কেন এত বজ্রপাত? কেন এত মৃত্যু?

81
SHARE

বর্ষা শেষ হয়েছে আগেই। শরৎও যাই যাই করছে। কিন্তু থামছে না বৃষ্টির দাপট। আর বৃষ্টির সাথে সাথে দেশজুড়ে শোনা যাচ্ছে মেঘের গর্জন।আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে নেমে আসছে ভয়ঙ্কর বিদ্যুত তথা বজ্রের লেলিহান জিহ্বা।বজ্রপাতের প্রচন্ড শব্দ আর বিপুল শক্তির বিদ্যুত যেখানে পড়ছে, সেখানেই ডেকে আনছে বিপদ।পশু-পাখি তো মরছেই, সেই সাথে মরছে মানুষও। বিশেষ করে বজ্রপাতের শিকার হয়ে বেশি মরছে বাংলাদেশের কৃষককূল।  

প্রতিদিনই খবর আসছে বজ্রপাতে মানুষের নিহত হওয়ার। গত ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে ১৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন। এর আগের দিন সোমবার তিন জেলায় বজ্রপাতে সাতজনের মৃত্যু হয়।গত মে মাসে দুই দিনে বজ্রপাতে মারা গিয়েছিল ৫৭ জন। বজ্রপাতে প্রতিবছরই কম বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এবার যেন সেই সংখ্যা শুধু বাড়ছেই। তাই স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন ওঠছে, কেন এত বজ্রপাত? কেনই-বা এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে?

বজ্রপাতের বা ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে একক কোনো কারণ বলছেন না বিশেষজ্ঞরা তবে তাঁরা বলছেন, প্রকৃতিকে বৈরী করে তোলার পাশাপাশি মুঠোফোনের ব্যবহারসহ জীবনযাত্রার পরিবর্তন এর জন্য দায়ী

নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়া আর গাছ ধ্বংস হওয়ায় দেশে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে বিশেষ করে বর্ষা আসার আগের মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ছে এতে এই সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে

বেসরকারিভাবে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যার হিসাব রাখা হলেও সরকারিভাবে একে দুর্যোগ হিসেবেই স্বীকার করা হয় না ফলে কোনো হিসাবও নেই তবে সরকারি সংস্থা আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, মে মাসে নিয়মিতভাবে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে সংস্থাটির হিসাবে ১৯৮১ সালে মে মাসে গড়ে নয় দিন বজ্রপাত হতো ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে গড়ে বজ্রপাত হয়েছে এমন দিনের সংখ্যা বেড়ে ১২ দিনে দাঁড়িয়েছে আর হিসাবটা মৃত্যুর সংখ্যায় ধরা হলে ২০১০ সাল থেকে পর্যন্ত মারা গেছেন হাজার ৪৭৬ জন

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময় দেশের বেশির ভাগ গ্রাম এলাকায় বড় গাছ থাকত তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের বড় গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত ফলে মানুষের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা কমত ছাড়া দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে এখন মুঠোফোন থাকছে দেশের অধিকাংশ এলাকায় মুঠোফোন বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে দেশের কৃষিতেও যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে তা ছাড়া, সন্ধ্যার পরে মানুষের ঘরের বাইরে অবস্থান বাড়ছে আর বেশির ভাগ বজ্রপাতই হয় সন্ধ্যার দিকে আকাশে সৃষ্টি হওয়া বজ্র মাটিতে কোনো ধাতব বস্তু পেলে তার দিকে আকর্ষিত হচ্ছে

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে জানতে হবে

. বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছপালার কাছাকাছি থাকবেন না। কারণ ফাঁকা জায়গায় কোনো যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই গাছ থেকে কমপক্ষে মিটার দূরত্বে অবস্থান করতে হবে

. ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা, উঁচু জায়গায় কিংবা টিনশেডের বাড়িতে না থাকাই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোনো পাকা বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া যায়

. বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি থেকে বেরিয়ে পাকা কোনো বাড়ির ছাউনি কিংবা বারান্দায় অবস্থায় নেওয়া

. বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজসহ সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সুইচ বন্ধ রাখা। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন

. বজ্রপাত ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে আহত হন

. নদীতে নৌকায় অবস্থান করলেও পানি থেকে সরে আসতে হবে এবং নৌকার ছাউনিতে ঢুকে পড়তে হবে

বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তার আছে এসব জায়গায় যাবেন না বা কাছাকাছি থাকবেন না

আপনার মন্তব্য