বেদে কন্যাদের জীবন বদলে দেওয়া এক পুলিশ অফিসারের গল্প

41
SHARE

সোহেল হাবিব : মাছেনা খাতুন (১৮), মজিরন আক্তার (১৮) ও লিমা বিবি (১৯)। তিনজনই বেদে কন্যা। আজকাল আমরা সাধারণত যাদের দেখি শহর-নগরের রাস্তায় ছোট্ট একটা বাক্সে সাপ নিয়ে টাকা চেয়ে বেড়াচ্ছে, এরাও একদিন তাই ছিলেন। কিন্তু সেই বেদে কন্যারাই এখন আর সাপ হাতে তাবিজ-কবজ ফেরি করেন না। বরং আর দশজন নারীর মতোই সুন্দর সংসারের স্বপ্নে এখন তারা বিভোর। ৭ অক্টোবর শুক্রবার সাভারের ঈদগাহ মাঠে জাঁকজমকভাবে ওই তিন বেদে কন্যার বিয়ে হয়েছে। বর ও কনের সবার বাড়িই সাভারের পোড়াবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায়।
আর এই বেদে কন্যাদের বিয়েতে কারা উপস্থিত ছিলেন জানেন? সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা! বিয়ের দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত ছিল পোড়াবাড়ীর পুরো গ্রাম, যা বেদেপল্লীর বাসিন্দারা কল্পনাও করতে পারেনি। আর এই বিয়ের আয়োজন, তিন কন্যাকে স্বাবলম্বী করার নেপথ্যের কারিগর পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান।
কিন্তু কিভাবে তাঁদের জীবন বদলে গেল? কে তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন?
সে গল্পই লিখেছেন কালেরকণ্ঠের সাংবাদিক ওমর ফারুক ও তায়েফুর রহমান। পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। তখনই বেদেদের কষ্টের জীবন তাঁকে পীড়িত করে। অবহেলা ও গ্লানি থেকে তাদের বাঁচানোর উদ্যোগ নেন। তাদের জন্য গড়ে দেন একটি গার্মেন্ট। এখন সেখানে সিংহভাগ বেদে কাজ করে। হাবিবুর রহমান ভালোবাসা দিয়ে ও আর্থিক সংস্থান করে বেদেদের আর দশজনের মতো মর্যাদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তিন বছর আগে মাছেনা খাতুন, মজিরন আক্তার ও লিমা বিবির বাল্যবিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। তখন তাদের বয়স ছিল দুজনের ১৫, একজনের ১৬ বছর। বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়ে অতিরিক্তি ডিআইজি হাবিবুর রহমান বেদেপল্লীতে নজির সৃষ্টি করেছিলেন। এখন তাঁদের বয়স হয়েছে তাই নিজ হাতে বিয়ে দিলেন।
বিয়ে উপলক্ষে শুক্রবার সাভারের ঈদগাহ মাঠে লেগেছিল আনন্দের ঢেউ। পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানেই হয়েছে বিয়ে। পুরো গ্রামবাসী এসেছিল বিয়ের দাওয়াতি মেহমান হয়ে। ঢাকা থেকেও গেছে কয়েকজন মেহমান। বিয়ের কেনাকাটা থেকে কন্যাদান, অতিথি আপ্যায়ন—সব কিছুই হয়েছে হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে। বিয়ে পড়ান কাজি মাওলানা আব্দুল হাবিব। বিয়ের পর পুলিশ ও উত্তরণ ফ্যাশনের উদ্যোগে নবদম্পতিদের উপহার হিসেবে নগদ অর্থ ও আসবাব দেওয়া হয়েছে। বিয়েতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান ও এম এ মালেক, ঢাকা জেলা প্রশাসক সালাউদ্দিন, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান প্রমুখ।
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে ওরা আমার মেয়ের মতোই। তাদের রীতি অনুযায়ী বিয়ে হচ্ছে। দিন যতই যাবে তারা সাধারণের কাতারে এসে দাঁড়াবে। এখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য একটি গার্মেন্ট করে দিয়েছি, সেখানে কাজ করে তারা সংসার চালাতে পারছে। আগের মতো ঝাড়ফুঁক করে সংসার চালাতে হচ্ছে না।’
মজিরন আক্তারের বাবা মোস্তাকিন মিয়া বলেন, ‘আমি ছিলাম কন্যা দায়গ্রস্ত বাবা। এত ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে হবে সেটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমি পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
মোস্তাকিন মিয়া আরো বলেন, ‘তিন বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইছিলাম। তখন ঢাকার পুলিশ সুপার ছিলেন হাবিবুর রহমান। বাল্যবিয়ের খবর শুনে তিনি আমার বাড়ি আসেন। আমাদের বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বুঝিয়ে সেদিন বিয়ে হতে দেননি। আজ ১৮ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, যা খুব আনন্দের। যে পাত্রের কাছে সেদিন বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, ওই পাত্রের সঙ্গেই বিয়ে হলো।’
কী বুঝলেন? মানুষের জীবন বদলাতে হাজার হাজার মানুষকে এগিয়ে আসার দরকার হয় না। দরকার হয় হাবিবুর রহমানদের মতো সচেতন একেক জন মানুষ। আর হ্যাঁ একজনই হন পথ প্রদর্শক, বাকিরা হন পথিক। এখন আমরা পথিক হবো নাকি পথ প্রদর্শক হবো সেটা নিজেরাই ঠিক করে নিতে পারি।

আপনার মন্তব্য