যখন নিজের দেশকে ছোট করা হয়

16221
SHARE

একটা বিদেশী এয়ারপোর্টের ট্রানজিটে বসে আছি। সময় ২০০৮ এর জুন মাস। ঢাকা থেকে রওনা দেয়ার পর ডুবাই এয়ারপোর্টে ট্রানজিট ৫ ঘন্টা। এরপর আবার ১২ ঘন্টার ফ্লাইট। এমিরেটসের লাউঞ্জে বসে অলস সময় পার করা ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। ইতিমধ্যে এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপিংও ঘুরা শেষ। সময় তাও শেষ হয় না। শেষমেষ তাই লাউঞ্জে। পাশে সোফায় বসা আরেক বিদেশী ভদ্রলোক ম্যাগাজিন পড়ছেন। সম্ভবত তিনিও অনেক বোর ফিল করছেন। আমি ল্যাপটপটা চার্জ করার জন্য খুজছি একটা ওয়ালপ্লাগ খুজছি। সেই ভদ্রলোক ইঙ্গিতে বললেন তার সোফার পাশেই ওয়ালপ্লাগটা আছে। আমি ল্যাপটপ চার্জ করতে দিলাম আর সেই সাথে আলাপ শুরু হলো সেই লোকের সাথে।

কথাবার্তায় বুঝলাম তিনি ব্রিটিশ। লন্ডনেই যাচ্ছেন। আমিও বললাম যে আমি হিথ্রো হয়ে লস এঞ্জেলেস যাব। একসময় হঠাত করেই জিজ্ঞেস করলেন “ইন্ডিয়ান”? মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। তবে মেজাজ লুকিয়ে বললাম “No Sir, I am Bangladeshi”. জবাবে তিনি বললেন “Bangladeshi? Its beside India right”? কথাটা সত্য কিন্তু তাও কেন জানি মেজাজ খারাপ হলো। অনিচ্ছা সত্তেও বললাম “Yes, India is our neighbour”. তারপর তিনি আবার বললেন “OK, you have so much flood there init? Lot of poor pople”? মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। দাতে দাঁত চেপে শুধু মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলাম। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। মেজাজ একেবারেই বিগড়ে গেছে ততক্ষনে। সেই ব্রিটিশ ভদ্রলোক যা বললেন তার কোন কথাই মিথ্যা না, কিন্তু কেন জানি অপমানে পুরো শরীর কাপছিল। দুই কান মনে হয় লালও হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশকে কেমন জানি ছোট করা হলো, কেমন জানি তাচ্ছিল্য করা হলো। গরীব দেশ বলে তার মুখে কেমন জানি বাকা হাসি ছিল। তার চোখে মুখে ব্যঙ্গ ছিল। আসলে ছিল কিনা আমি নিশ্চিত না, তবে সেই মুহুর্তে সব এমনই মনে হচ্ছিল। নিজের দেশকে নিয়ে এধরনের অনুভূতি নতুন না। আগেও কয়েকবার ফেস করেছিলাম। ভদ্রলোককে কোন জবাব দিতে ইচ্ছে করছিল না কিন্তু তাও কিছু না বলে থাকতে পারছিলাম না। তাই ফ্লাইটে উঠার আগে ভদ্রলোককে বলেছিলাম

“Our country wasn’t supposed to be poor in the first place if the British did not enter in our Region and played damaging politics. We had so many friends all the time but mostly they are just friends in name but not for real. Though I wasn’t born during 1971 War of Bangladesh, but I heard British were against Bangladeshi Freedom? But anyways, we are still a very proud nation and sooner or later, we will be significant in World Economy. Right now, we are just learning only”.

কথাগুলো ঠিক কেন বলেছিলাম সেটাও জানিনা। কিন্তু কিছু একটা বলাটা জরুরী ছিল।

এধরনের সিচ্যুয়েশন অনেক সময় হয় যখন বাংলাদেশকে অপমান করা হয় নানা ভাবে। কখনও কোন আলাপে, আবার কখনও মিডিয়াতে আবার কখনো সম্মেলনে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি, আমাদের নেতা-নেত্রীরা যখন বিদেশে বাংলাদেশকে রিপ্রজেন্ট করতে যান, তারা কতটা না এধরনের খোচার শিকার হয়। সবকিছু তো আর মিডিয়াতে আসে না তবে তাচ্ছিল্য যে থাকে সেটা আর বলতে। নিজের দেশকে কেউ ছোট করলে আসলেই অনেক ইগোতে লাগে। তবে সবসময় যে এসবের কারন শুধু তারাই, তাও না। নিজেদের ইম্রেশন নিজেরাই মাঝে মাঝে নষ্ট করি নানাভাবে।

যেমন অস্ট্রেলিয়ায় একন কমনওয়েলথ গেম হোস্ট করেছিল। সময়টা ঠিক মনে আসছে না কিন্তু বেশ অনেক বছর আগেই। আমি তখন General Electric এর স্ট্রাটেজী প্ল্যানার। বেশ বড়সড় একটা কলিগ সার্কেলও ছিল আমার যাদের সাথে সবস্ময় আড্ডা হতো বিশেষ করে উইকেন্ডে। তারা সবাই জানত আমি বাংলাদেশী। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের অনেক কিউরিসিটিও থাকত সবসময়। কারন পুরো স্ট্রাটেজী ডিপার্টমেন্ট থেকে আমিই একমাত্র ব্যাক্তি ছিলাম যে এই উপমহাদেশ থেকে। ব্রিসবেন শহরে থাকতার সেসময়। যাইহোক, সেসময় কাজে অকাজে আমি বাংলাদেশকে অনেক উপরে তুলার চেষ্টা করতাম। বাংলাদেশের দালালি করতাম আর কি। তখন এসব ফেসবুক বা টুইটার ছিল না। সামনাসামনি নিজের স্ট্যাটাস দিতে হতো। প্রায় বলতাম “বাংলাদেশকে সবাই গরীব বলে, আসলে গরীব না। প্রচুর সম্পদ আছে। আমরা এখন শুধু দেখছি কিভাবে এগুলোকে কাজে লাগানো যায়”। মুখে যাই আসত বলতাম “দ্যা বেস্ট”। স্বীকার করতে পারি, চাপাবাজি অনেক করতাম। কেন জানি ভাল লাগত। অনেকেই প্রায় সময় জিজ্ঞেস করত “তোমাদের দেশ থেকে এদেশে এসে অনেকেই পালিয়ে যায়, কেন?”। কথাটা সত্য, কিন্তু আমি কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বলতাম, “আসলে তাদের বোকা বানানো হয়। কারন বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনই হয় না”। যাই হোক, অনেকাংশে তারা আমার কথা কনভিন্সড ছিল “বাংলাদেশ একটা মহান দেশ” এই থিওরীতে। সত্যি কথা বলতে কি, তাদের ব্যবহারে সেটা প্রকাশও পেত। কিন্তু সেই সুখ বেশীদিন কপালে ছিল না। অঘটন একটা ঘটেই গেল। সেই বছরই কমনওয়েলথ গেমস হোস্ট করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সিডনীতে বাংলাদেশ দলও গিয়েছিল অংশগ্রহন করার জন্য। আর গিয়েই, ক্যাম্প থেকে পালিয়ে গেল বেশীরভাগ বাংলাদেশী। আর সেই পালিয়ে যাবার খবর দেখাচ্ছিল অফিসের বিশাল টিভিতে সবার সামনে, পুরো ডিপার্টমেন্ট যেখানে উপস্থিত। রিপোর্টার বার বার বাংলাদেশকে ছোট করে নানা কথা বলছিল। অনেক অপমান করছিল। যারা পাকিয়ে গিয়েছিল তাদের কয়েকজনকে হাতে নাতে ধরার ভিডিও ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দেখাচ্ছিল। আর ডিপার্টমেন্টের সবার চোখ বার বার আমার দিকে আসছিল। আমার নিজের গ্মাথাটা অনেক ভারী মনে হচ্ছিল সেসময়। কোন রকমেই আর উপরে উঠাতে পারছিলাম না। আমার অফিস রুমটা পুরোটাই কাচের দেয়ালের ছিল আর সবাই যাবার সময় শুধু আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আর আমি কম্পিউটারে কাজ করার ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখছিলাম। সেদিন আসলেই নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছিল।  কি বলব কিছু বুঝতে পারছিলাম না। কোনভাবেই না। মনে হচ্ছিল সেই অফিসে আর মাথা উচু করে থাকা যাবে না।  দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এর পরের কয়েকদিন এভাবেই কাটিয়ে দিলাম। অফিসে আসতাম আর যেতাম। সবাই একটু অবাক হয়েছিল। আরে, এত হাসিখুশী, আলাপপ্রিয় সেই আমি হঠাত চুপ হয়ে গেলাম কেন। এক সন্ধ্যায় তারা আমাকে জোর করে নিয়ে গেল অফিসের পাশের পাব-এ। সাধারনত অফিস শেষে এই পাবে বসেই আড্ডা দেয়া হয় আর এখানেই সবাই আসে। জোর করেই নিয়ে গেল। এমনকি আমার বসও এসেছিলেন যিনি আমাদের অফিস বিল্ডিং এ বসেন না। কিন্তু তিনিও এসেছিলেন সেদিন। সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করল “What’s your problem? You can tell us mate. We are your buddies!”. নানা প্রশ্নে নিজেকে একটু জর্জরিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু সে পরিস্থিতি থেকে আমাকে বাচিয়েছিলেন আমার সেই বসই। তার নাম Tracey। তিনি একরকম আমার মেন্টর ছিলেন ছাত্রবস্থা থেকেই। হঠার করেই তিনি বলে উঠলেন “দুনিয়া উলটে যাক, কিন্তু, নিজের দেশ নিয়ে গর্ব করা কোনদিন ভুলো না। কমনওয়েলথ গেমস এর ব্যাপার নিয়ে তোমার কস্ট তো? এসব কিছু না। এটা তোমার পুরো দেশের দোষ না। দু-একটা মানুষের। তুমি জান, অস্ট্রেলিয়া কিভাবে হয়েছিল? একসময় এ দেশে অপরাধীদের পাঠানো হতো নির্বাসনে। আর সেই অপরাধীরা মিলেই তৈরী করেছে আজকের অস্ট্রেলিয়া। তো কি হয়েছে? আমরা তো খারাপ না। আমাদের গর্ব কি কমে গেছে? একদিন দেখবে, এই পালিয়ে যাওয়া বোকা মানুষগুলোই নতুন ধরনের বাংলাদেশ গড়বে।”

সত্যি কথা বলতে, সেদিন ট্রেসীর কথাই সবকিছু ঠিক করে দিয়েছিল এবং একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছিলাম – দেশ কখনো কারো কথায় বা কারো কাজে বড় ছোট হয় না। নিজের মনে কি আছে সেটাই বড় কথা। যদি মন থেকে দেশের জন্য গর্ব থাকে, তাহলে সেটি সুফল বয়ে আনবেই। এরপর থেকে কোনদিন এধরনের উল্টো-পাল্টা অনুভূতি হয়নি। যাই হোক, দেশের জন্য গর্ব এক ফোটাও কমে নেই। বরং বেড়েছে। অপ্টিমিস্টিক চিন্তা করতে শিখেছিলাম তখনই। আর মাথার ভেতর চিন্তা ঘুরত, এই মেসেজগুলো কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পোছানো যায়, এই চিন্তা গুলো কিভাবে অন্য বাংলাদেশীর মাথায় ঢুকানো যায়? ধীরে ধীরে অনেক বছর পর আত্মপ্রকাশ করল “বাংলাদেশীজম প্রজেক্ট” -এর। প্রথমাবস্থায় কেউ চিনতই না। স্যোশাল নেটওয়ার্ক বলতে তেমন শক্ত কিছু ছিল না। আর বাংলাদেশে তো ইন্টারনেট পাওয়াই দুস্কর ছিল। কিন্তু যাই হোক, সেই চিন্তা থেকেই গড়ে উঠেছিল আজকের এই বাংলাদেশীজম – নাম হয়তো শুনেছেন আপনারা ? (:).

দেশ যদি আপনার মনে ভেতরে স্পেশাল কোন জায়গায় থাকে, সেই দেশই আপনাকে একদিন উপরে তুলে দিবে, অনেক উপরে। তাই দেশ নিয়ে কখনও মন খারাপ করবেন না। দেশকে অপমান করলে জবাব দিবেন সমস্বরে। দেশ কোন  মানুষের না। দেশ হয় আত্মার। ভাল থাকুন। আর হ্যাঁ, দেশের এই গর্ব নিয়ে একটা শর্টফিল্মও বানিয়েছিলাম অনেক বছর আগে। নীচের ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন যদি চান।

(চলবে)।

আপনার মন্তব্য