা শুনে একটু ঘাবড়ে গেলেন? বা মনমত হলো না? কিন্তু কঠিন হলেও সত্য, এই ফেসবুক অন্তত বাংলাদেশে বেশ কিছু অবক্ষয় এনে দিয়েছে – বিশেষ করে তরুন সমাজের মধ্যে। এই ফেসবুক এখন হয়ে উঠছে অনেকের বিকৃত মানসিকতার প্র্যাক্টিক্যাল ক্ষেত্র। যেগুলো আগে কখনও বাস্তবে কেউ করতে পারত না, ঠিক সে কাজগুলোই ফেসবুক এখন সহজ করে দিয়েছে।

ফেসবুক এখন বিকৃত মানসিকতার গালিবাজদের সবচেয়ে বড় বিচরন ক্ষেত্র। ইংরেজী আমরা যাকে বলি Verbal Abuse। এরা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গালি দেয়ার স্বাধীনতা মনে করে। যেকোন ইস্যুতে যে কাউকে আক্রমন করে বসা খুব বাজে ধরনের ভাষা ব্যবহার করে – এটা তাদের নিত্যদিনের কাজ। এধরনের ব্যাপারগুলো হরহামেশাই দেখা যায় যেকোন ফেসবুক পেজে বা গ্রুপে। মনে হয় না এই ব্যাপারটা কেউ অস্বীকার করবে। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান যখন তার স্ত্রীর ছবি দিয়ে নিজের পেজে একটা আপলোড দেন, খেয়াল করে দেখবেন সেখানে কিছু মানুষের মন্তব্য। এতটাই বাজে যে পড়ার মত অবস্থা থাকে না। শুধু সাকিব না, বেশ কিছু ক্রিকেটারের পেজেই এসব দেখা গিয়েছে। অনেক সময় কিছু বাংলাদেশী একাউন্ট বিদেশী কোন সেল্ব্রিটির পেজে গিয়ে ইচ্ছামত কারন ছাড়া গালিগালাজ করে। এতে মূলত বাংলাদেশীদের মান-সম্মান গেলেও তারা তেমন একটা কেয়ার করে না। বিশ্রী রকমের ভাষার ব্যবহার যেন তারা মায়ের পেট থেকেই শিখে এসেছে – এতটাই পটু গালিবাজিতে।

কিছুদিন আগে একটা ফেসবুক পেজ দেখেছিলাম “ফেসবুক কুয়ারা ছেলে এ মেয়ে”। এই পেজে স্কুল কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের ছবি আপলোড করে কিছু আপত্তিজনক গল্প লিখে। বেশীরভাগ সময় মেয়েদের ব্ল্যাকমেইলিং করার জন্যই এগুলো করা হয়। মেয়েদের ছবি আপলোড করে তাদের নামে নানা ধরনের ভুয়া খবর রটানো হয়। চিন্তা করে দেখুন, যাদের নিয়ে এসব করছে তাদের কি অবস্থা! ইভ-টিজিং এর ডিজিটাল ভার্সন বা নারী নির্যাতনের ডিজিটাল ভার্সনও বলতে পারেন। এর আগে আমরা একবার তাদের কার্যকলাপ নিয়ে লিখেছিলাম, কিছুদিনের জন্য সেই পেজটা বন্ধ ছিল, এখন আবার চালু হয়েছে এবং তাদের রেগুলার ডিজিটাল নারী নির্যাতন কিন্তু চলছেই। এনিয়ে কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোন মাথা-ব্যাথা নেই। কিন্তু এভাবে তারা অনেক মেয়ের সর্বনাশ করছে। শুনেছি কিছু কমবয়সী ছেলেরা মিলে এই পেজটা চালায়। এগুলো অবক্ষয় নয় তো কি? নিশ্চয় তাদের পরিবার থেকে সেধরনের শিক্ষা দেয়া হয়েছে তা না হলে তো এসব করত না। তো, বাংলাদেশে ফেসবুক এধরনের অবক্ষয় দিয়েছে।

আরেকটা অবক্ষয় হলো – বিজনেস ডিফেইমেশন। কিছুদিন আগে আমরা কটা ফেসবুক ফুড গ্রুপের কথা বলেছিলাম। তারা নানা ধরনের ফুড গ্রুপ খুলে বসে কিছু মেম্বার জোগাড় করে এরপর রেস্টুরেন্টগুলোকে ব্ল্যাকমেইল করত, সম্ভবত এখনও করে। অনেক আগে এরকমই একটা গ্রুপ আমরা বন্ধ করিয়েছিলাম। তবে সেই গ্রুপ্টা অনেক বড় ছিল। এগুলো যারা চালায় তারা হয়তো বাস্তবে কোনদিন সরাসরি চাঁদাবাজি করার সাহস করেনি কিন্তু এখন ফেসবুকের মাধ্যমে করছে। জানে এগুলর তেমন কোন বিচার হবে না, তাই তাদেরও কোন ভয় নেই। নিজেদের পরিচয় গোপন করে তারা নানা ধরনের অপরাধ করেই চলেছে। তবে হ্যাঁ, সব গ্রুপ খারাপ না।

এরপর আসা যাক অনলাইনে হুমকি ধামকি। ফেসবুক তো এখন হুমকি পাঠানোর একটা জনপ্রিয় মাধ্যম। নামে-বেনামে প্রতিদিন কতজন যে আমাদেরও নানা হুমকি পাঠায়! আমাদের কথা বাদই দিই, ইউজাররাও সে কত হুমকি রিসিভ করে প্রতিদিন সেটা মাঝে মাঝে দেখা যায়। আর ফেসবুকে পরিচয় গোপন রাখা কোন ব্যাপার না, সুতারাং, হুমকি পাঠালে ভয় কম।

ফেসবুক দিয়ে দেশে নানা ধরনের অপরাধও সংগঠিত হচ্ছে। সন্ত্রাসী বাহিনীর রিক্রুটমেন্ট তো এখন ফেসবুকেই হয়। ইভটিং, ব্ল্যাকমেইলিং, জালিয়াতি – কি না হয় ফেসবুকে ! তবে এগুল বাদ দিলে, কিছু মানুষের বিকৃতি দেখানোর একটা আদর্শ স্থান হয়ে গেছে এই ফেসবুক। মাঝে মাঝে মনে হয়, আসলে বাংলাদেশের জন্য ফেসবুক আসেনি। এখানে ইউজ এর চাইতে এবিউজই অনেক বেশী হয় – যখন এসব অবক্ষয়গুলো বিশালাকারে চোখে পড়ে। অবক্ষয়গুলো দেখলে কখনো রেগে যাই তো আবার কখনও হতাশ হয়ে যাই। যেকোন জিনিষের খারাপ দিকটা কেন যে আমরা আগে টানি সেটা হয়তো ওপরওয়ালাই ভাল বলতে পারবেন। এই অবক্ষয়গুলো ঠেকাতে আদৌ কোন আইন আছে কি না জানিনা আর থাকলেও আমরা নিশ্চিত এর প্রয়োগ তেমন একটা নেই।

সরকার তো অনেক কিছু ঢেলে সাজাচ্ছে। হয়তো এধরনের অবক্ষয় গুলো রোধে কিছু একটা ভবিষ্যতে করবে। তানা হলে আমাদের ইন্টারনেট খুব দূষিত হয়ে যাবে কতিপয় মানুষের জন্য।

আপনার মন্তব্য