মহাসড়কের আতঙ্ক

59
SHARE

সোহেল হাবিব

 সম্প্রতি রাঙ্গামাটি থেকে ঢাকা আসার জন্য হানিফ পরিবহনের বাসের টিকেট করেছিলাম। আর সেটা জানতে পেরে পরিচিত এক বড় ভাই আমাকে সতর্ক করে বললেন, তুমি চেষ্টা করে দেখ অন্য কোনো পরিবহনের টিকেট পাওয়া যায় কিনা।হানিফের গাড়িতে যাওয়ার দরকার নাই।কারণ জানতে চাইলে বললেন, হানিফের গাড়ি রাস্তায় চলে বেপরোয়া গতিতে। ড্রাইভার যদি কোনো কারণে একটু বেখেয়াল হয় তাহলে আর উপায় নাই।

কিন্তু না ঈদের সময় তাই অন্য কোনো গাড়ির টিকেট আর যোগাড় করা সম্ভব হলো না। তাই হানিফের গাড়িতেই ফিরতে হলো ঢাকায়।

রাঙ্গামাটি থেকে হাটহাজারি পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু হাটহাজারি পার হয়েই গাড়ি যে গতিতে টানতে শুরু করল তা একেবারে বলাবাহুল্য। প্রথমদিকে যাত্রীরা কিছুটা হইচই করলেও পরে তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ল, কিন্তু ক্লান্ত হলো না ড্রাইভার।সে তার আপন মনে চালিয়ে গেল, শুধু তাই না, যেখানে যেভাবে পেরেছে সে সেভাবেই অন্য গাড়িকে ওভারটেক করেছে। যাক ভাগ্য ভালো শেষ পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই ঢাকা পৌঁছাতে পেরেছিলাম।

এবার আসি অন্য পরিবহনের কথায়। এনা পরিবহন ইতোমধ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে।তাই অন্যান্য পরিবহনের চালকরাও একশ’ হাত দূরে থাকে এখন এনা পরিবহনের কোনো বাসকে দেখলে। যেমন একজন চালক বলেছেন, এনা বাস দেখা মাত্রই নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি সাইড করি। বাস চলে যাওয়ার পর আবার রওয়ানা দেই মহাসড়কের যাত্রীদের কাছেও এনা বাস তার বেপরোয়া গতির কারণে বেশি পরিচিত। সড়কটিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায়ও এনা বাসকে দায়ী করছেন যাত্রীরা।  দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার পর্যবেক্ষণেও দুর্ঘটনা প্রবণ হিসেবে এনার নাম রয়েছে এক নম্বরে

বাসে উঠে নিরাপদে নামতে পারলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন যাত্রীরা। ঢাকাসিলেট ঢাকাময়মনসিংহ দুই মহাসড়কেই রীতিমতো আতঙ্ক এনা বাস।
 

সেন্টার ফর ইঞ্জুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিরবি) নামে সংগঠনটি সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি, এডুকেশন এবং অ্যাডভোকেসি নিয়ে কাজ করে

তাদের পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, ঢাকাসিলেট মহাসড়কে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দূরপাল্লার বাস। আর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে এনা বাস। মহাসড়কে বাসের গতি যেখানে ৮০ থাকার কথা, সেখানে ১০০ থেকে ১২০ গতিতে ছুটে চলে।

সিআইপিরবি গবেষক প্রকৌশলী আরিফ উদ্দিন বাংলানিজকে জানান, এনা বাসের দুর্ঘটনার কারণ তার বেপরোয়া গতি। ঢাকাসিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জ, আশুগঞ্জ থেকে সিলেট পর্যন্ত ১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট সহ মহাসড়কে অন্তত ৩০ ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে। যেগুলো ব্লাকস্পট হিসেবে এখনও চিহ্নিত নয়

যাত্রীদের বক্তব্য হচ্ছে, ঢাকাসিলেট রুটে এনা বাসের চালক অন্য বাসের সঙ্গে যেন প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। কত দ্রুত পৌঁছাতে পারেন গন্তব্যে সেই চেষ্টায় থাকেন সব সময়

একজন যাত্রীর বক্তব্য হলো, বাড়িতে যাওয়ার জন্য এনা বাসে উঠি। কয়েকবার গিয়ে আর যাবো না শপথ করেছি। কারণ এনা বাসের চালক যাত্রীদের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে। মহাখালী থেকে উত্তরা হয়ে টঙ্গী পেরিয়ে ঢাকাসিলেটে মহাসড়কে ওঠে এনা। আর তখনই গতি বেড়ে যায় বাসের। সড়ক পথে না আকাশ পথে বাসটি চলছে, তা কেবল বাসের যাত্রীরাই বুঝতে পারেন

ঢাকাসিলেট রুটে গত ঈদে এনার বাসচাপায় একই পরিবারের জন নিহত হয়েছিলেন। কয়েকমাস আগে খিলক্ষেতে একইভাবে প্রাইভেটকারকে চাপা দিলে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন

এনা বাসের মালিক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কোনো মালিক চায় না দুর্ঘটনা ঘটুকতবে, ঈদের সময় চালকরা বেপরোয়া গতিতে ছুটেছে। ওই সময় স্পিড লিমিট ভেঙে ফেলেছিলো ড্রাইভাররা। ঈদের পরে আবার কঠোরভাবে সর্বোচ্চ গতি ৮০ কিলোমিটার মানা হচ্ছে।

দুর্ঘটনা ঘটুক সেটা তো আমরাও চাই না। তাছাড়া, আমাদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টির প্রতি তো আমাদেরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, তাই না? আর হ্যাঁ, সে কারণেই আমরা যখন কোনো পরিবহনের টিকিট কাটব, তখন সে পরিবহন সম্পর্কে জেনে নিয়ে তারপর টিকিট কাটব। আর বাস মালিক, চালক, শ্রমিকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ আপনাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও একটু ভাবুন।আপনাদের ঘরেও তো স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা আছেন, তাদের কথা ভাবুন। কোনো দুর্ঘটনায় যদি আপনার জীবনটাই চলে যায় কিংবা আপনি পঙ্গু হয়ে যান তা হলে আপনার প্রিয়জনদের জীবনে যে দুর্গতি নেমে আসবে তার কথা একটু চিন্তা করুন।

আপনার মন্তব্য