অপ্রয়োজনীয় যৌনতায় মিডিয়ার অবক্ষয়

28
SHARE

ইদানিং নানা পদের খবর, গুঞ্জন, সুখবর আর কুখবরে আছন্ন হয়ে আছে পুরো বাংলাদেশের মিডিয়া। কারো আছে ট্যক অব দ্যা টাউন হবার তাড়া আবার কারো আছে শর্টকার্টে বড় কোন তারকা হয়ে যাওয়ার তাড়া। আর কেউ কেউ এই ফাকে কামিয়ে নিতে চায় কাড়ি কাড়ি টাকা। যারা সিনেমা বানান, সিনেমা বানানোর কারিগরদের নিয়ে একটা কথা প্রচলিত ছিল, মেলবোর্নে অনেক বন্ধুর কাছ থেকে শুনতাম – “যদি তুমি ভাল ফিল্ম-মেকার না হতে পার, তাহলে পর্ন ভিডিও বানাও” কারন সবচেয়ে সহজ “SELL” হলো সেক্স। আর এই মুহুর্তে এটিই হচ্ছে মিডিয়ার আনাচে কানাচে। নতুন নতুন কিছু সিনেমা-নাটকের ট্রেইলর দেখে এর চাইতে বেশী কিছু মনে হচ্ছে না।  বাংলা সিনেমাকে এতদিন মানুষ প্রত্যাখ্যান করে আসছে ঠিক এই কারনেই। পারিবারিক বিনোদনের খাতা থেকে বাংলা সিনেমা বাদ পড়ে গেছে কত আগেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল হিন্দি সিনেমা। টিভি মিডিয়ারও নড়বড়ে অবস্থা কারন ভারতীইয় চ্যানেলগুলোর কারনে। তবুও মন্দের ভাল, ভারতীয় চ্যানেলগুলো বন্ধ করা নিয়ে অনেক আন্দোলন হচ্ছে আর হয়তো রেজাল্টও পাওয়া যাবে এর মধ্যে। কিন্ত আরেকটা ব্যাপার আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা দেশে এত এর টিভি চ্যানেল থাকা সত্তেও কেন মানুষ ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। এখানে হয়তো প্রডাকশনের কোয়ালিটিটাই মূখ্য ছিল। অন্তত দেশী গুলোর কাছে থেকে তাদের প্রোডাকশনগুলো একটু নজর কাড়া ছিল তাই।

কিন্তু ইদানীং এই টিভি মিডিয়া – বা ছোট পর্দার মিডিয়া নিয়েও দেখা যাচ্ছে নানা রকমের অসামাঞ্জস্যতা। দেশী টিভি ড্রামা-সিরিয়াল গুলো আস্তে আস্তে সেসব বাংলা সিনেমার রুপ ধারন করছে একটু একটু করে। আর নাটকগুলোরে মূল সেলিং পয়েন্ট হয়ে উঠছে যৌনতা। কয়েকটা নাটকের হালকা-পাতলা ট্রেইলর আর কাটপিস দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। আসলে, আজকাল যে সে নাটক বানানো শুরু করে দিয়েছে। যার মোবাইলে ক্যামেরা আছে সেই এখন ।”ফিল্ম-মেকার” – টাইপের অবস্থা। এটা দোষের কিছু না আবার খুব একটা বড় ব্যাপারও না। যাচ্ছে তা বানালেই কিন্তু সবাই ফিল্ম-মেকার হয়ে যাচ্ছে। আর আজকাল সেলিব্রিটি হওয়া কোন ব্যাপারও না। পত্রিকায় আর্টিকেল করলেই হয়ে যায় সেলিব্রিটি। আর ইদানীং ট্যক অব দ্যা টাউন হবার জন্য উদ্ভট বা বিতর্কিত কাজ করার যে কালচার শুরু হয়েছে তা রীতিমত হাস্যকর। নাটকগুলো নাকি আজকাল সপরিবারে বসে দেখার অবস্থা নেই। কেন নেই আমার জানা নেই – তবে অনেকেই বলছে। আর কথার সত্যতা জানতে চাইলে YouTube এ খোজ লাগালেই স্যাম্পেল পেয়ে যাবেন। দর্শককে দেশী টিভি মুখী করার জন্য এই ধরনের চেষ্টা একটু হাস্যকর বটে। তবে সবকিছুই এই কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। আপনার কোন পন্যের বিজ্ঞাপন তেমন একটা চলছে না? একটা মডেল নিয়ে আসুন, তাকে কিপ্টের মত খুব অল্প-কাপড় পড়তে দিন আর পন্যটি ধরিয়ে একটি ছবি তুলে টাঙ্গিয়ে দিন কোন বড় বিলবোর্ডে – সাবাশ! আপনার পন্য কিন্তু হিট হয়ে গেল! বিজ্ঞাপনের নান্দনিক কোন ব্যাপার থাকুক না থাকুক Erotic অবস্থায় মডেল তো আছে! আর কি লাগে! ক্রিয়েটিভ ব্রিলিয়ান্স যে আসলে এখানেই মরে যাচ্ছে তা হয়তো কেউ বুঝতে পারছে না। কারও বোঝার দরকারও নেই। টিভি-চ্যানেলগুলো কাড়ি কাড়ি টাকা গুনছে, মডেল হ্যাপি, প্রডিউসার হ্যাপী, দর্শকরাও হ্যাপী! আর কি লাগে!

দেশের কতিপইয় সদ্য জেগে উঠা নাটক-মেকার, মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী – সবারই গানে একই ধরনের সুর। কেউ ট্যালেন্ট দেখানোর জন্য নেই এখানে। আছে অন্যকিছু দেখানোর জন্য। বাংলা সিনেমার সেই কলিযুগের মত। সুস্ত্র ধারার সিনেমা নিয়ে যেরকম আন্দোলন হয় এখন, কদিন পরে সুস্থ ধারার টিভি নিয়ে আন্দোলন শুরু হবে মনে হয়। এগুলো কোন কনজারভেটিভ চিন্তা-ভাবনা না, তবে সুস্ত্র মস্তিস্কের চিন্তা। হ্যা, কাহিনীর প্রয়োজনে হয়তো বিশেষ কোন অর্থে চিত্রনাট্যে যৌনতা এক-আধটু থাকতে পারে তবে যৌনতা নিয়ে চিত্র-নাট্য বানানোটা থার্ডক্লাস ট্রিক ছাড়া আর কিছুই না। অতি অল্পসময়ে কিছু করে ফেলার মরিয়া প্রয়াস। তবে যে মিডিয়া সবার বিনোদনের জন্য – যাকে আমরা জেনারেল মিডিয়া বলে থাকি – সেই মিডিয়াতে অর্থাৎ টিভি-বা ছোট পর্দার মিডিয়াতে এগুলো শুরু হয়ে গেলে আস্তে আস্তে দর্শকপ্রিয়তা হারাবে। কারন পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যমগুলোকে এভাবে নষ্ট করলে অতি শীঘ্রই আমাদের ছোট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির যা অবশিষ্ট আছে তাও যাবে। মানুষ টিভি দেখা বন্ধ করে দিবে । বাংলা সিনেমার মত বাংলা নাটক দেখতে গেলে অন্যরা লজ্জা দেয়া শুরু করবে। টিভি গুলো সাধারন দর্শক হারাবে আর হারাবে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ক্লায়েন্ট। তখন তাদের উপার্জনের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে আজে বাজে পর্ণ ড্রামা চালানো – যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকবে আর এক শ্রেনীর মানুষ Adult Entertainment হিসেবে টিভি দেখবে আর কিছু কিছু বিজ্ঞাপন চলতে পারে যেমন ধরেন নানা ধরনের মলমের বিজ্ঞাপন, যৌন রোগের অসুখের বিজ্ঞাপন, হার্বাল …… থাক আর নাই বললাম। আপনি-আমি যদি টিভি দেখা বন্ধ করে দেই বা বাসায় যদি অভিভাবকরা বাংলা টিভি দেখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহলে কে কি করতে পারবে! শেষ মেষ দেখা যাবে আমরা নেপালি চ্যানেল, বার্মিজ চ্যানেল, চাইনিজ চ্যানেল দেখছি (যদি হিন্দি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়)।

আমি দেশীয় সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুরোধ করছি তারা যেন এগুলোর কড়া সমালোচনা, প্রতিবাদ এর এসমস্ত ডিরেক্টর, প্রডিউসার এবং শিল্পীদের ১০০% বয়কট করেন। কারন, তারা যদি না করেন, তাহলে আর কেউ করার নেই। আমার মত থার্ড গ্রেডের ফিল্ম মেকারের কথা ক’জনে শুনবে। তবে এভাবেই যদি চলত থাকে, তাদের উপর সরাসরি ইফেক্ট পড়বে যারা এই মিডিয়া লাইন দিয়ে পেট চালান – জীবনের সব ধরনের উপর্জনের জন্য মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল। আমার মত থার্ড গ্রেডের ফিল্ম মেকারদের কথায় কিছু না হলেও এই ধরনের অবস্থানে তেমন কোন ইফেক্ট পড়বেনা কারন এটি আমার পেশা না – নেশা। হয়তো এই লেখাটির জন্য আমাকে অনেকেই গালি দিবেন, অনেকেই সমালোচনা করবেন, অনেকেই বলবেন “হাউ আনস্মার্ট” অথবা “কোন গ্রাম থেকে উঠে আসছে কে জানে” টাইপের কমেন্ট। যারা এগুলো বলতে চান বলতে পারেন তবে আমার তেমন কোন মাথা ব্যাথা নেই। আমি চট্টগ্রামের থার্ড গ্রেডের নাম-ছাড়া ফিল্ম-মেকার তাই না! তবে এধরনের প্রোডাকশন, নাটক বা সিনেমা যারা বানাবে, সেসব যেন চট্টগ্রামে চলতে না পারে সেটার জন্য যা করার তাই করব। প্রচার, প্রসার এবং ক্যাম্পেইন – যা দরকার। আমার শহর থেকে আমি শুরু করলাম…… আপনি চাইলে আপনার শহর থেকে শুরু করতে পারেন! আমি জানি, চট্টগ্রামে আমি এগুলো নিয়ে আওয়াজ দিলে হাজারো মানুষের সাপোর্ট পাব, আপনারাও আওয়াজ দেন, নিজ নিজ জায়গা থেকে, তাহলেই হয়ে যাবে। একটি সুস্থ ধারার মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে হিটলার টাইপের কাজ করতে হবে। এবার থেকে তাই আজে বাজে প্রোডাকশন দেখা গেলে নেগেটিভ প্রমোশন চলবে – অন্তত আমার আওয়ার মধ্যে যত নেটওয়ার্ক আছে সেসবে। আশা করি আমি কিছু কিছু মানুষের সাপোর্ট পাব – আর না পেলেও কোন সমস্যা নেই।

ভাল থাকবেন আশা করি।

আপনার মন্তব্য