পুলিশের অভিযান

36
SHARE

রাজধানীর দক্ষিণখান থানা এলাকার আশকোনা হাজি ক্যাম্পসংলগ্ন জঙ্গি আস্তানার অভিযান শেষ হয়েছে। অভিযান শেষে ২ জনের লাশ পড়ে থাকার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশের দাবি, এদের মধ্যে একজন জঙ্গি সুমনের স্ত্রী, অন্যজন জঙ্গি তানভিরের ছেলে।

জঙ্গি আস্তানার কাছ থেকে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন বিবিসি বাংলার সাংবাদিক মীর সাব্বির। পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তিনি। পড়ুন,

আশকোনায় যে বড় কিছু ঘটছে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে খবর জেনেছিলাম। বিবিসি অফিসে আসার পর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, ঘটনা গুরুতর।

ব্যুরো এডিটর ওয়ালিউর রহমান মিরাজ জানালেন, ঘটনাস্থলে যেতে হবে। আর যেহেতু পুলিশ বলছে, সেখানে জঙ্গিদের হাতে প্রচুর অস্ত্র এবং গোলাবারুদ আছে বলে তারা ধারণা করছে, তাই আমাকে যথেষ্ট নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

গোলাগুলির আশংকা আছে এমন কোন ঘটনা কভার করতে গেলে আমাদের বুলেটপ্রুফ বর্ম এবং হেলমেট সাথে নিয়ে যেতে হয়। আজকেও তাই করতে হলো। বিবিসি অফিস থেকে এরপর গাড়ি নিয়ে ছুটলাম দক্ষিণখানের দিকে।

বিমানবন্দর পার হয়ে দক্ষিণখান ঢোকার পর কিছু পরেই দেখি রাস্তা বন্ধ। কয়েকজন পুলিশ সদস্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে সব গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। আমি পরিচয় দিলাম। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তাঁরা আমার গাড়িটি ঢুকতে দিলেন।

কিন্তু খানিক এগুতেই আরেকটি রোড ব্লক। এবার ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করা। গাড়ি ছেড়ে দিতে হলো। প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পর একটা মসজিদের কাছে পৌঁছে দেখি সেখানে প্রচুর সাংবাদিক জটলা করে আছেন। তাদের ঘিরে অনেক মানুষ।

চারিদিকে অনেক পুলিশ, র‍্যাব আর সোয়াট দলের সদস্যদের আনাগোণা। দাঁড়িয়ে আছে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। ঐ জটলায় দাঁড়িয়ে নানা ধরণের খবর পাচ্ছিলাম আমরা।

আত্মঘাতী হামলা
বেলা সাড়ে বারোটার দিকে একটা বিস্ফোরণের শব্দ পাই। তখন বুঝতে পারিনি কিসের শব্দ। পরে জানা গিয়েছিল, সেটাই ছিল আত্মঘাতী বোমার বেল্ট পরে এক নারী জঙ্গি যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন তার শব্দ।
বিস্ফোরণের অল্প পরে কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝাঁলো গন্ধ পাই। চোখ-মুখ জ্বালা করছিল।তার কিছুক্ষণ পরে, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের একজন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বেরিয়ে এলেন। তাকে ঘিরে ধরলেন সাংবাদিকরা।

তিনি জানালেন, যে বাড়ি ঘিরে অভিযান চলছে, সেখান থেকে বোরখা পরিহিত এক নারী বেরিয়ে এসেছিলেন। তার সঙ্গে ছিল সাত বছরের এক মেয়ে শিশু। এই নারীর শরীরে বাঁধা ছিল সুইসাইড ভেস্ট। সেটির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন তিনি।

মনিরুল ইসলাম জানান, আত্মঘাতী হামলা চালানো নারীর দেহ সেখানেই পড়ে ছিল। পরে পুলিশ সদস্যরা আহত শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমরা সাংবাদিকরা কোন খবর পাচ্ছিলাম না।

অবশ্য খানিক পরে এক পুলিশ কর্মকর্তা বেরিয়ে এলেন। তিনি সাংবাদিকদের দেখাচ্ছিলেন তার মোবাইল ফোনে তোলা একটি ছবি। বোরখা পরা এক নারীর রক্তাক্ত দেহ রাস্তায় পড়ে আছে। তিনি জানালেন, আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো সেই নারীর ছবি এটি।

তার মোবাইল ফোনে তোলা ছবিটি পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। আমিও তার মোবাইলে তোলার ছবির একটি ছবি তুললাম।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সকালের দিকে আরও কিছু বিস্ফোরণ এবং গুলির শব্দ পেয়েছেন তারা। ঐ বাড়ি থেকে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়া হয়।

পুলিশ পাল্ট কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছিল। কাঁদানে গ্যাসের কারণে তারা ঘরে থাকতে পারছিলেন না। কথিত জঙ্গি আস্তানার পাশের বাড়িতেই থাকেন এমন একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, যে বাসাটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মূলত মহিলারাই থাকতেন। তারা ছিলেন বেশ চুপচাপ। তিন মাস আগে তারা এই বাসা ভাড়া নেন। এর বেশি কিছু আর তার চোখে পড়েনি।

দুপুর আড়াইটার দিকে আবার গোলাগুলি এবং বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। এরপর বেলা তিনটার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেন।

সেখানে তারা জানালেন, ভেতরে যে তিন জন ছিল, তার মধ্যে একজন আত্মঘাতী নারী বাইরে বেরিয়ে এসে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। একজন পুরুষ তখনো ভেতরে রয়ে গেছে। সে বারা বার গুলি করছিল এবং বোমা মারছিল। পুলিশ তাকে আরেক জঙ্গী নেতা তানভির কাদরির ছেলে বলে সন্দেহ করছে। তখন বিশ মিনিট ধরে তার কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।

এরপর আইজিপি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসেন ঘটনাস্থলে । তাঁরাও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা জানান, ভেতরে থাকা সর্বশেষ জঙ্গীও নিহত হয়েছে। সেখানে প্রচুর গোলাবারুদ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে আগে সেখানে পাঠানো হচ্ছে।

এর আগে সকালে আরও চার জন ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আত্মসমর্পন করে.

Written by SUPTA

আপনার মন্তব্য